নেপালে আকস্মিক ঢলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৮৯, নিখোঁজ ১,৪০০-এর বেশি
নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক ঢলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৪৮৯ জনে দাঁড়িয়েছে। দুর্যোগের প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পর শুক্রবার নেপাল পুলিশের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে…
নরওয়ের রাজপরিবারে নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। ৮৯ বছর বয়সে রাজা হ্যারাল্ডের মৃত্যুর পর দেশটির সিংহাসনে বসার অপেক্ষায় রয়েছেন ক্রাউন প্রিন্স হাকনের স্ত্রী মেতে-মারিত। তবে ভবিষ্যৎ এই রানির জীবনকাহিনি কোনোভাবেই প্রচলিত রাজকীয় রূপকথার মতো নয়। বরং তার অতীতজুড়ে রয়েছে মাদকঘনিষ্ঠ পার্টি জীবন, কারাবন্দি এক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক, ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় সৎভাইকে হারানোর বেদনা, কুখ্যাত মার্কিন অর্থকুবের জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নিজের ছেলেকে ঘিরে একের পর এক আইনি বিতর্ক।
মেতে-মারিতের জন্ম ১৯৭৩ সালে নরওয়ের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ক্রিস্টিয়ানস্যান্ডে। চার ভাইবোনের মধ্যে একজন হিসেবে তার শৈশব ছিল মোটামুটি সাধারণ।
১৯৮৯ সালে বিদেশে পড়াশোনার সুযোগে তিনি অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের ওয়াঙ্গারাট্টা হাইস্কুলে ভর্তি হন। তবে অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘদিন থাকেননি। পড়াশোনা শেষ করে নরওয়েতে ফিরে যান এবং ২০-এর কোঠায় ওয়েট্রেস ও বেরি সংগ্রহের মতো বিভিন্ন অস্থায়ী কাজ করেন।
তবে একই সময়ে ওসলো শহরের হাউস মিউজিক ও নাইটক্লাবের পার্টি সংস্কৃতির সঙ্গেও তার যোগাযোগ তৈরি হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মাদক মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তির সঙ্গে সন্তান
মেতে-মারিতের জীবনের আরেকটি আলোচিত অধ্যায় শুরু হয় মর্টেন বোর্গের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে। বোর্গ ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে মাদক-সংক্রান্ত মামলায় কারাদণ্ড ভোগ করেছিলেন।
১৯৯৭ সালে তাদের ঘরে জন্ম নেয় ছেলে মারিয়ুস। পরবর্তীতে এই শিশুই নরওয়ের রাজপরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে বেড়ে ওঠে, যদিও সে কখনো সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ছিল না।

নরওয়ের ক্রাউন প্রিন্স হাকন তার বাগদত্তা মেতে-মারিত তিয়েসেম হোয়িবির সঙ্গে ২০০০ সালে ওসলোতে তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক যৌথ ছবির জন্য পোজ দেন।
১৯৯৮ সালে নরওয়ের ক্রাউন প্রিন্স হাকন কোয়ার্ট মিউজিক ফেস্টিভ্যালে অংশ নিতে গেলে মেতে-মারিতের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এক বন্ধুর মাধ্যমে তাদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল।
পরবর্তীতে হাকন এক সাক্ষাৎকারে মেতে-মারিতের কথা বলতে গিয়ে জানান, দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা এই আত্মবিশ্বাসী ও অভিজ্ঞ তরুণী তার ওপর গভীর ছাপ ফেলেছিলেন।
১৯৯৯ সালে তাদের সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসে। ২০০০ সালের ডিসেম্বরে বাগদান ঘোষণা করেন তারা।
২০০১ সালে তাদের বিয়ে হয়। চার বছর বয়সী মারিয়ুসও বিয়ের অনুষ্ঠানে পেজবয় হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিয়ের সময় ওসলো বিশপ গানার স্টলসেট বলেন, মেতে-মারিত হয়তো জীবনের সহজ পথ বেছে নেননি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভালোবাসাই জয়ী হয়েছে।
এরপর রাজপরিবারে আসে দুই সন্তান। ২০০৪ সালে জন্ম নেয় প্রিন্সেস ইনগ্রিড আলেকজান্দ্রা এবং ২০০৫ সালে প্রিন্স স্ভেরে ম্যাগনুস।
২০১১ সালের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় সৎভাই নিহত
মেতে-মারিতের জীবনে সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত বিপর্যয়গুলোর একটি আসে ২০১১ সালে।
ডানপন্থী উগ্রবাদী আন্দের্স বেরিং ব্রেইভিক প্রথমে ওসলোতে গাড়িবোমা হামলা চালিয়ে আটজনকে হত্যা করে। এরপর সে উটোয়া দ্বীপে একটি যুব শিবিরে হামলা চালায়। সেখানে নিহত হন আরও ৬৯ জন।
নিহতদের একজন ছিলেন অবসর সময়ে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ কর্মকর্তা ট্রন্ড বের্ন্টসেন। তিনি ছিলেন মেতে-মারিতের সৎভাই।
জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগ
এই সময়ের আশপাশেই মেতে-মারিতের পরিচয় হয় মার্কিন অর্থকুবের জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে। যৌন অপরাধে অভিযুক্ত ও পরে দণ্ডিত এপস্টেইনের সঙ্গে তার যোগাযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

