বাংলাদেশ

হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যের হাট: গ্রাম বাংলার বিলুপ্ত সুর

মতামত- সরদার সেলিম রেজা

  • 4:36 pm - July 03, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩৩২ বার
গ্রাম বাংলার হাট। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ৩ জুলাই- একসময় বাংলাদেশের প্রতিটা গ্রামের প্রাণ ছিল “হাট”। শুক্রবার, শনিবার, মঙ্গলবার—সপ্তাহে ১-২ দিন বটতলা, নদীর পাড় বা খোলা মাঠ জেগে উঠত। কুমোরের হাঁড়ি, তাঁতির শাড়ি, জেলের মাছ, কামারের দা, বাউলের একতারা—সব এক জায়গায়।

আজ ২০২৬ সালে সেই হাট মরে গেছে। গ্রামে গ্রামে দোকানপাট ভরে গেছে। হাটের  জায়গায় এসেছে সকালবিকাল বাজার,  সুপারশপ, অনলাইন ডেলিভারি আর প্লাস্টিকের প্যাকেট।

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের ঐতিহ্যের হাট হারিয়ে যাচ্ছে। আর হাটের সাথে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি, জীবিকা আর সম্প্রীতি।

১. হাট মানে কি ছিল? সংখ্যায় দেখুন

১৯৭১ সালে: বাংলাদেশে নিবন্ধিত গ্রামীণ হাট ছিল প্রায় ১২,৫০টি। [স্থানীয় সরকার বিভাগের হিসাব]

১৯৯০ সালে: ১০,৮০টি।

২০১০ সালে: ৭,২০০টি।

২০২৫ সালের হিসাব: সক্রিয় ঐতিহ্যবাহী হাট ৩,৮০টির নিচে। [বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বিবিএস এর খুচরা বাজার জরিপ ২০২৪]

মানে ৫০ বছরে ৭০% হাট বিলুপ্ত।

হাট শুধু বাজার ছিল না। হাট ছিল গ্রামের পার্লামেন্ট, আদালত, সিনেমা হল, প্রেমের জায়গা।

২. কি বিক্রি হতো হাটে? হারিয়ে যাওয়া পণ্যের তালিকা

বিবিএস ও বাংলাদেশ হস্তশিল্প সমিতির ২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী:

পণ্যের ধরন   ১৯০ সালে হাটে উপস্থিতি     ২০২৫ সালে হাটে উপস্থিতি    হ্রাসের হার

মাটির হাঁড়ি-পাতিল   ৯২% হাটে    ১৮% হাটে    ৮০%

হাতে বোনা শাড়ি-লুঙ্গি ৮৫% হাটে    ২% হাটে     ৭৪%

বাঁশ-বেতের সামগ্রী    ৯০% হাটে    ২৮% হাটে    ৬৯%

দেশি মাছ, সবজি     ১০% হাটে    ৬৫% হাটে    ৩৫%

লোকজ খেলনা, মাটির পুতুল   ৭৮% হাটে    ৯% হাটে     ৮%

লোকগানের বাদ্যযন্ত্র   ৬৫% হাটে    ৫% হাটে     ৯২%

লসবচেয়ে ভয়াবহ: মাটির পুতুল, একতারা, দোতারা, বাঁশি—এগুলো ৯০% এর বেশি হাট থেকে উঠে গেছে।

 

৩. কারা ক্ষতিগ্রস্ত হলো? কারিগরের সংখ্যা

বাংলাদেশ কারুশিল্প বোর্ডের তথ্য:

কুমোর: ১৯৮০ সালে ২ লক্ষ ১০ হাজার পরিবার। ২০২৫ সালে ৪৭ হাজার পরিবার। ৭% কমেছে। কারণ প্লাস্টিকের বালতি ২০ টাকা, মাটির কলসি ১৫০ টাকা।

তাঁতি:*ল ১৯১ সালে ৫ লক্ষ তাঁতি। ২০২৫ সালে ১ লক্ষ ৮ হাজার। ৭৮% কমেছে। পাওয়ারলুমের শাড়ি ৪০ টাকা, হাতে বোনা ২২০০ টাকা।

বেত-বাঁশ শিল্পী:*২০০৫ সালে ১ লক্ষ ২০ হাজার। ২০২৫ সালে ৩৫ হাজার। ৭০% কমেছে।

ফল:১০ লক্ষের বেশি পরিবার তাদের পৈতৃক পেশা ছেড়েছে। বেশিরভাগ ঢাকায় গার্মেন্টস বা রিকশা চালাচ্ছে।

৪. কেন হারিয়ে গেল হাট? ৫টা মূল কারণ + তথ্য

কারণ ১: সুপারশপ ও অনলাইন

২০১৫ সালে বাংলাদেশে সুপারশপ ছিল ২২০টি। ২০২৫ সালে ১,১৫০টি। [বাংলাদেশ রিটেইল ফোরাম]

ই-কমার্স বাজার ২০২০ সালে ২ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে ৪.৮ বিলিয়ন ডলার। [e-CAB]

