বাংলাদেশ

ভাঙছে হৃদয়ের সেতু: গ্রাম বাংলার হারিয়ে যাওয়া আন্তরিকতা

সরদার সেলিম রেজা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পরিবেশ কর্মী, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র ।

  • 8:35 pm - June 29, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২২০ বার
সরদার সেলিম রেজা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ২৯ জুন- বাংলাদেশ মানে শুধু মানচিত্র না। বাংলাদেশ মানে গ্রাম। আর গ্রাম মানে একটা বড় পরিবার।
শত শত বছর ধরে গ্রাম বাংলার রেওয়াজ ছিল-আত্মীয় আসবে, পিঠা হবে, চিঠি আসবে, শোকে সবাই ভেঙে পড়বে, আনন্দে সবাই মাতবে।

নব্বই দশক পর্যন্ত এই ছবিটাই ছিল বাস্তব।
আজ সেই ছবিটা ফিকে। মায়ার জায়গায় নিয়েছে অহংকার। আন্তরিকতার জায়গায় নিয়েছে ব্যস্ততা।

ঘরে ফ্রিজ আছে, ব্যাংকে টাকা আছে, কিন্তু হৃদয়ে টান নাই।
এই পরিবর্তন শুধু সামাজিক না। এটা জাতীয় আত্মার সংকট।

১. নব্বই দশক পর্যন্ত গ্রাম বাংলার চিরায়ত রেওয়াজ

ক. আত্মীয়-স্বজনের আসা-যাওয়া ও খাওয়ার রেওয়াজ

নব্বই দশক পর্যন্ত গ্রামে আত্মীয় মানে ছিল উৎসব।
ঈদ, পূজা, নবান্ন, পহেলা বৈশাখ—বছরে অন্তত ৩-৪ বার মামা, খালা, চাচা, ফুফুর বাড়ি আসা বাধ্যতামূলক ছিল।
খালি হাতে কেউ আসত না। নারকেলের পুলি, ভাপা পিঠা, চিতই, পায়েস, হাঁসের মাংস, নতুন চালের গরম ভাত—এগুলো ছিল রন্ধন শিল্পের অংশ।
একজন মা ৩ দিন আগে থেকে পিঠা বানাতেন। ৫০ থেকে ১০০ পিস।গোটা বাড়ি মেতে থাকত।
ব্র্যাকের ২০২৩ সালের জরিপ বলে: এখন গ্রামের ৭২% পরিবার বছরে ১ বারের কম আত্মীয়ের বাড়ি যায়। ৮০% রেওয়াজ বিলুপ্ত।

খ. চিঠি আদান-প্রদান: দূরের টান

মোবাইল ছিল না। ফোন ছিল না।
দূরে থাকা ছেলে মাসে কমপক্ষে একটা চিঠি লিখত। ৫ টাকার স্ট্যাম্প।
পোস্টমাস্টার হাঁক দিতেন, চিঠি… চিঠি…।” গোটা পাড়া জড়ো হতো। মা বাবা আপনজনেরা চিঠির কাগজ বুকে জড়িয়ে কাঁদতেন।
ডাক বিভাগের হিসাব: ১৯৯০ সালে চিঠি ছিল ১২ কোটি। ২০২৪ সালে ১.৮ কোটি। ৮৫% কমে গেছে।
চিঠির জায়গা নিয়েছে “Seen”। উষ্ণতার জায়গা নিয়েছে নীল টিক চিহ্ন।

গ. শোক-সুখে একসাথে: ভেঙে পড়া আর ছুটে যাওয়া

পাড়ার কেউ মারা গেলে ৪০ দিন শোক ! মৃতের বাড়িতে ভাত রাঁধত না। রান্নার হাঁড়ি চুলায় উঠত না।
কারো অসুখের খবর শুনলে রাত ১২টায় লণ্ঠন নিয়ে ২০ জন ছুটত।
হাট থেকে কেউ গরু-ছাগল-মুরগি কিনে আনলে বিকেলে ৫০ জন দেখতে যেত। দাম জিজ্ঞেস করত, পরামর্শ দিত।
ইউজিসির ২০২৪ সালের জরিপ: এখন মৃত্যুর খবর শুনেও ৬৫% মানুষ যায় না। “অফিস আছে” বলে দায় এড়ায়।