নরওয়ের সংবিধান দিবস উপলক্ষে ১৭ মে ২০২৫-এর অনুষ্ঠানে প্রিন্স স্ভেরে ম্যাগনাস, ক্রাউন প্রিন্সেস মেতে-মারিত, প্রিন্সেস ইনগ্রিড আলেকজান্দ্রা এবং ক্রাউন প্রিন্স হাকন ম্যাগনাস।
ছবি: পের ওলে হাগেন/গেটি ইমেজেস
এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশের পর মেতে-মারিতের সঙ্গে তার যোগাযোগের বিস্তারিত তথ্য সামনে আসে। নথিতে তাদের মধ্যে একাধিক ই-মেইল আদান-প্রদানের তথ্য রয়েছে।
মেতে-মারিত পরে দাবি করেন, এপস্টেইন যে যৌন অপরাধী ও নির্যাতনকারী ছিলেন, তা তিনি জানতেন না। তবে প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, ২০১১ সালে এপস্টেইনকে গুগলে খোঁজার পর তার অতীত সম্পর্কে কিছু নেতিবাচক তথ্য পেয়েছিলেন বলে একটি ই-মেইলে উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
২০১২ সালের একটি ই-মেইলে তিনি এপস্টেইনকে ‘সুইটহার্ট’ বলেও সম্বোধন করেন। অন্য একটি বার্তায় তাকে ‘খুব আকর্ষণীয়’ বলে উল্লেখ করেন।২০১২ সালে সেন্ট বার্টস দ্বীপে ছুটিতে থাকার সময় রাস্তায় মেতে-মারিত ক্রাউন প্রিন্স হাকনের সঙ্গে এপস্টেইনের পরিচয় করিয়ে দেন বলেও নথিতে উঠে এসেছে।
পরের বছর মেতে-মারিত ফ্লোরিডায় এপস্টেইনের পাম বিচের বাড়িতে কয়েক দিন অবস্থান করেন। পরে তিনি দাবি করেন, বাড়িটি একজন পারস্পরিক পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছিলেন।
এপস্টেইনের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক তীব্র হওয়ার পর মেতে-মারিত স্বীকার করেন যে তিনি তার দ্বারা ‘প্রভাবিত ও প্রতারিত’ হয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এপস্টেইনের অতীত সম্পর্কে আরও সতর্কতার সঙ্গে খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল।

ক্রাউন প্রিন্সেস জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ করতেন।
ছবি: নিউইয়র্ক স্টেট সেক্স অফেন্ডার রেজিস্ট্রি, এপি
তিনি অবশ্য তাদের মধ্যে কোনো ঘনিষ্ঠ বা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
এক বিবৃতিতে মেতে-মারিত বলেন, এপস্টেইনের সঙ্গে তার কিছু বার্তার বিষয়বস্তু তিনি যে মানুষ হতে চান, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ ঘটনায় রাজপরিবারকে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, তার জন্যও তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
গুরুতর অসুস্থতাও থামাতে পারেনি রাজকীয় দায়িত্ব
এর মধ্যেই মেতে-মারিতকে মোকাবিলা করতে হয়েছে গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার।
২০১৮ সালে তার পালমোনারি ফাইব্রোসিস শনাক্ত হয়। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ, যাতে ফুসফুসের টিস্যুতে ক্ষত তৈরি হয় এবং শরীরে অক্সিজেন গ্রহণের ক্ষমতা কমে যায়।
রোগের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাকে বেশ কয়েকবার রাজকীয় দায়িত্ব থেকে বিরতি নিতে হয়েছে। চলতি বছর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে নাকের মাধ্যমে অক্সিজেন নেওয়ার নল ব্যবহার করতেও দেখা যায়।
জুনে তার স্বাস্থ্যের অবনতির খবর প্রকাশিত হয়। জানানো হয়, ফুসফুস প্রতিস্থাপন না হলে তার হাতে হয়তো এক বছরেরও কম সময় রয়েছে। জুলাইয়ে তিনি সফলভাবে ফুসফুস প্রতিস্থাপন অস্ত্রোপচার করান।

