মেলবোর্ন, ৬ জুন- ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত—৫৪৭ দিন। ইউনূস সরকার এই ১৮ মাসের বেশি সময় ধরে দুঃশাসন চালিয়েছিল। “সংস্কার” এর নামে গোটা দেশের শিক্ষা, অর্থনীতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য আক্রান্ত হয়েছিল। আমজনতা এই ১৮ মাসে বুঝে গিয়েছিল—দেশটা উল্টোদিকে চলছিল।
১৮ মাসের সামগ্রিক চিত্র: তথ্য-উপাত্তে ধ্বংসের হিসাব
শিক্ষা ব্যবস্থা: বন্ধ হয়েছিল পড়াশোনা, মুছে গিয়েছিল ইতিহাস*
৫ আগস্ট পর সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চরম অরাজকতা বিরাজ করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল—সব জায়গায় ক্লাস-পরীক্ষা অনিয়মিত হয়ে পড়েছিল। ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছিল, ২০২৪-২০২৫ ও ২০২৫-২০২৬ দুই শিক্ষাবর্ষ মিলিয়ে সারাদেশে প্রায় ৩৫ লাখ শিক্ষার্থীর একাডেমিক ক্যালেন্ডার পিছিয়ে গিয়েছিল। এসএসি-এইচএসি-ভর্তি পরীক্ষা সব এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল।
পাঠ্যবই থেকে ১৮ মাস ধরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুছে ফেলা হয়েছিল। ৭ মার্চের ভাষণ ১২ শব্দে সংক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা “লাখো” বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ক্লাস থ্রি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বইয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবি, মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা বাদ দিয়ে বিদেশি লেখকের অনুবাদ ও অপ্রাসঙ্গিক গল্প ঢোকানো হয়েছিল। ১৮ মাস ধরে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ভুল ইতিহাস শিখেছিল।
অর্থনীতি: ১৮ মাসে রিজার্ভ-বাজার-কর্মসংস্থান সব ধসেছিল।
অর্থ উপদেষ্টা ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে স্বীকার করেছিলেন, “দেশের অর্থনীতি ভয়াবহ অবস্থায়”। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ১৮ মাসে সরকার ৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা নতুন নোট ছাপিয়েছিল। অথচ ১৫ বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাপার অভিযোগ তুলছিলেন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ১৮ মাসের লেনদেন বলছিল, বাজার মূলধন কমে গিয়েছিল ৮ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। প্রতিমাসে গড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগকারীর পকেট থেকে উবে যাচ্ছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৮ মাসে ২৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে গিয়েছিল।
বিআইডিএস, সিপিডি ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের ১৮ মাসের যৌথ জরিপ বলছিল, এই সময়ে সারাদেশে ২৮ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছিল। গার্মেন্টস, চামড়া, কৃষি—সব খাতে বেকারত্ব বেড়েছিল। রপ্তানি আয় ১৮ মাসে ২.৩% কমে গিয়েছিল। গ্রাম-গঞ্জে হাহাকার পড়ে গিয়েছিল। মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছিল।
গণমাধ্যম ও প্রশাসন: ১৮ মাস ধরে কণ্ঠরোধ ও দলীয়করণ
৫ আগস্ট পর রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি গণমাধ্যমের উপর দমন-পীড়ন চলেছিল ১৮ মাস ধরে। জাতীয় প্রেসক্লাব ৩৭ জন সিনিয়র সাংবাদিক সজ আরো শতাধিক সদস্যের পদ স্থগিত রেখেছিল। তথ্য মন্ত্রণালয় ১৬৭ জন সাংবাদিকের প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করে দিয়েছিল। পুলিশের তথ্য বলছিল, ১৮ মাসে হত্যা মামলায় আসামী করা হয়েছিল ২১০ জন সাংবাদিককে। গ্রেফতার হয়েছিলেন ১৭ জন।
