১১৫ দিন আটকে থাকার পর হরমুজ প্রণালি পার হলো ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’
মেলবোর্ন, ২৩ জুন- দীর্ঘ ১১৫ দিনের অনিশ্চয়তা শেষে অবশেষে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। গতকাল সোমবার দিবাগত রাত তিনটার…
মেলবোর্ন, ২৩ জুন- ভারতের পশ্চিমবঙ্গে একটি সড়কের নাম পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহল, ইতিহাসবিদ এবং নাগরিক সমাজে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকার সোহরাওয়ার্দী সড়কের নাম পরিবর্তন করে ‘গোপাল মুখার্জি সড়ক’ করার সিদ্ধান্তকে ঘিরে এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। বিষয়টি এখন শুধু একটি সড়কের নাম পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ইতিহাসের ব্যাখ্যা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সম্প্রতি কলকাতা পুরসভা সোহরাওয়ার্দী সড়কের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন নামকরণ করা হয়েছে গোপাল মুখার্জির নামে, যিনি ‘গোপাল পাঁঠা’ নামেই বেশি পরিচিত। ১৯৪৬ সালের কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের সুরক্ষায় সংগঠিত ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে তাঁর সমর্থকদের দাবি। দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় জনতা পার্টি তাঁকে জনপরিসরে তুলে ধরার চেষ্টা করে আসছিল।
পশ্চিমবঙ্গ দিবস উপলক্ষে এই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় আইনসভার হিন্দু সদস্যদের ভোটে বাংলা ভাগের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের ফলে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হিসেবে গঠিত হয়। ভারতীয় জনতা পার্টি এই ঘটনাকে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেও বিষয়টি নিয়েও রাজ্যে বিতর্ক রয়েছে।

শুভেন্দু অধিকারী। ছবি : সংগৃহীত
বিতর্ক আরও তীব্র হয় পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারীর এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাস্তার নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন। তাঁর দাবি, সোহরাওয়ার্দীর নামে একটি প্রধান সড়ক থাকা অনুচিত ছিল, কারণ তিনি রাজনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে নিরপরাধ মানুষের গণহত্যার পথ সুগম করেছিলেন। অন্যদিকে গোপাল মুখার্জি হাজারো মানুষের জীবন রক্ষা করেছিলেন।
তবে এই বক্তব্যের পরই শুরু হয় মূল বিতর্ক। বিরোধীদের দাবি, যে সড়কের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে সেটি আদৌ পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে ছিল না।
তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা কুণাল ঘোষ বলেন, সড়কটির নাম ছিল স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দীর নামে। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং ব্রিটিশ ভারতের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর মতে, রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে একজন শিক্ষাবিদের নাম সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
একই ধরনের মন্তব্য করেছেন কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ। তিনি বলেন, স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন এবং তাঁর উত্তরসূরি ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। ফলে সড়কের নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ইতিহাসের তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি।
তবে বিতর্ক এখানেই থেমে থাকেনি। কয়েকজন গবেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি দাবি করেন, সড়কটির নাম হাসান সোহরাওয়ার্দীর নামেও নয়। তাঁদের মতে, ১৯৩৩ সালে যখন সড়কটির নামকরণ হয়, তখন হাসান সোহরাওয়ার্দী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী উভয়েই জীবিত ছিলেন। কলকাতা পুরসভার প্রচলিত নীতিমতে জীবিত ব্যক্তির নামে সড়কের নামকরণ করা হতো না।
এ অবস্থায় ইতিহাসবিদদের একাংশের দাবি, সড়কটির নামকরণ হয়েছিল বিশিষ্ট ইসলামী পণ্ডিত, আইনজীবী ও শিক্ষাবিদ আবদুল্লাহ আল মামুন সোহরাওয়ার্দীর সম্মানে। তিনি ছিলেন সোহরাওয়ার্দী পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য এবং হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
তবে এই ব্যাখ্যাতেও নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ, আবদুল্লাহ আল মামুন সোহরাওয়ার্দী ১৯৩৫ সালে মারা যান, আর সড়কটির নামকরণ হয়েছিল ১৯৩৩ সালে। ফলে জীবিত ব্যক্তির নামে সড়কের নামকরণ না করার নিয়মের সঙ্গে এই তথ্যও পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ফলে বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সোহরাওয়ার্দী সড়ক আসলে কার নামে ছিল। রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য, পুরসভার নথি এবং ইতিহাসবিদদের গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন তথ্য উঠে আসায় বিষয়টি এখন রাজনৈতিক বিতর্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি সড়কের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গে ইতিহাসের ব্যাখ্যা, দেশভাগের স্মৃতি এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে সোহরাওয়ার্দী সড়কের প্রকৃত ইতিহাস উদঘাটনের দাবি এখন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au