রাজশাহীর পবায় শিশুকে যৌন হয়রানির অভিযোগে জামায়াতের রোকন আটক
মেলবোর্ন,০১আগস্ট: রাজশাহীর পবা উপজেলায় ৯ বছর বয়সী এক শিশুকন্যাকে যৌন হয়রানির অভিযোগে ওমর ফারুক নামের এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। তিনি জামায়াতে ইসলামীর বড়গাছি ইউনিয়নের একটি…
মেলবোর্ন, ৩১ জুলাই: ইউরোপে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশের তরুণদের পাচারের একটি ভয়ংকর নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। ইতালি পাঠানোর কথা বলে যুবকদের লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে জিম্মি, নির্যাতন এবং পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণের টাকা আদায় করছে সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র। ডেনমার্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জার্মানির রবার্ট বোশ স্টিফটুং ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টারের (এমএমসি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশ থেকে লিবিয়া হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত এই পাচার কার্যক্রম অন্তত পাঁচটি স্তরে পরিচালিত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পাচারকারী চক্র কোনো একক ব্যক্তি বা ছোট দলের মাধ্যমে পরিচালিত নয়। এটি একটি সুসংগঠিত বহুস্তরীয় নেটওয়ার্ক, যেখানে স্থানীয় দালাল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সহযোগীরাও যুক্ত রয়েছে।
গাজীপুরের কাপাশিয়ার বাসিন্দা মাসুম মোল্লার ঘটনা এই পাচার চক্রের ভয়াবহতার একটি উদাহরণ। নরসিংদীর পলাশে একটি ওয়ার্কশপে কাজ করার সময় তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় মুন্সীগঞ্জের মোজাম্মেলের। তিনি মাসুমকে ইতালি যাওয়ার প্রলোভন দেখান এবং রাজধানীর গুলশানের হাওলাদার ট্রাভেলসের মালিক মুন্না হাওলাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন।
মাসুমকে বলা হয়েছিল, ১৪ লাখ টাকা দিলে দুবাই হয়ে তাঁকে ইতালি পৌঁছে দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে তাঁকে দুবাই থেকে পাঠানো হয় লিবিয়ায়। সেখানে একটি চক্র তাঁকে জিম্মি করে নির্যাতন চালায় এবং সেই ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে ৪০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরে পরিবার বাধ্য হয়ে টাকা পরিশোধ করে।
এমএমসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাচারকারী চক্রের প্রথম স্তরে রয়েছে স্থানীয় দালালরা। এরা সাধারণত গ্রামের পরিচিত ব্যক্তি, আত্মীয় কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত। চায়ের দোকান, সামাজিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় জমায়েতসহ বিভিন্ন জায়গায় তারা বিদেশে গিয়ে সফল হওয়ার গল্প শুনিয়ে তরুণদের আকৃষ্ট করে। পরে তাদের কাছ থেকে পাসপোর্ট ও টাকা সংগ্রহ করে।
দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে ট্রানজিট দালালরা। এরা সাধারণত দুবাই, মিসর বা তুরস্কে অবস্থান করে। তাদের কাজ হলো বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অভিবাসীদের বিমানবন্দর থেকে গ্রহণ করা, ভিসার ব্যবস্থা করা এবং লিবিয়ায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা।
তৃতীয় স্তরে রয়েছে লিবিয়াভিত্তিক বাংলাদেশি দালালরা। তারা লিবিয়ার বেনগাজি ও ত্রিপোলি বিমানবন্দরে অভিবাসীদের গ্রহণ করে। এরপর স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহযোগিতায় তাদের ‘সেফ হাউস’ বা ‘গেম হাউসে’ আটকে রাখা হয়।
চতুর্থ স্তরে রয়েছে লিবিয়ার স্থানীয় গেম অপারেটররা। উপকূলীয় এলাকা থেকে নৌকায় করে ইউরোপে পাঠানোর চূড়ান্ত দায়িত্ব তাদের হাতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে তারা অভিবাসীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায়।
পঞ্চম স্তরে রয়েছে ইতালিতে অবস্থানকারী সহযোগী চক্রের সদস্যরা। তারা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে আশ্বস্ত করে যে, টাকা দিলে দ্রুত ইতালি পৌঁছানো যাবে। এভাবেই জিম্মি ব্যক্তির পরিবারের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, পাচারকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে ‘ইতালি যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ’ বা ‘সহজে ইউরোপে যাওয়ার ব্যবস্থা’ ধরনের বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা আগ্রহীদের আকৃষ্ট করে। যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করা হয় ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপ, কারণ এসব মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে বৈধ লাইসেন্সধারী কিছু প্রতিষ্ঠানও গোপনে পাচারকারী চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। কোনো একটি রুট বন্ধ হয়ে গেলে চক্রটি দ্রুত নতুন পথ ব্যবহার করে, যেমন ভারত বা শ্রীলঙ্কা হয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করে।
ইতালি সরকারের কৃষি ও পর্যটন খাতে শ্রমিক নেওয়ার ঘোষণাকেও প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে পাচারকারীরা। তারা ভুয়া নিয়োগপত্র দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে ইতালিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনও বেড়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে যেখানে এমন আবেদনের সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ৪৪৮টি, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৩৯০টিতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের সংকট এবং উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা অনেক তরুণকে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে। আগে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো জনপ্রিয় গন্তব্য হলেও বর্তমানে কম মজুরি ও কঠিন কর্মপরিবেশের কারণে অনেকেই ইউরোপমুখী হচ্ছেন।
সম্প্রতি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর থানায় ইতালি পাঠানোর নামে মানবপাচারের একটি মামলা হয়েছে। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, জগন্নাথপুর উপজেলার কামরুজ্জামান নামের এক যুবককে ইতালি পাঠানোর কথা বলে ১৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে তাঁকে মিসর হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে একটি অজ্ঞাত স্থানে আটকে নির্যাতন করা হয়।
মামলায় সিলেট মহানগরীর জালালাবাদ থানার হাওলাদারপাড়া এলাকার শিপন আহমদ এবং দিরাই উপজেলার ফজলুর রহমানসহ কয়েকজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, টাকা ফেরত চাইলে তাদের হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। সুনামগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (জগন্নাথপুর সার্কেল) মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তদন্ত সংস্থা পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
মানবপাচার বন্ধে গবেষণা প্রতিবেদনে সরাসরি নিয়োগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া সহজ করা, দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিদেশে যাওয়ার আগে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au