ঘ. একান্নবর্তী পরিবার: ১ হাঁড়ি ভাতের মায়া

দাদা, দাদি, চাচা, চাচি, ভাই, বোন—১৫ থেকে ২০ জন এক চুলায় রান্না। ১ হাঁড়ি ভাত।
অভাব ছিল, কিন্তু ভাগাভাগি ছিল। অভিযোগ ছিল না।
বিবিএসের তথ্য:* ১৯৮০ সালে যৌথ পরিবার ছিল ৭০%। ২০২৪ সালে ১৮%। *৭৪% ভেঙে গেছে।
আজ প্রতিটি বাড়ি আলাদা। প্রতিটি হাঁড়ি আলাদা। প্রতিটি মনও আলাদা।

২. বর্তমান চিত্র: ঠুনকো হয়ে যাওয়া সম্পর্ক

ক. আত্ম-অহংকার ও ব্যস্ততার দোহাই

আজকের বাক্য: “আমার সময় নাই ভাই। খুব ব্যস্ত।”
মামা মারা গেছেন। ভাগ্নে ঢাকা থেকে আসেন না। ৫,০০০ টাকা বিকাশ করে দেন।
টাকা দিয়ে মায়া কেনা যায় না। কিন্তু আমরা সেটাই চেষ্টা করছি।

খ. ডিজিটাল দূরত্ব

ফেসবুকে ৩০০০ জনের ফ্রেন্ডলিস্ট। কিন্তু বিপদে পাশে দাঁড়ানোর মানুষ ২ জনও নাই।
মেসেজে লিখি “দোয়া করি”। সামনে গিয়ে হাত ধরি না।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ২০২৩ সালের তথ্য: গ্রামে একাকীত্বে ভোগা বয়স্ক মানুষ ৪৮%।

গ. রন্ধন শিল্পের মৃত্যু

পিঠা এখন জাদুঘরের জিনিস।
পুষ্টি ইনস্টিটিউটের তথ্য: ১৯৯০ সালে শীতে প্রতি বাড়িতে ২০ ধরনের পিঠা হতো। ২০২৪ সালে ২ ধরন।
কারণ: মেয়ে চাকরি করে, বউমা বলে “টাইম নাই”। দোকান থেকে কেক কিনে আনা হয়।
পিঠা মানে শুধু খাবার না। পিঠা মানে ৩ দিনের গল্প, হাসি, মায়া। সেটাও মরে গেছে।

ঘ. সবকিছু ঠুনকো

২ দিনের ঝগড়ায় ২০ বছরের সম্পর্ক শেষ।
“ও নিশ্চয়ই স্বার্থের জন্য আসছে”—এই সন্দেহ এখন সম্পর্কের ভিত্তি।
মায়া এখন হিসাবের খাতা।

৩. এই পরিবর্তনের কারণ: কেন এমন হলো?

ক. অর্থনীতির দাসত্ব

১৯৮০ সালে গ্রামের গড় আয় ছিল ২,০০০ দুই হাজার টাকা। সময় ছিল।
২০২৪ সালে গড় আয় ২০,০০০ বিশ হাজার টাকা। সময় নাই। [বিবিএস]
আমরা টাকা কামাতে গিয়ে সম্পর্ক বেচে দিয়েছি।

খ. পারমাণবিক পরিবারের ভাইরাস

পশ্চিমা “Nuclear Family” মডেল। “আমি, আমার বউ, আমার ছেলে। ব্যস।”
দাদা-দাদি বোঝা। চাচা-ফুফু অতিরিক্ত।
ফল: ১৫ জনের মায়া ৩ জনের স্বার্থে পরিণত হয়েছে।

গ. প্রযুক্তির বিচ্ছিন্নতা

নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে ১ বাড়িতে ১টা ফোন। গোটা পাড়া কথা বলত।
২০২৪ সালে ১ বাড়িতে ৫টা মোবাইল। ৫ জন ৫ রুমে।
মোবাইল আমাদের কাছাকাছি এনেছে, কিন্তু হৃদয় থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।

ঘ. শহরের মানসিকতা

শিক্ষিত ছেলে ভাবে, “আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়া মানে লজ্জা। পিঠা বানানো মানে সময় নষ্ট।”
শিকড়কে আমরা নিজেরাই কেটে ফেলছি।

ঙ. ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা

আগে দরজা খোলা থাকত। এখন তালা।
“অচেনা লোক” মানে এখন সন্দেহ।
মায়ার জায়গা নিয়েছে ভয়।

৪. এই পরিবর্তন কিসের সংকেত? ৫টি ভয়ংকর ইংগিত

সংকেত ১: সামাজিক বন্ধন ভাঙার সংকেত

সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম বলেন, “সমাজে যখন Anomie আসে, মানে নিয়ম-মায়া-সম্পর্ক ভাঙে, তখন অপরাধ ও আত্মহত্যা বাড়ে।”
পুলিশ সদর দপ্তর: ২০১০ সালে আত্মহত্যা ১০,১৩০। ২০২৩ সালে ১৪,৩০০। ৪২% বৃদ্ধি।

