নেপালের সেই সুড়ঙ্গে আর কেউ বেঁচে নেই:কাদায় চাপা পড়েছে সব, ভেঙেছে ছাদও
নেপালের ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের যে সুড়ঙ্গ থেকে শুক্রবার দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল, সেখানে আর কেউ বেঁচে নেই বলে নিশ্চিত হয়েছেন উদ্ধারকারীরা। সুড়ঙ্গের শেষ…
মেলবোর্ন, ৩ আগস্ট: ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের লিবিয়ায় পাচার, সেখানে জিম্মি করে নির্যাতন এবং পরিবারের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়। সেই অর্থ দেশে এনে বাড়ি, গাড়ি, গরুর খামারসহ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বলছে, গত পাঁচ বছরে চক্রটির ব্যবহৃত বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ৩৭৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে।
এ ঘটনায় গত ১৩ এপ্রিল আলাউদ্দিন শেখ, আওয়াল ফরাজীসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে সিআইডি। তদন্তে উঠে এসেছে, দেশের অন্তত ১১ জেলায় বিস্তৃত একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মানব পাচার, মুক্তিপণ আদায় ও হুন্ডি কারবার পরিচালনা করত চক্রটি।
গ্রামের কৃষিজীবী থেকে বিলাসী জীবন
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার সাতবাড়িয়া বাজারে আলাউদ্দিন শেখের দোতলা বাড়ি এখন এলাকায় আলোচনার বিষয়। বাড়ির চারপাশে উঁচু দেয়াল, সিসিটিভি ক্যামেরা, পাশেই গরুর খামার। আরও একটি বড় খামারের নির্মাণ চলছে। পরিবারের দাবি, খুলনাতেও তাঁর একটি বিলাসবহুল বাড়ি ও দামি গাড়ি রয়েছে।
আলাউদ্দিনের বাবা আলী শেখ বলেন, একসময় কৃষিকাজ করেই সংসার চলত। ছেলে বিদেশে যাওয়ার পর থেকেই পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হয়। তাঁর দাবি, ছেলে লিবিয়ায় ঠিকাদারির কাজ করতেন এবং শ্রমিকদের টাকা তাঁর ব্যাংক হিসাবে আসত।

লিবিয়ায় জিম্মি করে দেশে মুক্তিপণ আদায় করেন আলাউদ্দিন শেখ। নড়াইলের কালিয়ার সাতবাড়িয়া গ্রামে গরুর খামার।ছবি: সংগৃহীত
তবে সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য। তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য, লিবিয়ায় ভুক্তভোগীদের আটকে রাখা, নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায় এবং বাংলাদেশে থাকা সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করতেন আলাউদ্দিন।
একই গ্রামের আরেক সদস্য আওয়াল ফরাজীর বাড়িতেও গড়ে উঠেছে দৃষ্টিনন্দন দোতলা ভবন। তাঁর দুই ভাইও চক্রের সঙ্গে যুক্ত বলে মামলায় উল্লেখ রয়েছে। বর্তমানে আওয়াল আত্মগোপনে আছেন বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।
মুক্তিপণের টাকা ঘুরেছে ১১৪ ব্যাংক হিসাবে
সিআইডির তদন্তে দেখা গেছে, মুক্তিপণের অর্থ লুকাতে চক্রটি অন্তত ১১৪টি ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করেছে। এসব হিসাবে কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে।
শুধু চক্রের সদস্যরাই নন, তাঁদের স্বজন, পরিচিত ব্যক্তি, গৃহিণী, মুদিদোকানি, ওষুধ ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের হিসাবও ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতি লাখ টাকায় ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা কমিশনের বিনিময়ে এসব হিসাব ব্যবহার করত চক্রটি।
তদন্তে আরও জানা গেছে, মানব পাচার, মুক্তিপণ আদায় এবং হুন্ডি, এই তিন কার্যক্রম একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। অর্থের প্রকৃত উৎস গোপন রাখতে একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করা হয়েছে।
এক পরিবারের কাছ থেকেই নেওয়া হয় ৭৫ লাখ টাকা
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের আমেনা বেগম পরিবারের পাঁচ সদস্যকে ইতালি পাঠানোর আশায় দালালদের সঙ্গে ৯০ লাখ টাকার চুক্তি করেন। জমি বিক্রি ও ঋণ করে সেই টাকা পরিশোধও করেন।
কিন্তু ইতালির বদলে তাঁর স্বজনদের নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ায়। সেখানে তাঁদের জিম্মি করে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে আরও টাকা দাবি করা হয়। পরে তিনি মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যদের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ৭৫ লাখ টাকা পাঠান। এরপর তাঁদের ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পাঠানো হয়।
১১ জেলায় বিস্তৃত নেটওয়ার্ক
সিআইডি বলছে, আলাউদ্দিন শেখের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই চক্রের সদস্যরা দেশের ১১টি জেলায় সক্রিয় ছিলেন। স্থানীয় দালালরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা সংগ্রহ করতেন। পরে ভুক্তভোগীদের লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হতো।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, বিদেশ থেকে আসা অর্থ দেশে আনতে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে হুন্ডি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হতো। এ কাজে ব্যবহৃত ১৮টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করেছে সিআইডি। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদেরও মামলায় আসামি করা হয়েছে।
সিআইডির নজরে সম্পদের উৎস
সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মুহাম্মদ বাছির উদ্দিন বলেন, মানব পাচার, লিবিয়ায় জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় এবং হুন্ডি কারবারে জড়িত চক্রটির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাঁদের অর্জিত সম্পদের উৎস অনুসন্ধান চলছে।
ব্র্যাকের গবেষণায় ভয়াবহ চিত্র
অভিবাসন নিয়ে কাজ করা সংস্থা ব্র্যাকের গবেষণায় দেখা গেছে, লিবিয়া থেকে ফেরত আসা ৫৫৭ জন বাংলাদেশির মধ্যে ৮৯ শতাংশ সেখানে কোনো কাজ পাননি। ৬৩ শতাংশ পথে জিম্মি হয়েছেন এবং বন্দীদের ৯৩ শতাংশকে বিভিন্ন ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছিল। তাঁদের ৭৯ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, লিবিয়ায় শতাধিক নির্যাতনকেন্দ্র রয়েছে। সেখানে জিম্মি ব্যক্তিদের পরিবারের কাছ থেকে ৫ লাখ থেকে ৭৬ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ আদায় করা হয়। তাঁর মতে, মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যদের বিচারের পাশাপাশি তাঁদের অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদও বাজেয়াপ্ত করা উচিত।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au