মেলবোর্ন, ১৬ জুলাই- ১৬ জুলাই, ২০২৫ সেদিন গোপালগঞ্জের আকাশ থমথমে ছিল। সকাল থেকেই শহরের অলিগলিতে উত্তেজনা। জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির কর্মসূচিকে ঘিরে যে সংঘাতের শঙ্কা ছিল, দুপুর গড়াতে না গড়াতেই তা রক্তক্ষয়ী রূপ নেয়। স্লোগান-পাল্টা স্লোগান, ইট-পাটকেল, আগুন—সব মিলে শান্ত শহর মুহূর্তে রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে। বিকেলে সেনাবাহিনী নামে, রাতে জারি হয় কারফিউ। পুরো ঘটনা লাইভে দেখে স্তব্ধ হয়ে যায় দেশবাসী।
১. গোপালগঞ্জ: শান্তির শহরে উসকানি কেন ⁉️
বাংলাদেশের সব জেলা শহরের চেয়ে গোপালগঞ্জ শহর সবচেয়ে নিরাপদ, সবচেয়ে শান্তির। এখানে কোনো সন্ত্রাস নেই। সব ধর্মের মানুষ, সব রাজনৈতিক দল এখানে শত বছর ধরে ভাই-ভাই হয়ে বসবাস করে। এটা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মাটি। এখানে বিভেদের রাজনীতি কখনো স্থান পায়নি।
তাহলে সেই শান্তির শহরে এসে কেন উসকানি দিতে হবে ⁉️
শুরুটা হয়েছিল কথার আঘাত দিয়ে। গোপালগঞ্জের পবিত্র মাটিতে দাঁড়িয়ে কোন সাহসে, কোন ধৃষ্টতায় তারা স্লোগান দিলো— “শেখ মুজিব মুর্দাবাদ, শেখ হাসিনা মুর্দাবাদ, আওয়ামী লীগ মুর্দাবাদ, গোপালগঞ্জ মুর্দাবাদ” ⁉️
এটা শুধু রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না। এটা ছিল একটি জাতির ইতিহাস, একটি জেলার আত্মমর্যাদা আর ৩০ লাখ শহীদের রক্তের প্রতি চরম অবমাননা। গোপালগঞ্জ মানে বঙ্গবন্ধুর জন্মভূমি। গোপালগঞ্জ মানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। সেই পবিত্র মাটিতে দাঁড়িয়ে “গোপালগঞ্জ মুর্দাবাদ” বলা মানে ১৭ কোটি বাঙালির হৃদয়ে ছুরি চালানো।
অভিযোগ উঠেছে, এরা আসলে মৌলবাদী রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা একটি জনগোষ্ঠী। “কোটা না মেধা” বলতে বলতে, “ক্ষমতা না জনতা” বলতে বলতে এরা রাজপথ কাঁপিয়েছে। এরপর সেই আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে এরাই জাতীয় সংসদ সদস্য হয়েছে, রাষ্ট্রক্ষমতার স্বাদ পেয়েছে। আজ তারাই রাষ্ট্র, সংবিধান আর দেশ নিয়ে বড় বড় কথা বলে।
কিন্তু যারা দেশের ইতিহাসকে অস্বীকার করে, জাতির পিতাকে অবমাননা করে, তাদের মুখে গণতন্ত্রের কথা মানায় না। যদি রাজনীতি হয় সংলাপ, তবে এটা রাজনীতি নয়—এটা উসকানি, এটা পরিকল্পিত প্রতিশোধের খেলা।
তাই মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। এটা প্রতিশোধ নয়, এটা নিজেদের সম্মান, ইতিহাস আর পরিচয় রক্ষার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু প্রতিক্রিয়া যখন সহিংসতায় গড়ায়, তখনই সুযোগ নেয় তৃতীয় পক্ষ।
২. রাষ্ট্রীয় গুলি: একাত্তরের ছায়া ২০২৫ এ ⁉️
সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্য দেখা যায় সেনাবাহিনী মাঠে নামার পর। লাইভ ফুটেজে সমগ্র জাতি দেখেছে— গুলি চলছে। সেদিন ৫ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান, আহত হন ছয় শতাধিক।
প্রশ্ন একটাই: গোপালগঞ্জের পবিত্র মাটিতে কেন রক্ত ঝরলো? কেন নিরস্ত্র মানুষের ওপর একাত্তরের পাকিস্তানি বাহিনীর মতো গুলি চালাতে হবে? ৫৪ বছর পর স্বাধীন বাংলাদেশে, নিজের দেশের মাটিতে, নিজের সেনাবাহিনীর গুলিতে সাধারণ মানুষের মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সেনাবাহিনীর কাজ রক্ষা করা, দমন করা নয়। ভিড় সরাতে কাঁদানে গ্যাস, জলকামান, আলোচনা—এসব পথ থাকতেও কেন তা ব্যবহার হলো না ⁉️
ইউনুসের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুলি চালানোর নির্দেশদাতা কে ⁉️ দেশবাসী জানতে চায়।
আরও ভয়ংকর প্রশ্ন: যারা “মব ভায়োলেন্স” করে পরিস্থিতি অস্বাভাবিক করলো, স্লোগানের নামে অবমাননা করলো তাদের না ধরে কেন গোপালগঞ্জের সাধারণ মানুষের বুকেই গুলি চালানো হলো ⁉️ দেশবাসী মিডিয়ার মাধ্যমে দেখেছে কিভাবে উসকানিদাতাদের সেনাবাহিনীর এপিসিতে করে কঠোর নিরাপত্তায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র যাদের রক্ষা করার কথা তাদের বিরুদ্ধে গুলি চালালো, আর যারা উসকানি দিলো তাদের নিরাপত্তা দিলো— এর পেছনের উদ্দেশ্য কী ⁉️
৩. মামলা, গ্রেপ্তার আর দ্বিমুখী বিচার
