বাংলাদেশ

দেশপ্রেম, সাহসিকতা ও অধিকার আদায়ের আলোকবর্তিকা: বীরউত্তম মেজর জেনারেল সি আর দত্ত

মতামতঃ মানিক লাল ঘোষ 

  • 7:58 pm - August 25, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৭১৯ বার
মতামতঃ মানিক লাল ঘোষ 

মেলবোর্ন, ২৫ আগষ্ট- বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, সামরিক ইতিহাস এবং একটি অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণের অভিযাত্রায় যে কজন মানুষ চিরকাল উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন, মেজর জেনারেল চিত্ত রঞ্জন দত্ত-সবার পরিচিত সি আর দত্ত-তাঁদের অন্যতম। তিনি ছিলেন শুধু একজন পেশাদার সামরিক কর্মকর্তা কিংবা খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা নন; তিনি ছিলেন আজীবন এক লড়াকু দেশপ্রেমিক। দেশের প্রতিটি সংকটে, মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে এবং মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি সাহস, নিষ্ঠা ও নেতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি আসামের শিলংয়ে জন্মগ্রহণ করেন সি আর দত্ত। তাঁর পৈতৃক নিবাস হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশি গ্রামে। ১৯৫১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর ১৯৫২ সালে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করে তিনি তাঁর সামরিক দক্ষতা ও বীরত্বের পরিচয় দেন।

১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি যখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার চূড়ান্ত লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়, তখন দেশের টানে সি আর দত্তও যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। মুজিবনগর সরকার সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ৪ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পান। সিলেটের পূর্বাঞ্চল ও পার্শ্ববর্তী এলাকা নিয়ে গঠিত এই সেক্টরে তিনি প্রায় দুই হাজার নিয়মিত সেনা ও আট হাজারের মতো গেরিলাযোদ্ধাকে দক্ষতার সঙ্গে নেতৃত্ব দেন।

রণাঙ্গনে তাঁর সাহস, বিচক্ষণতা ও রণকৌশল মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বাড়ানোর পাশাপাশি শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধকে আরও শক্তিশালী করে। দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বীরউত্তম সি আর দত্ত তাই সাহস, আত্মত্যাগ ও নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল প্রতীক।

স্বাধীনতার পরও দেশের প্রতি তাঁর দায়িত্ব শেষ হয়নি। নবগঠিত বাংলাদেশের সামরিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো শক্তিশালী করার কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের (বর্তমান বিজিবি) প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সীমান্ত সুরক্ষা ও বাহিনীকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিফ অব লজিস্টিকস, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ও বিআরটিসির চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন।

কিন্তু সামরিক জীবন থেকে অবসর নেওয়ার পরও তাঁর সংগ্রামী জীবন থেমে থাকেনি। বরং তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেন একটি অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রকৃত বাস্তবায়ন তখনই সম্ভব, যখন ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করবেন।

বাংলাদেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা যখন ভূমি জবরদখল, বৈষম্য, নিপীড়ন কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন, তখন সি আর দত্ত তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে সংগঠিত ও বেগবান করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার ও নিরাপত্তার দাবিকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরেন।

অর্পিত সম্পত্তি আইনসংক্রান্ত জটিলতা নিরসন, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, সাংবিধানিক অধিকার এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ় ও আপসহীন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার পাশাপাশি তিনি রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের কাছেও সংখ্যালঘুদের ন্যায্য দাবিগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ এবং মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস চালিয়েছেন।

২০২০ সালের ২৫ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই বীর সেনানি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী মরদেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয় এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে শেষ বিদায় জানানো হয়। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাজধানীর কাঁটাবন থেকে কারওয়ান বাজার সংকেত পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে ‘বীরউত্তম সি আর দত্ত সড়ক’।

আজ তাঁর প্রয়াণের দিনে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে বারবার মনে পড়ে তাঁর কর্মময় জীবনের সেই অনন্য অধ্যায়—এক হাতে অস্ত্র নিয়ে তিনি যুদ্ধ করেছেন দেশের স্বাধীনতার জন্য, আর জীবনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত লড়াই করেছেন মানুষের অধিকার, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার জন্য।

বীরউত্তম সি আর দত্ত ছিলেন এমন এক মানুষ, যাঁর কাছে দেশপ্রেম শুধু একটি শব্দ ছিল না; ছিল জীবনব্যাপী সাধনা। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে তাঁর সাহসিকতা, স্বাধীন বাংলাদেশ নির্মাণে তাঁর অবদান এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের সমঅধিকারের জন্য তাঁর আপসহীন সংগ্রাম তাঁকে আমাদের জাতীয় ইতিহাসে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদার ভিত্তিতে একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলার যে স্বপ্ন তিনি আজীবন লালন করেছেন, তাঁর সেই স্বপ্ন ও আদর্শ নতুন প্রজন্মকে পথ দেখাবে। বীরউত্তম সি আর দত্তের কর্মময় জীবন, দেশপ্রেম, সাহসিকতা ও অধিকার আদায়ের সংগ্রাম তাই বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল শ্রদ্ধা ও গৌরবের সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

( মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক,কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি এবং সহ সম্পাদক, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি)

এই শাখার আরও খবর

রেমিট্যান্স নেবে সরকার, প্রবাসীদের মরদেহের দায় কেন নেবে না?

সৌদি আরবে দুই চ নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিথি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে…

ছেলেকে নায়ক বানাতে বাড়ি-গাড়ি বন্ধক রেখেছিলেন হৃতিকের বাবা

হৃতিক রোশন এখন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে তার পরিবারের এই অবস্থানে আসার পথটি সহজ…

সিডনি ও পার্থে বিএইচএসএএ’র শারদীয় পূজা পরিক্রমা সম্পন্ন

শতদল তালুকদার, সিডনি, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও পার্থে উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশি হিন্দু শিক্ষার্থীদের সংগঠন বিএইচএসএএ’র (BHSAA) শারদীয় দুর্গাপূজা পরিক্রমা। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, পারস্পরিক সৌহার্দ্য…

মহানবমী আজ, কাল প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হবে দুর্গোৎসব

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমী আজ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর)। দিনভর নানা ধর্মীয় আচার, পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি ও প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে উদ্‌যাপিত…

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে ঝরল ১০ প্রাণ, আহত আরও ২০

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: নাটোরের বড়াইগ্রামে ভোরের আলো ফোটার আগেই সড়কে ঝরল ১০ প্রাণ। যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন।…

‘আমি ভয় পাই না’, ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা আবারও বললেন শেখ হাসিনা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা আবারও জানিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার, নির্যাতন কিংবা হত্যার শিকার হতে পারেন বলে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au