মমতাকে বিধানসভায় নিতে আসন ছাড়ার প্রস্তাব হুমায়ুন কবীরের। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ৫ জুন- ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের সাবেক নেতা ও আম-জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুমায়ুন কবীর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভায় ফিরিয়ে আনতে নিজের ছেড়ে দেওয়া আসন থেকে উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তাব দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে হুমায়ুন কবীর বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি নির্বাচনে পরাজিত হয়ে বিধানসভার বাইরে থাকলেও রাজ্যের আইনসভায় তাঁর উপস্থিতি প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এ কারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাইলে এবং তাঁকে অনুরোধ করলে রেজিনগর আসনে উপনির্বাচনে জয়ী করতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন।
দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক পর পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা হারিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস। এবারের নির্বাচনে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন বিজেপি প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করেছে। বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে নিজের নির্বাচনী আসনে পরাজিত হওয়ায় বিধায়ক হতে পারেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলে বর্তমানে তাঁর বিধানসভায় প্রবেশের সাংবিধানিক সুযোগ নেই।
এদিকে নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরেও নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধের আভাস দেখা দিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলের নেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে মনোনীত করলেও দলের একাংশের বিরোধিতার মুখে শেষ পর্যন্ত ঋতব্রত চট্টোপাধ্যায় বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন। উল্লেখযোগ্যভাবে, ঋতব্রতকে সম্প্রতি দল থেকে বহিষ্কার করেছিলেন মমতা।
এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই মমতাকে বিধানসভায় ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব সামনে আনেন হুমায়ুন কবীর।
একসময় তৃণমূল কংগ্রেসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন ছিলেন হুমায়ুন কবীর। তিনি রাজ্য সরকারের মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তবে গত বছর মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে বাবরি মসজিদ পুনর্নির্মাণের দাবি তুলে দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর তিনি আম-জনতা উন্নয়ন পার্টি নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন।
নবগঠিত দল নিয়ে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে মুর্শিদাবাদ জেলার রেজিনগর ও নওদা, দুই আসনেই জয় লাভ করেন তিনি। রেজিনগরে বিজেপি প্রার্থী বাপন ঘোষকে ৬৪ হাজার ৬৬০ ভোটের ব্যবধানে এবং নওদায় বিজেপি প্রার্থী রানা মণ্ডলকে ২৭ হাজার ৯৪৩ ভোটে পরাজিত করেন। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী একটি আসন রাখতে হওয়ায় তিনি নওদা আসন ধরে রেখে রেজিনগর আসন ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে ওই আসনে শিগগিরই উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ঐতিহ্যবাহী ভবানীপুর আসনে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হয়েছেন। শুভেন্দু অধিকারী একই সঙ্গে নন্দীগ্রাম আসন থেকেও জয়ী হয়েছেন। তিনি ভবানীপুর আসন ধরে রেখে নন্দীগ্রাম আসন ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে নন্দীগ্রামেও উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সাংবাদিকদের কাছে হুমায়ুন কবীর বলেন, “দিদি এবার নিজের আসনে জিততে পারেননি। তিনি যদি মনে করেন বিধানসভায় যাওয়া প্রয়োজন এবং আমাকে অনুরোধ করেন, তাহলে আমি তাঁকে বিপুল ভোটে জিতিয়ে আনার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করব।”
তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ প্রস্তাবে সাড়া দেবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
একই সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী পরাজয়ের কারণ নিয়েও মন্তব্য করেছেন হুমায়ুন কবীর। তাঁর দাবি, দলের ভেতরে পারিবারিক উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাই জনগণের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
হুমায়ুন কবীরের ভাষ্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ভাতিজা, সংসদ সদস্য এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভবিষ্যৎ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছিলেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা এবার হিসাব কষেই ভোট দিয়েছেন এবং তৃণমূলের ধারাবাহিক ক্ষমতা ধরে রাখার স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ, তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে যখন আলোচনা তুঙ্গে, তখন হুমায়ুন কবীরের এই প্রস্তাব রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এখন নজর থাকবে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় ফিরতে কোন পথ বেছে নেন এবং হুমায়ুন কবীরের প্রস্তাবকে তিনি কতটা গুরুত্ব দেন।