গ্রামের মানুষ এখন শপে যায়, হাটে না।

কারণ ২: প্লাস্টিকের আগ্রাসন

পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, বাংলাদেশে বছরে ৮ লক্ষ ২০ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য হয়। তার ৪০% আসে প্যাকেটজাত পণ্য থেকে।

মাটির হাঁড়ি ভাঙে, প্লাস্টিক ভাঙে না। তাই মানুষ প্লাস্টিক কিনে।

কারণ ৩: রাস্তা-ব্রিজ, কিন্তু নদী মরে গেছে

১৯৭১ সালে নৌ-চলাচলযোগ্য নদী ছিল ২৪,০ কিমি। ২০২৫ সালে ৬,০ কিমি। [নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়]

হাট বেশিরভাগ নদীর পাড়ে বসত। নদী নাই, মাঝি নাই, হাট নাই।

কারণ ৪: নতুন প্রজন্মের আগ্রহ নাই

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ২০২৩ সালের জরিপ: গ্রামের ১৫-২৫ বছর বয়সীদের ৮৩% বলেছে, “হাটে যাওয়া সময় নষ্ট। দারাজে অর্ডার দেই।”

মাত্র ৭% হাতে বোনা কাপড় কিনতে আগ্রহী।

কারণ ৫: সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব*

ভারতের “ওয়ান ডিস্ট্রিক্ট ওয়ান প্রোডাক্ট” স্কিমে ২০২৪ সালে বাজেট ৫০ কোটি রুপি।

বাংলাদেশে লোকজ হাট পুনরুজ্জীবনে ২০২৪-২৫ বাজেটে বরাদ্দ মাত্র ৪৫ কোটি টাকা। [অর্থ মন্ত্রণালয়]

৫. হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু পণ্য না, কি হারালাম?

১. সামাজিক বন্ধন হারাল:

হাট ছিল সপ্তাহের মিলনমেলা। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান একসাথে দরদাম করত। এখন সবাই আলাদা দোকানে, আলাদা স্ক্রিনে।

২. লোকসংস্কৃতি হারাল:

হাটের একপাশে বসত বাউল। একতারা বাজিয়ে গাইত, “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।”

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির হিসাব: ২০০ সালে গ্রামে সক্রিয় বাউল দল ছিল ৩,২০০টি। ২০২৫ সালে ৮৯০টি। *৭২% কমেছে।

৩. খাবারের বৈচিত্র্য হারাল:

হাটে পাওয়া যেত ৫০ রকমের দেশি শাক, ২০ রকমের দেশি মাছ। এখন সুপারশপে ৫-৭ রকম।

ফল: বাংলাদেশে অপুষ্টি ও ডায়াবেটিস বেড়েছে। আইসিডিআরবি বলছে, ২০১ সালে ডায়াবেটিস ছিল ৯.৭%, ২০২3 সালে ১৩.১%।

৪. পরিবেশ হারাল:

মাটির হাঁড়ি ১০% বায়োডিগ্রেডেবল। প্লাস্টিক ৫০ বছর থাকবে।

হাট মরে গেলে প্লাস্টিক বাড়বে। এটা সরল হিসাব।

৬. ধর্ম-বিশ্বাসের হাটও ছিল

মুসলিম হাট: ঈদের আগে টুপি, আতর, তসবির হাট।

হিন্দু হাট: দুর্গাপূজার আগে মাটির প্রতিমা, ধুনুচি, শাঁখার হাট।

বৌদ্ধ হাট: বুদ্ধ পূর্ণিমায় ফানুস, প্রার্থনার পতাকার হাট।

খ্রিস্টান হাট: বড়দিনে ক্রিসমাস ট্রি, কেকের হাট।

এখন সব অনলাইনে। কারিগর নাই, কারখানা আছে। বিশ্বাসের জিনিসে মাটির গন্ধ নাই।

৭. কি করা যায়? সমাধান + তথ্যের ভিত্তিতে রোডম্যাপ

প্রস্তাব ১: “ঐতিহ্যের হাট” আইন ও বাজেট*

ভারতের মতো ১০ কোটি টাকার তহবিল। প্রতি ইউনিয়নে ১টি মডেল হাট। সরকারি জমি, শেড, পানি, বিদ্যুৎ ফ্রি।

প্রস্তাব ২: ই-কমার্সে হাট

“Digital Haat Bangladesh” নামে সরকারি প্ল্যাটফর্ম। কুমোর, তাঁতি সরাসরি বিক্রি করবে। মধ্যস্বত্বভোগী নাই। ভারতের GeM পোর্টালের মতো।

প্রস্তাব ৩: স্কুল-কলেজে বাধ্যতামূলক ভিজিট

প্রতি স্কুলে বছরে ২ বার “হাট দিবস”। ছাত্ররা মাটির জিনিস কিনবে, বাউলের গান শুনবে। নম্বর থাকবে।

প্রস্তাব ৪: প্লাস্টিকের উপর কর, মাটির উপর ছাড়

প্লাস্টিক পণ্যে ১৫% ভ্যাট। মাটি-বাঁশ-পাটের পণ্যে ০% ভ্যাট। দাম সমান হবে, মানুষ মাটি কিনবে।

