মেলবোর্ন, ১৬ জুলাই- বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের প্রতি মানুষের ইতিবাচক মনোভাব এখন বেশি বলে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের সর্বশেষ বৈশ্বিক জরিপে। ২০০২ সালে এই জরিপ শুরু হওয়ার পর এবারই প্রথম এত বেশি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনকে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে বিশ্বের ৩৬টি দেশের ৪২ হাজারের বেশি মানুষের মতামতের ভিত্তিতে জরিপটি পরিচালনা করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং দুই দেশের নেতাদের প্রতি আস্থার বিষয়েও মতামত নেওয়া হয়।
জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, অংশ নেওয়া ৩৬টি দেশের মধ্যে ২৫টিতে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশকারীর সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি। অন্যদিকে মাত্র ছয়টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের চেয়ে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখা হয়েছে। দেশগুলো হলো পোল্যান্ড, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, জাপান ও ইসরায়েল, যাদের বেশির ভাগই যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চীন সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব আগের তুলনায় আরও কমেছে। একই সঙ্গে জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং উভয়ের প্রতিই সীমিত আস্থা প্রকাশ করেছেন। তবে বেশির ভাগ দেশে ট্রাম্পের তুলনায় শি চিনপিংয়ের ওপর তুলনামূলক বেশি আস্থা দেখা গেছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষক জনাথন শুলম্যান বলেন, গত দুই দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো সম্পর্কে জনমত নিয়ে কাজ করলেও এবারই প্রথম এত বেশি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনকে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখা হয়েছে। তিনি জানান, অতীতেও যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয়তা কমেছে, বিশেষ করে ২০০৮ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের শেষ সময় এবং ২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শুরুতে। তবে তখনও চীনের ভাবমূর্তি সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের সমান বা কিছুটা কম ছিল।
জরিপ অনুযায়ী, চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব সবচেয়ে বেশি বেড়েছে স্পেন, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, গ্রিস ও কানাডায়। এছাড়া ইতালি, স্পেন, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও তুরস্কে চীন সম্পর্কে ইতিবাচক মতামত ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মানুষ সাধারণভাবে চীনকে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তবে ধনী দেশগুলোতে চীন সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তুলনামূলক বেশি। এর ব্যতিক্রম সিঙ্গাপুর, যেখানে উচ্চ মাথাপিছু আয় থাকা সত্ত্বেও চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব শক্তিশালী। জরিপে সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক মত এসেছে পাকিস্তান থেকে, যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ চীনকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন। বিপরীতে সবচেয়ে কম ইতিবাচক মত এসেছে জাপান থেকে, যেখানে মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ চীন সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা প্রকাশ করেছেন।
বিশ্ব নেতাদের প্রতি আস্থার প্রশ্নে দেখা গেছে, শি চিনপিংয়ের প্রতি সবচেয়ে বেশি আস্থা প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের মানুষ। সেখানে তার প্রতি আস্থার হার ৮৩ শতাংশ। অন্যদিকে সবচেয়ে কম আস্থা দেখা গেছে জাপানে, যেখানে মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ তার ওপর আস্থা রাখেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি সবচেয়ে বেশি আস্থা প্রকাশ করেছেন ফিলিপাইনের নাগরিকরা, যেখানে তার প্রতি আস্থার হার ৬৮ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম আস্থা দেখা গেছে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে, যেখানে মাত্র ৪ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন।
জরিপে আরও উঠে এসেছে, এখনো বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষ মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র সরকার চীনের তুলনায় নিজেদের নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে বেশি সম্মান করে। তবে এই ব্যবধান আগের তুলনায় কমেছে। অন্যদিকে মধ্যম আয়ের কয়েকটি দেশে করা অতিরিক্ত জরিপে ৭৫ শতাংশ মানুষ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করে। একই প্রশ্নে চীনের ক্ষেত্রে এই মত দিয়েছেন ৪৫ শতাংশ মানুষ।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন, সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রবণতা এবং অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেক দেশ এখন চীনকে তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। তবে একই সঙ্গে শি চিনপিংয়ের নেতৃত্ব, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগও বহাল রয়েছে।
সুত্রঃ বিবিসি