বাংলাদেশ

দুই বছরে বন্ধ হয়েছে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা, ঝুঁকিতে আরও শত শত প্রতিষ্ঠান

 কাজ হারিয়েছেন বিপুলসংখ্যক শ্রমিক

  • 3:12 pm - July 03, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২৬ বার
দুই বছরে বন্ধ হয়েছে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা। ছবিঃ প্রতীকী

মেলবোর্ন, ৩ জুলাই- দেশে গত দুই বছরে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট, উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে শিল্প খাতের এ সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। উদ্যোক্তা ও শ্রমিক নেতাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আরও শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এরই মধ্যে শুধু তৈরি পোশাক খাতেই প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

শিল্প পুলিশ ও বিভিন্ন উদ্যোক্তা সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরে অন্তত ৪৫৭টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। তবে উদ্যোক্তা ও শ্রমিক নেতাদের দাবি, ছোট ও মাঝারি অনেক কারখানার তথ্য সরকারি হিসাবের বাইরে থাকায় প্রকৃত সংখ্যা পাঁচ শতাধিক, এমনকি এক হাজারের কাছাকাছিও হতে পারে।

শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানির পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের নতুন রপ্তানি আদেশও কমে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার এই প্রবণতা দেশের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিপুলসংখ্যক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং আরও অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতে বিনিয়োগ কমবে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে এবং শিল্প খাত দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়বে।

তাঁর মতে, সরকার শিল্পের জন্য প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করলেও অনেক কারখানা এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে শুধু ঋণ দিয়ে তাদের পুনরায় সচল করা সম্ভব নয়। যেসব কারখানার পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নেই, তাদের জন্য পৃথক ‘এক্সিট পলিসি’ গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যদিকে যেসব কারখানা কিছু সহায়তা পেলে উৎপাদনে ফিরতে পারে, তাদের জন্য দ্রুত পরিচালন মূলধন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের সহায়তায় শিল্পাঞ্চলে ওএমএস কার্যক্রম সম্প্রসারণেরও পরামর্শ দেন তিনি।

শ্রমিক সংগঠন ইন্ডাস্ট্রিঅল গ্লোবাল ইউনিয়ন বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার বলেন, সরকারি হিসাবে বন্ধ কারখানার সংখ্যা ৫০০-এর কম হলেও বাস্তবে তা এর দ্বিগুণের কাছাকাছি। কারণ ছোট কারখানা বন্ধ হলেও সেগুলোর তথ্য অনেক সময় কোথাও নথিভুক্ত হয় না। তাঁর দাবি, গত দুই বছরে শুধু পোশাক খাতেই প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। অন্যান্য শিল্প খাতের হিসাব যোগ করলে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে।

গার্মেন্টস কারখানার কর্মরত শ্রমিকরা। ছবি: সংগৃহীত

উদ্যোক্তা ও শ্রমিক নেতাদের মতে, শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি। এর ফলে উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পাশাপাশি কিছু প্রতিষ্ঠানে দুর্বল ব্যবস্থাপনা, সময়মতো রপ্তানি পণ্য সরবরাহ করতে না পারা এবং আর্থিক সংকটও কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

তারা আরও বলছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও দেশের শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ইরানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কনীতি এবং বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়েছে।

শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে বন্ধ হওয়া ৪৫৭টি শিল্পকারখানার মধ্যে ১৭০টি বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের এবং ২৮৭টি অন্যান্য শিল্পখাতের। বন্ধ হওয়া কারখানার মধ্যে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সদস্য ১০৮টি, নিট পোশাক প্রস্তুতকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর ৩৫টি, বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর ৮টি এবং বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের আওতাধীন ১৯টি কারখানা রয়েছে।

তবে বিজিএমইএর নিজস্ব তথ্য বলছে, গত দুই বছরেই তাদের সদস্যভুক্ত ২২১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু গত বছরই বন্ধ হয়েছে ১৪১টি কারখানা। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মিলিয়ে সংগঠনটির সদস্য কারখানার সংখ্যা ২ হাজার ১২৭টি।

শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্প এলাকায় জ্বালানি সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সাভার ও আশুলিয়ায় চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় ৪০ শতাংশ কম থাকায় নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

বিদ্যুৎ না থাকলে কারখানাগুলোকে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু সেখানে আবার পর্যাপ্ত গ্যাস ও ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি জ্বালানির দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।