প্রশাসন থেকে ১৮ মাস ধরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যোগ্য কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাদের জায়গায় মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তিকে বসানো হয়েছিল। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছিল। জনসেবা ব্যাহত হয়েছিল।
ইতিহাস-ঐতিহ্য: ১৮ মাস ধরে বঙ্গবন্ধুহীন রাষ্ট্র চলেছিল
৫ আগস্ট পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে বঙ্গবন্ধুর ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। ইসির সম্মেলন কক্ষ থেকে, বঙ্গভবনের দরবার হল থেকে—সব জায়গা থেকে জাতির জনকের ছবি নামিয়ে ফেলা হয়েছিল। শপথ নেওয়ার ২ ঘণ্টার মধ্যেই শপথ ভঙ্গ হয়েছিল। সংবিধানের ৪ক অনুচ্ছেদ ১৮ মাস ধরে লঙ্ঘিত হয়েছিল।
“শহীদ” নিয়েও ১৮ মাসের বিভ্রান্তি চলেছিল। সরকারি ঘোষণা ছিল “জুলাই-আগস্টের শহীদদের নামে স্টেডিয়াম হবে”। কিন্তু ১৮ মাসের মধ্যে সারাদেশ থেকে ১৫২ জন “শহীদ” ফিরে এসে বলেছিলেন, “আমরা মরিনি। গায়েবি জানাজা পড়ানো হয়েছিল। মিথ্যা মামলায় টাকা নেওয়া হচ্ছিল”। শহীদের তালিকা নিয়ে জাতি বিভ্রান্ত হয়েছিল।
আমজনতার ১৮ মাসের যন্ত্রণা
রিকশাচালক বলেছিল, “১৮ মাস আগে দিনে ৮০০ টাকা বেশি কামাইতাম, এখন ২০০ টাকাও হয় না”।
গার্মেন্টস শ্রমিক বলেছিল, “১৮ মাস বেকার। পোলাপানের স্কুলের বেতন বাকি”।
কৃষক বলেছিল, “সারের দাম ডাবল, ধানের দাম অর্ধেক। ১৮ মাস ধরে লস”।
মুক্তিযোদ্ধা বলেছিল, “১৮ মাস ধরে নাতিরে শুনি, রাজাকার নাকি ভালো ছিল”।
১৮ মাসে বাংলার মানুষ বুঝে গিয়েছিল—এটা সংস্কার না, এটা পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ। বর্গীরা ১৮ মাস ধরে দেশ লুট করেছিল।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: ১৮ মাস পর ভোট হয়েছিল, কিন্তু ঘা শুকায়নি
১৮ মাস দুঃশাসনের পর ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। জনগণ ভোট দিয়েছিল। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু ১৮ মাসে যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তা একদিনে শুকায়নি।
১৮ মাস ধরে পাঠ্যবই থেকে বাদ পড়া বঙ্গবন্ধু ফেরত আসেনি। ১৮ মাস ধরে বাতিল থাকা সাংবাদিকদের অ্যাক্রিডিটেশন ফেরত আসেনি। ১৫২ জন মিথ্যা “শহীদের” তালিকা বাতিল হয়নি। অর্থাৎ সরকার বদলেছিল, কিন্তু ১৮ মাসের দুঃশাসনের ধারা বহাল আছে।
১৮ মাসের হিসাব চাই, সঠিক ইতিহাস চাই
৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬—১৮ মাস ৭ দিনে বাংলাদেশ হারিয়েছিল:
– ৩৫ লাখ শিক্ষার্থীর ২টি শিক্ষাবর্ষ
– ২৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান
– ৮ লাখ কোটি টাকার সম্পদ ও রিজার্ভ
– বঙ্গবন্ধুর ছবি, ৩০ লাখ শহীদের সঠিক ইতিহাস
১৮ মাসের দুঃশাসনের পূর্ণ হিসাব জাতিকে দিতে হবে। সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক করতে হবে। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস পাঠ্যবইয়ে ফেরত আনতে হবে। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
বর্গীরা ১৮ মাস লুট করেছিল। কিন্তু এই দেশ ৩০ লাখ শহীদের রক্তে কেনা। ১৮ মাস না, ১৮০ বছরেও এই দেশকে মুছে ফেলা যাবে না।

সরদার সেলিম রেজা। ছবিঃ সংগৃহীত
লেখক- সরদার সেলিম রেজা; কবি ও পরিবেশ কর্মী, সভাপতি: বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র।