মেলবোর্নের পুলম্যান হোটেলের ভেতরের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ২১ আগষ্ট: অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ক্লাব সিডনি সোয়ান্সের পাঁচ খেলোয়াড়কে ঘিরে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের ঘটনায় দুই নারী ক্ষতিপূরণ চেয়ে দেওয়ানি মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, মামলায় শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা, মানসিক ক্ষতি এবং আর্থিক ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করা হবে।
এদিকে অভিযোগের ঘটনায় সিডনি সোয়ান্সের পাঁচ খেলোয়াড়কে জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করেছে ভিক্টোরিয়া পুলিশ। তবে তদন্ত এখনো চলছে এবং এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা চার্জ গঠন করা হয়নি।
দুই নারীর আইনজীবীরা জানিয়েছেন, ভিক্টোরিয়ার সুপ্রিম কোর্টের কমন ল’ ডিভিশনে ক্লাব ও সংশ্লিষ্ট পাঁচ খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।
কার্বোন ল’ইয়ার্সের অংশীদার ম্যানি কার্বোন শুক্রবার বিকেলে অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম দ্য এইজকে বলেন, ‘আমরা বর্তমানে ঘটনাটির পরিস্থিতি তদন্ত করছি এবং ক্লাব ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মক্কেলরা অত্যন্ত মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। সোমবারের ঘটনার মাধ্যমে তাদের মর্যাদা ও ব্যক্তিগত অধিকার গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে বলে তারা মনে করছেন।’
দুই নারীর প্রতিনিধিত্বকারী আরেক আইনজীবী জন কারান্টজিস শুক্রবার সকালে মেলবোর্নের রেডিও স্টেশন 3AW-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হোটেলের কক্ষে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে একাধিক গুরুতর অভিযোগ করেন।
তিনি দাবি করেন, সোমবার সকালে মেলবোর্নের পুলম্যান হোটেলের একটি কক্ষে নারীদের সঙ্গে ‘অগ্রহণযোগ্য’ ও ‘অপমানজনক’ আচরণ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো আদালত বা পুলিশের তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
কারান্টজিস বলেন, ওই দুই নারী বর্তমানে ‘তীব্র মানসিক চাপ ও উদ্বেগের’ মধ্যে রয়েছেন এবং নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত। পরিস্থিতির কারণে তারা লোকচক্ষুর আড়ালে রয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
রেডিও উপস্থাপক টম এলিয়ট জানতে চান, প্রাপ্তবয়স্ক বিনোদনকর্মী হিসেবে নারীদের সঙ্গে খেলোয়াড়দের যে ধরনের সম্মত সম্পর্কের কথা ছিল, ঘটনা কি তার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল?জবাবে কারান্টজিস বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেটিই ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল।’ তবে তদন্তের স্বার্থে তিনি বিস্তারিত বলতে চাননি।
আইনজীবী আরও দাবি করেন, ওই কক্ষে পাঁচজনের বেশি পুরুষ ছিলেন এবং তাদের মধ্যে দলের কয়েকজন ‘নেতৃস্থানীয়’ ব্যক্তিও থাকতে পারেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দুই নারী এখন ঘটনার বিষয়ে ‘যথেষ্ট হয়েছে’ মনে করছেন এবং তারা ন্যায়বিচার ও নিজেদের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ চান। একই সঙ্গে কারা সেখানে ছিলেন এবং কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা ও ক্ষমা চাওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
তবে অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যমগুলো স্পষ্ট করে জানিয়েছে, আইনজীবীর এসব বক্তব্যকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না। এগুলো সংশ্লিষ্ট নারীদের পক্ষে তাদের আইনজীবীর করা অভিযোগমাত্র।
শুক্রবার সকালে সংবাদ সম্মেলনে সিডনি সোয়ান্সের প্রধান কোচ ডিন কক্সকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়, অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা হোটেল কক্ষে ক্লাবের অন্য কোনো কর্মকর্তা বা স্টাফ ছিলেন কি না।
কক্স বলেন, তিনি ওই কক্ষে ছিলেন না। অন্য কোনো ক্লাব কর্মকর্তা সেখানে ছিলেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি পুলিশের তদন্তাধীন।
পরে সিডনি সোয়ান্স এক বিবৃতিতে দাবি করে, ক্লাবের নিজস্ব তদন্তে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুলিশের তদন্তের কেন্দ্রে থাকা কক্ষে ক্লাবের পাঁচ খেলোয়াড় ছাড়া অন্য কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না।
বিবৃতিতে বলা হয়, এর বিপরীত যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোকে মিথ্যা বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ তাদের রয়েছে। পুলিশি তদন্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে এ বিষয়ে আর মন্তব্য না করার কথাও জানিয়েছে ক্লাবটি।
একই সঙ্গে ‘ভুল তথ্য’ প্রচারের অভিযোগ তুলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজেদের আইনি অবস্থান পর্যালোচনা করার কথাও জানিয়েছে সোয়ান্স।
দুই নারীর আইনজীবীর অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিন কক্স বলেন, নারীদের প্রতি সম্মান তার কাছে সর্বোচ্চ গুরুত্বের বিষয়।
তিনি বলেন, কোনো আইনজীবী তদন্তাধীন একটি ঘটনা নিয়ে কী বলেছেন, সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে পারবেন না। তবে নারীদের প্রতি সম্মানের ক্ষেত্রে তার অবস্থান সবসময়ই স্পষ্ট এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সিডনি সোয়ান্স রোববার রাতে মেলবোর্নে এসেছিল এসেনডনের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে। ম্যাচের পর বিমানবন্দরের কারফিউয়ের কারণে দলটি সিডনিতে ফিরতে পারেনি এবং মেলবোর্নেই থাকতে হয়।

যৌন নিপীড়নের অভিযোগের ঘটনায় কেন্দ্রীয়ভাবে রয়েছেন আইজ্যাক হেনি। ছবি: ফিল হিলিয়ার্ড।
অভিযোগ রয়েছে, দলের কয়েকজন খেলোয়াড় ভোর পর্যন্ত মদ্যপান করেন। পরে তারা পুলম্যান হোটেলে ফিরে যান এবং সেখানে প্রাপ্তবয়স্ক বিনোদনকর্মীদের ডাকার ব্যবস্থা করা হয়।
এরপর হোটেলের একটি কক্ষে কী ঘটেছিল, তা নিয়েই যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর পুলিশকে ডাকা হয় এবং তদন্ত শুরু হয়।
ঘটনার পর সিডনি সোয়ান্স পাঁচ খেলোয়াড়কে ক্লাবের আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে মৌসুমের বাকি সময়ের জন্য দল থেকে সরিয়ে দিয়েছে। তারা হলেন নিক ব্লেকি, জেমস জর্ডান, আইজ্যাক হেনি, চ্যাড ওয়ার্নার এবং রাইলি বাইস।
তবে তাদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে এখনো কোনো ফৌজদারি চার্জ গঠন করা হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইজ্যাক হেনিকে অভিযোগের তদন্তের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এখন পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি এবং পুলিশের আনুষ্ঠানিক জিজ্ঞাসাবাদও শেষ হয়নি।
ভিক্টোরিয়া পুলিশের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হোটেলের ওই কক্ষে ঠিক কী ঘটেছিল এবং কারা এতে জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
সূত্র-নিউজ.কম.এইউ