নতুন গ্যাস সংযোগ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় অনেক নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করতে পারছে না। অন্যদিকে চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের বেশ কয়েকটি স্টিল রি-রোলিং মিল এবং সিরামিক কারখানায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে চুল্লি স্বাভাবিকভাবে চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ইতোমধ্যে বন্ধ হওয়া দুই শতাধিক কারখানার পাশাপাশি আরও দুই শতাধিক কারখানা এখন বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব কারখানা বর্তমানে আংশিক উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ে দুটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ঋণ সহায়তার সুপারিশ করা হবে।

তিনি বলেন, শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ। ঋণ সহায়তা দিয়েও শিল্পকে বাঁচানো সম্ভব হবে না, যদি প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়।

বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত সংগঠনটির ২৩৪টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ১১৪টি সুতা উৎপাদনকারী স্পিনিং মিল। বাকিগুলো কাপড় উৎপাদন, ডায়িং, প্রিন্টিং ও ফিনিশিং কারখানা। বর্তমানে সংগঠনটির সদস্য কারখানার সংখ্যা ১ হাজার ৮৬৯টি।

এ ছাড়া বিটিএমএর আওতাধীন আরও ১ হাজার ১২১টি কারখানায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন হচ্ছে না। একইভাবে বিজিএমইএর ১ হাজার ৩২১টি কারখানাও আংশিক উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব কারখানার বড় অংশই ভবিষ্যতে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

আশুলিয়ার লিটিল স্টার স্পিনিং মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম খোরশেদ আলম বলেন, তাঁর কারখানায় গ্যাসের চাপ থাকার কথা ১০ পিএসআইজি। কিন্তু অধিকাংশ সময় তা ১ থেকে ২ পিএসআইজির মধ্যে থাকে। ফলে যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে চালানো যায় না এবং সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে হচ্ছে।

এদিকে রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার চিত্রও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পোশাক শিল্পে কাঁচামাল আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন বা ইউডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কয়েক মাস ধরে নতুন রপ্তানি আদেশের মূল্য কমছে। বিশেষ করে সর্বশেষ জুন মাসে ইউডির বিপরীতে রপ্তানি আদেশের মূল্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে নতুন রপ্তানি আদেশেও এর প্রভাব পড়ছে।

শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা মনে করছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, উৎপাদন ব্যয় কমানো, সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য কার্যকর নীতিগত সহায়তা না বাড়ানো হলে আগামী মাসগুলোতে আরও অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে। এতে দেশের কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতি আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

এই শাখার আরও খবর

ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ফিলিস্তিনি গোলরক্ষক নিহত

মেলবোর্ন, ৩ জুলাই- ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় জাতীয় পর্যায়ের ফুটবল গোলরক্ষক সালিম আল-আশকার নিহত হয়েছেন। ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (পিএফএ) বরাত দিয়ে তুরস্কের বার্তা…

হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যের হাট: গ্রাম বাংলার বিলুপ্ত সুর

মেলবোর্ন, ৩ জুলাই- একসময় বাংলাদেশের প্রতিটা গ্রামের প্রাণ ছিল “হাট”। শুক্রবার, শনিবার, মঙ্গলবার—সপ্তাহে ১-২ দিন বটতলা, নদীর পাড় বা খোলা মাঠ জেগে উঠত। কুমোরের হাঁড়ি,…

​দুর্নীতির অতল গহ্বরে ইউনূস সরকার: শেখ হাসিনার সতর্কবাণী ও আজকের বাস্তবতা

মেলবোর্ন, ৩ জুলাই- ​একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ঘিরে যে তথাকথিত ‘আদর্শিক আভিজাত্য’ ও পরিবর্তনের স্বপ্ন ফেরি করা হয়েছিল, সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আজ সেই অধ্যায়ের…

ইউনূস আমলে দুর্নীতি ও ঘুষ: দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তের দাবি

মেলবোর্ন, ৩ জুলাই- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক জরিপে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংখ্যক পরিবার সরকারি সেবা নিতে গিয়ে…

ইউনূস সরকারের আমলে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রায় ৩ হাজার ঘটনা

মেলবোর্ন, ৩ জুলাই- বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে বিভিন্ন…

রোনালদোর গোলে শেষ ষোলোয় পর্তুগাল, নাটকীয় ম্যাচে মদরিচদের বিদায়

মেলবোর্ন, ৩ জুলাই- বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের অন্যতম নাটকীয় ম্যাচে শেষ হাসি হাসল পর্তুগাল। কানাডার টরন্টো স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au