মেলবোর্ন, ১৭ জুন- রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কড়া সমালোচক এবং ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক কার্টুনের জন্য পরিচিত রুশ শিল্পী রবার্ট কুজভকভ, যিনি ‘সেমিওন স্ক্রেপেতস্কি’ ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন, তাকে পোল্যান্ডে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক যোগসূত্র নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
পোল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলীয় শহর বিআলা পোদলাসকায় স্থানীয় সময় সোমবার সকালে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। শহরটি বেলারুশ সীমান্ত থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। পুলিশ ও প্রসিকিউটরদের তথ্য অনুযায়ী, ৪৪ বছর বয়সী এই শিল্পীকে একটি পার্কিং এলাকায় লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়।
জেলা প্রসিকিউটর কার্যালয়ের মুখপাত্র মারচিন কোজাক জানান, এক অজ্ঞাত বন্দুকধারী প্রথমে শিল্পীর কাছে গিয়ে দুটি গুলি করে। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে হামলাকারী আরও কাছে গিয়ে অতিরিক্ত তিনটি গুলি চালায়। এরপর দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে সে।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, শিল্পীর মাথা, বুক ও পিঠে মোট পাঁচটি গুলি লাগে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি গুলির খোসা এবং একটি ৯ মিলিমিটার গেকো লুগার বুলেট উদ্ধার করেছে। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণে তার ময়নাতদন্তের প্রস্তুতি চলছে।
ঘটনাস্থলটি বেলারুশ কনস্যুলেট থেকে মাত্র ৬০০ মিটার দূরে হওয়ায় হত্যাকাণ্ডটি আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ঘটনার পর পুলিশ দুই বেলারুশীয় নাগরিককে আটক করেছে। তাদের বয়স ৩৩ ও ৩৭ বছর। তবে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রবার্ট কুজভকভ দীর্ঘদিন ধরে ‘সেমিওন স্ক্রেপেতস্কি’ নামে রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্র এঁকে পরিচিতি লাভ করেন। তার কার্টুন ও শিল্পকর্মে প্রায়ই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো এবং চেচেন নেতা রমজান কাদিরভকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হতো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তার এসব কাজ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।
প্রসিকিউটর মারচিন কোজাক বলেন, শিল্পী প্রকাশ্যে রুশ সরকারের বর্তমান নীতি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতেন। তার শিল্পকর্ম মূলত রাজনৈতিক প্রতিবাদ এবং মতপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২১ সালে পোল্যান্ডে এসে বসবাস শুরু করেন এবং সেখান থেকেই তার শিল্পচর্চা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
সম্প্রতি জার্মানির রাজধানী বার্লিনে রুশ দূতাবাসের সামনে অনুষ্ঠিত ‘রাশিয়া ডে’ বিরোধী এক বিক্ষোভেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি। গত ১২ জুন অনুষ্ঠিত ওই কর্মসূচিতে তাকে পুতিন ও সাবেক সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্ট্যালিনকে ব্যঙ্গ করে আঁকা একটি চিত্রকর্ম হাতে দেখা যায়। পাশাপাশি তার পোশাকের সঙ্গে বাঁধা একটি রুশ পতাকাকে মাটিতে টেনে নিয়ে প্রতীকী প্রতিবাদ জানাতেও দেখা যায়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা এখন খতিয়ে দেখছেন, শিল্পীর রাজনৈতিক অবস্থান এবং সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না। এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন হামলার দায় স্বীকার করেনি।
পোল্যান্ডের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, ব্যক্তিগত শত্রুতা কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো নেটওয়ার্ক জড়িত আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ইউরোপে আশ্রয় নেওয়া রুশ ভিন্নমতাবলম্বীদের নিরাপত্তা নিয়েও এই ঘটনার পর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।