সংকেত ২: মানসিক রোগের সংকেত

WHO ২০২৩: বাংলাদেশে ৭.৫% মানুষ বিষণ্ণতায় ভোগে। গ্রামে ৬.২%।
কারণ: Social Isolation, মানে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।
ঘর ভর্তি মানুষ, কিন্তু মন একা।

সংকেত ৩: বয়স্কদের পরিত্যাগের সংকেত

সমাজসেবা অধিদপ্তর: ১৯০ সালে বৃদ্ধাশ্রম ছিল ১২টি। ২০২৪ সালে ১৫০টির বেশি।
ছেলে টাকা পাঠায়। কিন্তু মা-বাবার পাশে বসে না।

সংকেত ৪: সংস্কৃতির মৃত্যুর সংকেত

পিঠা নাই = নবান্ন নাই = উৎসব নাই = মায়া নাই।
যখন খাবার দোকানের, তখন ভালোবাসাও দোকানের হয়ে যায়।

সংকেত ৫: জাতির আত্মা মৃত্যুর সংকেত

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “বাংলার গ্রামই বাংলাদেশের প্রাণ।”
প্রাণ যদি মরে যায়, দেহ থাকবে, আত্মা থাকবে না।
আমরা এখন অর্থনৈতিকভাবে বড়, কিন্তু আত্মিকভাবে মৃত।

৫. উপসংহার: মায়া ফেরানোই মুক্তি

আগে ঘরে অভাব ছিল, কিন্তু বুকে ধন ছিল—মায়ার ধন।
আজ ঘরে এসি আছে, ফ্রিজ আছে, কিন্তু বুকে শূন্যতা।

চিঠি মরে গেলে সম্পর্ক মরে।
পিঠা মরে গেলে উৎসব মরে।
একান্নবর্তী পরিবার মরে গেলে বাংলাদেশ মরে।*

এই পরিবর্তন উন্নতি না। এটা পচন।
এটা সেই সংকেত, যা বলে: “জাতি টাকায় বড় হচ্ছে, কিন্তু মানুষে ছোট হচ্ছে।”

তাই এখনই সময়।
আত্মীয়ের বাড়ি যেতে হবে। পিঠা বানাতে হবে। চিঠি লিখতে হবে।
কারো মৃত্যুতে ছুটে যেতে হবে। কারো আনন্দে শরিক হতে হবে।

কারণ মানুষ মরে গেলে ৪০ দিন শোক করা যায়।
কিন্তু মায়া মরে গেলে ৪০ বছরেও শোক যায় না।

মায়া বাঁচাও। আত্মীয়তা বাঁচাও। বাংলাদেশ বাঁচাও।

এই শাখার আরও খবর

জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের পক্ষে রাজনৈতিক ঐকমত্য চান নুরুল হক

মেলবোর্ন, ২১ আগষ্ট- প্রয়োজনে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান…

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে নতুন ‘কিংমেকার’ ক্রিপ্টো, এআই ও অনলাইন বেটিং

মেলবোর্ন, ২১ আগষ্ট- যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে করপোরেট অর্থায়নের চিত্র বদলে যাচ্ছে। ওয়াল স্ট্রিট, ওষুধ, জ্বালানি ও গণমাধ্যমের মতো দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী শিল্পের পাশাপাশি এবার ক্রিপ্টোকারেন্সি,…

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আদিবাসী শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের দাবি

মেলবোর্ন, ২০ আগষ্ট- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আদিবাসী শিক্ষার্থীকে নিজ মেসে মারধর এবং জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে। বুধবার (১৯ আগস্ট) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের…

পারস্পরিক আস্থা ও মর্যাদাপূর্ণ আমন্ত্রণ না হলে ভারতে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সম্ভাবনা কম: উপদেষ্টা

মেলবোর্ন, ২০ আগষ্ট- বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগামী মাসে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত সফরের সম্ভাবনা এখনো ‘ক্ষীণ’। দুই দেশের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে পারস্পরিক…

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ যুক্ত হলে কী বদলাবে, কেন উদ্বিগ্ন ভারত?

মেলবোর্ন, ২০ আগষ্ট- সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে মক্কা চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই তুরস্কের সংবাদমাধ্যম ইয়েনি শাফাক একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ওই চুক্তিতে যুক্ত করার সম্ভাবনা…

বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

মেলবোর্ন, ২০ আগষ্ট- দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au