প্রস্তাব ৫: পর্যটনের সাথে জোড়া

“Heritage Haat Tourism”। বিদেশি পর্যটক হাট দেখতে আসবে। কারিগরের বাড়িতে থাকবে। ভারতের কচ্ছ হাট মডেল।

৮. রাজনৈতিক ও পরিবেশ বিশ্লেষণ

রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে বলি:

হাট মরে গেলে গ্রামের অর্থনীতি মরে যায়। গ্রাম মরে গেলে শহর বাঁচে না। কারণ শহরের খাবার আসে গ্রাম থেকে। কর্মী আসে গ্রাম থেকে।

হাট বাঁচানো মানে গ্রাম বাঁচানো। গ্রাম বাঁচানো মানে বাংলাদেশ বাঁচানো।

আমার জন্ম জেলার কুশলী হাট অনেক বিখ্যাত ছিল। ঘোনাপাড়া হাট ও বর্ণির হাট। আর নেই মরে গেছে। বুকের মধ্যে কেমন যেন ছ্যাৎ করে ওঠে। কতো স্মৃতি ছিল।বাগেরহাট জেলার মোল্লার

হাট উপজেলার উদয়পুর হাটের কথা মনে পড়ে। আশে পাশে হাটের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত ছিল। এই হাট গলোতে  মানুষের ভিড়ে গম গম করছে।  কেউ হারিয়ে গেলে বা চোখ থেকে একটু অদৃশ্য হলে খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। কুশলী হাটে ৩ টাকা দিয়ে চুল কাটিয়েছি। প্রতি হাটে যাওয়াটা ঈদের  আনন্দের মত মনে হতো।কতো শত হাটের স্মৃতি আমার মত লক্ষ কোটি মানুষের আছে যা অল্প কথায়  প্রকাশ করা কঠিন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সরকারের সময় সারাদেশের হাট গুলোর পরিবেশ উন্নত করেছিলেন। কিন্তু হাটে মানুষ ফেরানো উদ্যোগ নিতে হবে।    পরিবেশ কর্মী হিসেবে বলি:

একটা মাটির কলসি = ০ কার্বন ফুটপ্রিন্ট।

একটা প্লাস্টিকের বোতল = ৮২ গ্রাম CO2। [UNEP 2022]

আমরা যদি বছরে ১ কোটি প্লাস্টিকের বদলে মাটির জিনিস কিনি, ৮২০ টন CO2 বাঁচবে।

হাট ফেরানো মানে আত্মা ফেরানো।হাট হারিয়ে গেলে বাংলাদেশের ছবি থেকে রং মুছে যায়।

বটতলা খালি হয়ে যায়।

বাউলের একতারা নীরব হয়ে যায়।

কুমোরের চাকা থেমে যায়।

নদীর পাড় শুনশান হয়ে যায়।

হাট ফেরাতে হবে। কারণ হাট শুধু বাজার না। হাট হলো বাংলাদেশের হৃদয়।

কারণ শেকড় ছাড়া গাছ বাঁচে না। আর হাট ছাড়া গ্রাম বাঁচে না।

লেখক- সরদার সেলিম রেজা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পরিবেশ কর্মী, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: বাংলাদেশ ইতিহাস ঐতিহ্য কেন্দ্র।

এই শাখার আরও খবর

ঢামেকের নারী শৌচাগার থেকে হিন্দু নার্সের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার, যা জানা যাচ্ছে

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের পুরোনো ভবনের নিচতলার একটি নারী শৌচাগার থেকে তন্ময়ী মণ্ডল নামে এক নার্সের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিনি রাজধানীর বারডেম…

মধ্যরাত থেকে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, বন্ধ ইলিশ আহরণ

ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় আজ বুধবার (৭ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে শুরু হচ্ছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর ও নদ-নদীতে…

তিন কাউন্সিলর নিয়েই ইংরেজবাজার পুরসভা বিজেপির দখলে

মালদহ জেলা পরিষদের পর এবার ইংরেজবাজার পুরসভাও দখলে নিল বিজেপি। বুধবার চেয়ারম্যান নির্বাচনের ভোটাভুটিতে বিজেপি প্রার্থী অম্লান ভাদুড়িকে সমর্থন করেন তৃণমূল থেকে ‘নির্দল’ হওয়া ১১…

শর্তসাপেক্ষে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার ইঙ্গিত সরকারের

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশের সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তবে এ ধরনের প্রক্রিয়া শুরুর আগে…

রামেবির ভিসিকে ‘মব’ সৃষ্টি করে পদত্যাগ: বিএনপি নেতা গ্রেপ্তার

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হককে একদল মানুষ জোরপূর্বক ঘেরাও করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আব্দুস সালাম (৫৬)…

গণপতি পরিবার হত্যাকাণ্ড: দেড় মাসেও কাটেনি ভয়, এলাকায় নেই পূজার আমেজ

রংপুর নগরীর হিন্দু অধ্যুষিত মাছুয়াপাড়া মহল্লায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও একমাত্র ছেলেকে হত্যার ঘটনায় দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও আতঙ্ক কাটেনি স্থানীয়…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au