হিজবুল্লাহর হামলা পুরোপুরি বন্ধের শর্তে যুদ্ধবিরতিতে রাজি ইসরায়েল। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৪ মে- ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের বিষয়ে নীতিগত সমঝোতা হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে এই যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন সম্পূর্ণভাবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তের ওপর নির্ভর করবে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, ইরানসমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সব ধরনের রকেট, ড্রোন ও সামরিক হামলা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, লেবানন ও ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণের অধিকার কেবল দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রেরই রয়েছে। কোনো রাষ্ট্র কিংবা অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী যাতে লেবাননের ভবিষ্যৎকে জিম্মি করতে না পারে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো একমত হয়েছে।
গত এপ্রিল মাসে দুই পক্ষের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়েছিল। তবে সেটি ছিল অত্যন্ত নাজুক ও ভঙ্গুর। সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তজুড়ে একাধিক হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় সেই সমঝোতা প্রায় ভেঙে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিশেষ করে গত বুধবার দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত নয়জন নিহত হওয়ার পর উত্তেজনা নতুন করে বৃদ্ধি পায়। এর জবাবে উত্তর ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকায় হিজবুল্লাহ রকেট হামলা চালায় বলে অভিযোগ করে ইসরায়েল।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ সামনে এসেছে।
চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবাননের লিতানি নদী থেকে শুরু করে ইসরায়েল সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় হিজবুল্লাহর সব সদস্য, যোদ্ধা ও সামরিক অপারেটিভদের প্রত্যাহার করতে হবে। ওই এলাকায় কোনো ধরনের সশস্ত্র উপস্থিতি থাকবে না এবং নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ দায়িত্ব থাকবে লেবাননের সরকারি সশস্ত্র বাহিনীর হাতে।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের জন্য লেবাননের বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েকটি পরীক্ষামূলক বা ‘পাইলট জোন’ গড়ে তোলা হবে। এসব এলাকায় অন্য কোনো সশস্ত্র সংগঠনের উপস্থিতি থাকবে না। লেবাননের সেনাবাহিনী এককভাবে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পরিচালনা করবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কারিগরি ও কূটনৈতিক সহায়তা দেবে ওয়াশিংটন।
এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সীমিত বা আংশিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। ওই সমঝোতা অনুযায়ী, হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা চালানো থেকে বিরত থাকবে এবং এর বিনিময়ে ইসরায়েল বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরগুলোতে বিমান হামলা চালাবে না। তবে পরবর্তীতে সীমান্তে নতুন সংঘর্ষের কারণে সেই সমঝোতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে আগামী ২২ জুন আবারও আলোচনায় বসবে ইসরায়েল ও লেবাননের প্রতিনিধিরা। আলোচনায় সীমান্ত নিরাপত্তা, অস্ত্রবিরতি পর্যবেক্ষণ, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা হবে।
এদিকে নতুন যুদ্ধবিরতির ঘোষণার বিষয়ে হিজবুল্লাহ এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। সংগঠনটির অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় চুক্তি বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যুদ্ধবিরতি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যা লেবাননকে আরও নিরাপদ, স্থিতিশীল এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
চলতি সপ্তাহে সংঘর্ষের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ লেবাননের চেহুর এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় একটি অ্যাম্বুলেন্স ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এতে দুইজন চিকিৎসাকর্মী নিহত হন। এছাড়া বৈরুতের দক্ষিণে একটি ব্যক্তিগত গাড়িকেও লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
অন্যদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, সীমান্ত অতিক্রম করে আসা একটি ড্রোন এবং দুটি রকেট তারা মাঝ আকাশেই ধ্বংস করেছে। হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তারা ইসরায়েলি সেনাদের একটি সমাবেশকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণার আগে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, উত্তর ইসরায়েলের সীমান্ত এলাকায় হিজবুল্লাহ নতুন কোনো হামলা চালালে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহর দাহিয়েহতে পুনরায় ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করা হবে। দাহিয়েহ অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে হিজবুল্লাহর অন্যতম শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
তবে হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য মাহমুদ কামাতি সম্প্রতি দাবি করেন, ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে কোনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দাহিয়েহ অঞ্চলে হামলা এড়ানোর জন্য সীমিত একটি সমঝোতা হয়েছে মাত্র। তিনি আরও বলেন, ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আলোচনায় যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো মেনে চলতে হিজবুল্লাহ বাধ্য নয়।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় নতুন যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও এর ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে হিজবুল্লাহর অবস্থান, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতির ওপর।