গভীর রাতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে তারেক-ইউনূসের গোপন বৈঠক। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৫ জুন- গত ২৬ মে রাতে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে অনুষ্ঠিত একটি অনির্ধারিত ও অঘোষিত গোপণ বৈঠক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও জল্পনার জন্ম দিয়েছে। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস উপস্থিত ছিলেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
বৈঠকের পরদিন ভোরে ড. ইউনূস তুর্কিশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। তার সঙ্গে ছিলেন ঘনিষ্ঠ সহযোগী লামিয়া মোরশেদ। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ৩ জুন পর্যন্ত তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য না এলেও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ২৬ মে রাতের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার গুলশানে অবস্থিত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সরকারি বাসভবনে। সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাত প্রায় ১০টার দিকে সেখানে পৌঁছান। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রচলিত নিরাপত্তা ও প্রটোকলের দৃশ্যমান আয়োজন ছাড়াই তিনি সেখানে উপস্থিত হন বলে দাবি করা হয়েছে।
বৈঠকটি সরকারি কর্মসূচির বাইরে রাখা হয়েছিল বলেও জানা গেছে। এমনকি উভয় পক্ষের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা বা কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছাড়াই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, বৈঠকে সহকারীদের অনুপস্থিতি এবং পুরো বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা আলোচনার গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতার ইঙ্গিত দেয়।
এ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কিংবা ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের পক্ষ থেকে বৈঠকের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
তবে বৈঠক সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানা যায়, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তর, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিভিন্ন দিক।
বৈঠকের তাৎপর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ড. ইউনূসের পরবর্তী প্যারিস সফর। সূত্রগুলোর দাবি, বাংলাদেশ ত্যাগের পর প্যারিসে অবস্থানকালে তিনি কয়েকজন বিদেশি কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। যদিও এসব বৈঠকের আনুষ্ঠানিক বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।
সরকারি সূত্রের দাবি, প্যারিস সফরটি ২৬ মে রাতের আলোচনার ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত পরবর্তী যোগাযোগ ও পরামর্শ প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। তবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, ঘটনাপ্রবাহের সময়কাল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ড. ইউনূস ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব গ্রহণের জন্যও প্যারিস থেকেই ঢাকায় এসেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্তমান সফরকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
ঢাকাভিত্তিক এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা দেখে মনে হচ্ছে প্যারিস সফরটি হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। বরং ২৬ মে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আলোচিত বৃহত্তর কৌশলেরই অংশ হতে পারে এটি।”
এদিকে বিরোধী রাজনৈতিক মহলের নেতারা পুরো বিষয়টি নিয়ে অধিক স্বচ্ছতা দাবি করেছেন। তাদের বক্তব্য, জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন কোনো আলোচনা বা বিদেশ সফর গোপন রাখার পরিবর্তে জনগণের সামনে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।
তাদের মতে, যদি রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক রূপান্তর বা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়ে থাকে, তবে সে সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
অন্যদিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন, গোপন এই পরামর্শ ও আলোচনা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় কোনো ভূমিকায় ড. ইউনূসের সম্পৃক্ততার পূর্বপ্রস্তুতি হতে পারে। তবে তারাও এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এখন পর্যন্ত বৈঠকের প্রকৃত উদ্দেশ্য, আলোচনার বিস্তারিত বিষয়বস্তু এবং প্যারিস সফরের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম হয়েছে।
গোপন বৈঠক, অঘোষিত বিদেশ সফর এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর নীরবতার কারণে ঘটনাটি নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ক্রমেই বাড়ছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা না আসা পর্যন্ত ২৬ মে রাতের বৈঠক এবং প্যারিসে ড. ইউনূসের সফর ঘিরে রহস্য ও আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
সূত্রঃ নর্থ-ইস্ট নিউজ।