ঘটনার পরের চিত্র আরও হতাশাজনক। গোপালগঞ্জের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা, চলে গ্রেপ্তার। গুলি চালানোর পর গোপালগঞ্জের প্রায় ১০ হাজার মানুষের নামে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তারা কি গুলি ছুড়েছিল? কাউকে পিটিয়ে মেরেছিল ⁉️
যারা রাস্তায় নেমেছিল তারাই আজ কারাগারে। অথচ যারা গুলি চালাল, যারা উসকানি দিলো তাদের দায় নিয়ে রয়েছে নীরবতা। আহত তিন শতাধিক, অথচ আসামি হলো ভুক্তভোগীরাই—এটাকে কি বিচার বলা যায় ⁉️
এই দৃশ্য দেখলে মনে পড়ে যায় ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম দিনলিপি। ভুক্তভোগীকেই আসামি বানানো, এটা কোন সভ্য রাষ্ট্রের চিত্র হতে পারে⁉️
আরও কষ্টের বিষয়, বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলো সব দেখেও চুপ। লাইভে দেখল, কিন্তু একটি কথাও বলল না। যারা শান্তি ও মানবতার কথা বলেন সেই ফেরিওলারা কই? ক্ষমতাবানরা যখন নীরব থাকে, তখন অন্যায়ই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। বিবেক কেন নীরব—এই প্রশ্নের জবাব আজও অজানা।
৪. রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: পরিকল্পিত সংঘাত ⁉️
অভিযোগ উঠেছে, এনসিপি দল গড়ে উঠেছে অবৈধ অসাংবিধানিক ইউনুস সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায়। সেনাবাহিনী প্রোটোকল দিয়েছে। মাঠে স্বাধীনতাবিরোধী কিছু ছাত্রের উপস্থিতির কথাও শোনা যায়।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ১৬ জুলাই কি সত্যিকারের রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল, নাকি গোপালগঞ্জকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পিত সংঘাতের মঞ্চ ⁉️
গোপালগঞ্জ শুধু একটি জেলা নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে যা ঘটে, তার প্রভাব পড়ে সারা দেশে। গোপালগঞ্জকে কলঙ্কিত করতে পারলে পুরো বাংলাদেশকে কলঙ্কিত করা যায়— এমন নীল নকশার অংশই কি ছিল ১৬ জুলাই ⁉️
৫. আমাদের দাবি: স্মরণ, বিচার ও ক্ষতিপূরণ
৫ টি প্রাণ আর ফিরবে না। আহতদের ক্ষতও সহজে শুকাবে না। কিন্তু ন্যায়বিচার না হলে ক্ষতটা আরও গভীর হবে। রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো রাষ্ট্র টিকতে পারে না।
তাই জাতির কাছে আমাদের স্পষ্ট ৬ টি দাবি:
১.জাতীয়ভাবে ১৬ জুলাইকে “গোপালগঞ্জ গণহত্যা দিবস” হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। দিবস মানে উৎসব নয়, দিবস মানে স্মরণ। যেন আর কখনো এমন রক্ত না ঝরে। ইতিহাসের পাতায় দিনটি লাল কালিতে লিখে রাখতে হবে।
২. ভুক্তভোগী শহীদ পরিবারকে প্রত্যেককে ৫ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। রাষ্ট্রের গুলিতে প্রাণ গেছে, রাষ্ট্রকেই দায় নিতে হবে।
৩.আহত প্রত্যেককে ৫ লাখ টাকা করে চিকিৎসা সহায়তা দিতে হবে। যারা পঙ্গু হয়েছে, যাদের সংসার ভেঙেছে তাদের দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
৪.সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করে দোষীদের চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে। কারা এই ঘটনা ঘটালো, মাঠ পর্যায়ে কারা ছিল, এবং সবচেয়ে বড় কথা— কে নির্দেশ দিল—তা জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে।
৫. নিরীহ ১০ হাজার মানুষের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
৬.শহীদদের স্মরণে গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মুখে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে একটি স্থায়ী ” চির অম্লান ভাস্কর্য” নির্মাণের প্রস্তাব করছি।
গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধুর মাটি। এখানে রাজনীতি হবে, প্রতিযোগিতা হবে, বিতর্ক হবে। কিন্তু তা হতে হবে ইতিহাসকে শ্রদ্ধা করে, মানুষকে সম্মান করে। রক্ত দিয়ে নয়, সংলাপ দিয়ে।
গোপালগঞ্জে গণহত্যার দায় কার ⁉️ আমাদের বিবেক নীরব কেন ⁉️
এই দুটি প্রশ্নের উত্তর না মেলা পর্যন্ত জাতি স্বস্তি পাবে না। আমরা যেন গোপালগঞ্জের গণহত্যার কথা ভুলে না যাই। ভুলে গেলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। শহীদের আত্মার চির শান্তি কামনা করছি।