১৭ মে ২০২৬ নরওয়ের সংবিধান দিবসের অনুষ্ঠানে মেতে-মারিত। তাকে জানানো হয়েছিল, ফুসফুস প্রতিস্থাপন না হলে তার হাতে বেঁচে থাকার সময় ছিল মাত্র এক বছর। পরে তিনি জীবনরক্ষাকারী অস্ত্রোপচার করান।
ছবি: পের ওলে হাগেন/গেটি ইমেজেস
‘বোনাস প্রিন্স’ মারিয়ুসকে ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগ
মেতে-মারিতের বড় ছেলে মারিয়ুসকে নরওয়ের সংবাদমাধ্যম প্রায়ই ‘বোনাস প্রিন্স’ নামে অভিহিত করে। রাজপরিবারের সদস্য না হলেও সে ছোটবেলা থেকেই রাজপরিবারের সন্তানদের সঙ্গে একই পরিবেশে বড় হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে ওসলো পুলিশের কাছে একটি অভিজাত এলাকার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে অভিযোগ আসে। প্রতিবেশীরা চিৎকার এবং এক ব্যক্তিকে ‘আমি চাই তুমি মারা যাও’ বলতে শুনেছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়।
পুলিশ গিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের দেয়ালে একটি ছুরি গাঁথা অবস্থায় এবং মেঝেতে ভাঙা ঝাড়বাতির টুকরো দেখতে পায়। সেখানে ২০-এর কোঠার এক নারীকে আহত অবস্থায় পাওয়া যায়।পরে প্রসিকিউশন অভিযোগ করে, ওই নারীকে মুখে আঘাত করা হয়েছিল, বিছানায় চেপে ধরা হয়েছিল এবং এমনভাবে একাধিকবার গলা টিপে ধরা হয়েছিল যাতে তিনি শ্বাস নিতে না পারেন।
অভিযোগের পর মেতে-মারিতের ছেলে মারিয়ুসকে গ্রেপ্তার করা হয়।এরপর আরও কয়েকজন সাবেক প্রেমিকা সামনে এসে তার বিরুদ্ধে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করেন।
২০২৫ সালে মারিয়ুসের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও পারিবারিক সহিংসতাসহ মোট ৩৮টি অভিযোগ আনা হয়।
বিতর্কিত বই প্রকাশ ঠেকানোর চেষ্টা
২০২৫ সালে মারিয়ুস ‘White Lines, Black Sheep’ নামে একটি বইয়ের প্রকাশ ঠেকাতে আদালতের দ্বারস্থ হন। বইটিতে ইউরোপের কয়েকটি কুখ্যাত মাদকচক্রের সঙ্গে তার যোগাযোগের অভিযোগ করা হয়েছিল।
আদালত সেই প্রচেষ্টা নাকচ করে দেয় এবং বইটি পরে বেস্টসেলার তালিকায় উঠে আসে।
নরওয়ের রাজপ্রাসাদ অবশ্য বইটিতে থাকা বিভিন্ন দাবিকে ‘অসত্য, অপ্রমাণিত এবং ইঙ্গিতনির্ভর’ বলে মন্তব্য করে।

গত বছর মারিয়ুস বোর্গ হোয়িবির বিরুদ্ধে ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও পারিবারিক সহিংসতাসহ মোট ৩৮টি অভিযোগ আনা হয়।
ছবি: লিসে অসেরুদ / NTB / AFP
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মারিয়ুসের বিচার শুরু হয়। জুনে আদালত তাকে ৩৪টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে এবং চার বছরের কারাদণ্ড দেয়।তবে তিনি রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন এবং বর্তমানে গৃহবন্দি রয়েছেন।
এতসব বিতর্ক, পারিবারিক ট্র্যাজেডি ও ব্যক্তিগত সংকটের মধ্যেও মেতে-মারিত এবং হাকনের দাম্পত্য সম্পর্ক টিকে আছে। চলতি সপ্তাহেই তারা ২৫তম বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করেছেন। এ উপলক্ষে রাজপরিবার তাদের কিছু নতুন ছবি এবং যুক্তরাষ্ট্রে মধুচন্দ্রিমার সময়কার ব্যক্তিগত ছবিও প্রকাশ করেছে।
রাজা হ্যারাল্ডের মৃত্যুর পর হাকন নরওয়ের রাজা হলে মেতে-মারিত হবেন দেশটির রানি।নরওয়ের রাজতন্ত্রের ইতিহাসে তিনি হবেন ৪৯তম রানি। কিন্তু তার জীবনকাহিনি নিঃসন্দেহে অন্যদের তুলনায় ব্যতিক্রমী।
অস্ট্রেলিয়ার গ্রামীণ শহরে হাইস্কুলের দিনগুলো থেকে শুরু করে ওসলো রাতের পার্টি, মাদক মামলায় দণ্ডিত এক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক, রাজপরিবারে প্রবেশ, সন্ত্রাসী হামলায় সৎভাইকে হারানো, জেফ্রি এপস্টেইন বিতর্ক, গুরুতর অসুস্থতা এবং নিজের ছেলেকে ঘিরে ফৌজদারি মামলা, সব মিলিয়ে মেতে-মারিতের জীবন যেন রাজপরিবারের প্রচলিত রূপকথার সম্পূর্ণ বিপরীত এক গল্প।
ড্যানিয়েলা এলসার, অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে রাজপরিবার ও সেলিব্রিটি বিষয়ক লেখালেখি করা একজন ভাষ্যকার।
সূত্র- নিউজ.কম.এইউ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au