মেলবোর্ন, ৬ জুন- গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির কমপ্লেক্সে নির্মাণাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রামমূর্তি নির্মাণকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। একদিকে মন্দির কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, এটি তাদের নিজস্ব জমিতে নির্মিত একটি ধর্মীয় স্থাপনা এবং এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা বিদেশি প্রভাবের সম্পর্ক নেই।
অন্যদিকে কিছু ইসলামপন্থী গোষ্ঠী, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কয়েকটি প্ল্যাটফর্ম এই উদ্যোগের বিরোধিতা করে কাজ বন্ধের দাবি তুলেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মন্দিরের উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র তরণিদাস প্রকাশ্যে হুমকি পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
কোথায় নির্মাণ হচ্ছে আলোচিত রামমূর্তি?
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার কোমরপুর ইউনিয়নের মধ্যরামচন্দ্রপুর গ্রামের শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির কমপ্লেক্সে এই রামমূর্তি নির্মাণের কাজ চলছে। মন্দির কমপ্লেক্সটি ইতোমধ্যে দেশের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
কমপ্লেক্সটিতে প্রায় ৫০ ফুট উচ্চতার শ্রীকৃষ্ণের একটি বিশাল বিগ্রহ রয়েছে, যা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ কৃষ্ণমূর্তি হিসেবে দাবি করা হয়। এছাড়া দেশের সর্বোচ্চ আদিযোগী শিবমূর্তি নির্মাণের কাজও চলমান রয়েছে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী পুরো কমপ্লেক্সে ১৪৪টি দেব-দেবীর পৃথক প্রতিমা, বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা এবং দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য নির্মাণ করা হবে। বর্তমানে সেখানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রামমূর্তি নির্মাণের কাজ চলছে।

শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির কমপ্লেক্স। ছবিঃ সংগৃহীত
বিরোধিতার সূত্রপাত যেভাবে
রামমূর্তি নির্মাণ নিয়ে বিতর্কের সূচনা হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে।
প্রথমে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য তার ফেসবুক পেজে একটি ছবি শেয়ার করে দাবি করেন, পলাশবাড়ীতে বিশালাকার রামমূর্তি এবং কৃষ্ণমূর্তি নির্মাণ করা হচ্ছে, যেগুলোর উদ্বোধনে ভারতের সহকারী হাইকমিশনার অংশ নিয়েছেন। একই এলাকায় গীতা মহোৎসবেও ভারতীয় কূটনৈতিক প্রতিনিধির উপস্থিতির বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি।
তার পোস্টে প্রশ্ন তোলা হয়, বাংলাদেশের একটি উপজেলায় ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ভারতীয় কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের এত ঘনঘন উপস্থিতির প্রয়োজন কেন। তিনি পলাশবাড়ীর জনসংখ্যার তথ্য তুলে ধরে দাবি করেন, সেখানে হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়া সত্ত্বেও এত বড় ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের পেছনে অর্থায়নের উৎস এবং উদ্দেশ্য নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত।
তিনি আরও দাবি করেন, পলাশবাড়ী ভৌগোলিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল এলাকা এবং সেখানে একের পর এক বিশালাকার মূর্তি নির্মাণের বিষয়টি গোয়েন্দা সংস্থার গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ায় উত্তেজনা
পিনাকী ভট্টাচার্যের ওই পোস্টের পর বিভিন্ন ইসলামপন্থী এবং মৌলবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ, পেজ এবং ব্যক্তিগত আইডি থেকে রামমূর্তি নির্মাণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হয়। কিছু পোস্টে কঠোর আন্দোলন, বিক্ষোভ, এমনকি লংমার্চের ডাকও দেওয়া হয়।

বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ, পেজ এবং ব্যক্তিগত আইডি থেকে রামমূর্তি নির্মাণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হয়। ছবিঃ সংগৃহীত
একাধিক পোস্টে রামমূর্তি নির্মাণ বন্ধ করার দাবি জানানো হয় এবং এটিকে বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করা হয়।
মোরসালিন সরকার নামে একটি ফেসবুক আইডি থেকে দেওয়া এক পোস্টে মন্দিরের উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র তরণিদাসকে লক্ষ্য করে কড়া ভাষায় মন্তব্য করা হয়। ওই পোস্টে ভবিষ্যতে “তৌহিদী জনতা” রাজপথে নামবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয় এবং মন্দির নির্মাণের পেছনে ভারতীয় প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়।
বিরোধিতাকারীদের মূল আপত্তি কী?
রামমূর্তি নির্মাণের বিরোধিতাকারীরা কয়েকটি নির্দিষ্ট যুক্তি সামনে আনছেন।
তাদের অন্যতম দাবি, বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দীর্ঘদিন ধরে দুর্গাপূজা, কালীপূজা, জন্মাষ্টমীসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালন করলেও ঐতিহাসিকভাবে এখানে রামমূর্তি নির্মাণ বা “জয় শ্রীরাম” স্লোগানের তেমন প্রচলন ছিল না।
তাদের মতে, ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক ধারার প্রভাব বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এ ধরনের বৃহৎ মূর্তি নির্মাণ করা হচ্ছে।
বিরোধিতাকারীদের আরেকটি যুক্তি হলো, উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত পলাশবাড়ীর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রায় ৫০ ফুট উচ্চতার বিশাল রামমূর্তি নির্মাণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
তারা মনে করেন, বিষয়টি শুধু ধর্মীয় নয়, এর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও রয়েছে।
হুমকির অভিযোগ
শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির কমপ্লেক্সের উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র তরণিদাস ওটিএন বাংলাকে জানান, রামমূর্তি নির্মাণের কাজ বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ১৫ জুলাই এটি উদ্বোধনের কথা রয়েছে।
তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন মহল থেকে তাকে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অনেকেই তাকে সতর্ক করে বলেছেন, মন্দির এলাকায় কোরআন শরিফ বা গরুর মাংস রেখে উসকানিমূলক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা হতে পারে।
এমন পরিস্থিতির কারণে মন্দিরে অতিরিক্ত সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
পাশাপাশি তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকাকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

