মেলবোর্ন, ১৭ জুলাই- অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (এএনইউ) ২০২৪ সালে ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থী আন্দোলনের সময় ইহুদি শিক্ষার্থী ও কর্মীদের মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার কথা স্বীকার করে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছে। দেশটির ইহুদিবিদ্বেষ ও সামাজিক সংহতি বিষয়ক রয়্যাল কমিশনের শুনানিতে এএনইউর ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য রেবেকা ব্রাউন এই দুঃখ প্রকাশ করেন।
শুনানিতে রেবেকা ব্রাউন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রত্যেক ইহুদি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মীর নিরাপদ, সম্মানজনক এবং স্বাধীন পরিবেশে পড়াশোনা ও কাজ করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের ঘটনায় তারা সেই নিরাপত্তা ও স্বস্তি অনুভব করতে পারেননি। এজন্য তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি যাতে আর সৃষ্টি না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত এএনইউ ক্যাম্পাসে টানা ১১০ দিন ধরে ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান কর্মসূচি চলে, যা অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে দীর্ঘতম ক্যাম্পাস আন্দোলন হিসেবে পরিচিত। রয়্যাল কমিশনের শুনানিতে উঠে এসেছে, ওই সময় ইসরায়েলবিরোধী ও জায়নবাদবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান এবং কিছু আচরণ ইহুদি শিক্ষার্থী ও কর্মীদের মধ্যে ভয়, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছিল।
শুনানিতে এক ইহুদি শিক্ষার্থী লিয়াত অভিযোগ করেন, আন্দোলনের সময় তাকে “শিশু হত্যাকারী” এবং “গণহত্যার সমর্থক” বলে অপমান করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রোভোস্ট জোয়ান লিচ এসব মন্তব্যকে ইহুদিবিদ্বেষমূলক বলে স্বীকার করেন এবং বলেন, কোনো শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসে এ ধরনের হয়রানির শিকার হওয়া উচিত নয়।
রয়্যাল কমিশনে আরও একটি ঘটনাও আলোচনায় আসে। সেখানে জানানো হয়, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে স্বজন হারানো এক শিক্ষার্থী পরীক্ষার সময় বাড়ানোর আবেদন করলে তার কাছে নিহত স্বজনদের মৃত্যুসনদ চাওয়া হয়েছিল। বিষয়টি সম্পর্কে আগে অবগত না থাকলেও জোয়ান লিচ বলেন, এমন আচরণ অনুচিত এবং এতে মানবিক সহানুভূতির অভাব স্পষ্ট।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংগঠনের এক অনলাইন সভায় নাৎসি স্যালুট ও নাৎসি গোঁফের ভঙ্গি প্রদর্শনের অভিযোগও শুনানিতে উঠে আসে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তে অভিযোগগুলোর পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ না পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয়নি।
রয়্যাল কমিশনকে এএনইউ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের আচরণবিধি পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। কর্মীদের জন্য ‘রাইটস অ্যান্ড রেসপেক্ট অ্যাট ওয়ার্ক’ নামে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ চালু করা হয়েছে, যেখানে ইহুদিবিদ্বেষসহ সব ধরনের বর্ণবাদ ও বৈষম্য মোকাবিলার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্যও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও ‘বাইস্ট্যান্ডার ট্রেনিং’ চালু করা হয়েছে, যাতে বৈষম্য ও হয়রানির ঘটনা প্রতিরোধ করা যায়।
একই শুনানিতে মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শ্যারন পিকারিং বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকতে হবে, তবে সেই স্বাধীনতার চর্চা হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও সহনশীলতার ভিত্তিতে। তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে, কিন্তু কোনো শিক্ষার্থী যেন নিজেকে ভয় বা বৈষম্যের শিকার মনে না করেন, সেটি নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম দায়িত্ব।
রয়্যাল কমিশনের শুনানি এখনো চলমান রয়েছে। আগামী অধিবেশনগুলোতে অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষা বিভাগ, উচ্চশিক্ষা মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা সাক্ষ্য দেবেন। কমিশনের লক্ষ্য হলো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ইহুদিবিদ্বেষ, বৈষম্য ও সামাজিক সম্প্রীতির পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর সুপারিশ প্রণয়ন করা।