মন্দির কমপ্লেক্সের উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র তরণিদাস। ছবিঃ সংগৃহীত
“ভারতের সঙ্গে রামমূর্তির কোনো সম্পর্ক নেই”
বিতর্কের জবাবে হরিদাস চন্দ্র তরণিদাস তার ফেসবুক পেজে একটি দীর্ঘ বক্তব্য প্রকাশ করেন।
সেখানে তিনি দাবি করেন, রামমূর্তি নির্মাণের সঙ্গে ভারতের কোনো সম্পর্ক নেই এবং এটি সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ।
তিনি লিখেছেন, তারা বাংলাদেশি নাগরিক এবং বাংলাদেশেই তাদের জন্ম। তাই নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী মন্দিরে রামের বিগ্রহ স্থাপন করাকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখেন।
হরিদাস আরও দাবি করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ভুল তথ্য ছড়াচ্ছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মূর্তিটি পলাশবাড়ীর মূল প্রবেশমুখে বা মহাসড়কের পাশে নয়, বরং মূল সড়ক থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতরে মধ্যরামচন্দ্রপুর গ্রামে নির্মাণ করা হচ্ছে।

রামমূর্তি নির্মাণের সঙ্গে ভারতের কোনো সম্পর্ক নেই। ছবিঃ সংগৃহীত
তিনি বলেন, কোনো সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা যদি প্রমাণ করতে পারে যে এই মূর্তি ভারতের কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে, তাহলে তারা এটি সরিয়ে ফেলতে প্রস্তুত। তবে যদি এমন কোনো প্রমাণ না থাকে, তাহলে ধর্মীয় স্বাধীনতার অংশ হিসেবে মূর্তিটি নির্মাণের অধিকার তাদের রয়েছে।
হরিদাস চন্দ্র তরণিদাস তার বক্তব্যে নিজের বিরুদ্ধে অতীতে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগও অস্বীকার করেন।
তিনি দাবি করেন, তাকে অতীতে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে এবং একাধিক সরকারি সংস্থা তার বিষয়ে তদন্ত করলেও কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, করোনাকালে তিনি ত্রাণ বিতরণ করেছেন, বিভিন্ন এলাকায় মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণে সহযোগিতা করেছেন এবং মানবিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। তার ভাষ্য, কিছু মানুষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে।
হরিদাস তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে দাবি করেন যে তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি নষ্ট করতে চান না। তিনি বলেন, বাংলাদেশের হিন্দুরা যেমন নিজেদের ধর্মীয় অধিকার নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে চায়, তেমনি অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতিও সম্মান দেখাতে চায়।
তার মতে, ভারত কিংবা অন্য কোনো দেশের রাজনৈতিক বক্তব্য বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশের হিন্দুরা অনেক সময় অযথা সমস্যার মুখে পড়ে। তিনি সবাইকে গুজব ও বিভ্রান্তি থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান।
রামমূর্তি নির্মাণ নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি বিপরীত মতও সামনে এসেছে।
স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের একাধিক মুসলিম ব্যক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী মন্দির কমপ্লেক্সটির প্রশংসা করেছেন। তারা মনে করেন, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে ধর্মীয় উপাসনালয় বা প্রতিমা নির্মাণ সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যে পড়ে।
এ ধরনের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলো মৌলবাদী উসকানি এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির প্রচেষ্টার সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, একটি ধর্মীয় স্থাপনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক বিভাজন তৈরি না করে আইনশৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সহাবস্থানের পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ(ওসি) সরোয়ারে আলম খান বলেন, একটা গোষ্ঠি যারা ব্যক্তিগতভাবে হরিদাসের কাছে সুবিধা নিতে পারে নাই অথবা তার এমন কাজে হিংসা করছে, তারাই মূলত এই কাজগুলো করছে। আমাদের পুলিশ সার্বক্ষণিক সজাগ আছে। সাদা পোষাকের পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং অনলাইনে নজরদারি চলছে। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আশঙ্কার কিছু নাই।