বিশ্ব

ছয় মাস ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি, বাড়ছে প্রশ্ন

  • 12:07 am - August 29, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৪৬ বার
ইরানের রাজধানী তেহরানের একটি সড়কে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবিসংবলিত ব্যানারের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী। ছবিটি ১৩ আগস্ট ২০২৬-এর। ছবি: মাজিদ আসগারিপুর/ওয়ানা (ওয়েস্ট এশিয়া নিউজ এজেন্সি)/রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পরও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তার কোনো ছবি, ভিডিও কিংবা অডিও বার্তাও প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ইরানের নেতৃত্বে তার প্রকৃত ভূমিকা ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে দেশটির ভেতরেই প্রশ্ন বাড়ছে।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের কর্মকর্তারা ও সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র দাবি করেছে, মোজতবা এখনো দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। তবে নিরাপত্তার কারণে তিনি আড়ালে থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। যুদ্ধের শুরুতে গুরুতর আহত হওয়ার পর তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন এবং দৈনন্দিন প্রশাসনিক দায়িত্বের বড় অংশ শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি দলের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বিমান হামলা শুরু করে। ওই হামলায় তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। একই সময়ে গুরুতর আহত হন তার ছেলে মোজতবা খামেনি।

যুদ্ধ শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ পর মোজতবাকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাকে সরাসরি জনসমক্ষে দেখা যায়নি। এমনকি গত মাসে তার বাবার বিশাল রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য অনুষ্ঠানেও তিনি উপস্থিত ছিলেন না।তার পক্ষ থেকে ইরানের জনগণের উদ্দেশে যেসব বার্তা এসেছে, সেগুলো মূলত লিখিত বিবৃতি। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের উপস্থাপকেরা সেগুলো পড়ে শুনিয়েছেন।

মোজতবার দীর্ঘ অনুপস্থিতি নিয়ে ইরানের জনগণের মধ্যে সন্দেহ বাড়ছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, প্রশ্নটি এখন শুধু মোজতবা বেঁচে আছেন কি না, তা নিয়ে নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দেশটি কার্যকর নেতৃত্ব পাচ্ছে কি না।

ইরানের শাসনব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতার অবস্থান অত্যন্ত ক্ষমতাশালী। তার বক্তব্য ও সিদ্ধান্তকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ে চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই তার কোনো ছবি বা ভিডিও প্রকাশ না হওয়ায় উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

এমনকি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কট্টর সমর্থকদের মধ্যেও এ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

কোম শহরের বাসিজ স্বেচ্ছাসেবী মিলিশিয়ার এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেন, দেশের সর্বোচ্চ নেতার কণ্ঠ শোনা কিংবা তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন, এমন কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া গেলে মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়ত।

তার মতে, মোজতবা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন। কিন্তু একটি ছবিও প্রকাশ না হওয়ায় তা দেশের মানুষের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।অন্যদিকে সরকারবিরোধী ও সংস্কারপন্থীদের সন্দেহ আরও তীব্র। তেহরানের এক সংস্কারপন্থী ব্যবসায়ী প্রশ্ন করেন, মোজতবা যে এখনো জীবিত, তারই বা প্রমাণ কোথায়?

ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাবি, মোজতবার অনুপস্থিতির প্রধান কারণ নিরাপত্তা।

দেশটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তিনি নিয়মিত শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন, গুরুত্বপূর্ণ সব প্রতিবেদন পান এবং বড় সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত মত দেন।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও গত ১০ আগস্ট জানিয়েছিলেন, মোজতবার সঙ্গে তিনি সাত ঘণ্টার একটি বৈঠক করেছেন।

তবে একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানান, খুব অল্পসংখ্যক কর্মকর্তা এখন সরাসরি মোজতবার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করতে পারেন। তার শারীরিক অবস্থা বা অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না, কারণ তা ফাঁস হলে যুক্তরাষ্ট্র তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

মোজতবার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দাবি করেছে, তার শারীরিক অবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে এবং তিনি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন।

ছয় মাসের যুদ্ধে ইরান ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়লেও দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো এখনো টিকে আছে। সামরিক বাহিনীও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর হামলা চালানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলার সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

এই পরিস্থিতিতে ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী বা রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রভাব আরও বেড়েছে বলে ইরানের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বাহিনীটি ইরানের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদকে কেন্দ্র করে নতুন করে সাজানো ক্ষমতার কাঠামোয় রেভল্যুশনারি গার্ডের শীর্ষ কমান্ডারদের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফের মতো শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারাও রয়েছেন।

রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দাবি করেছেন, মোজতবা এসব শীর্ষ নেতার সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আলোচনায় সরাসরি যুক্ত রয়েছেন।

রাজনৈতিক কাঠামো টিকে থাকলেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ইরান।

দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে দেশটির তেল রপ্তানি অবরোধের মুখে রয়েছে। যুদ্ধের ব্যয়ও বাড়ছে। এর ফলে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের মূল্য ব্যাপকভাবে কমে গেছে।

অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হলে দেশটিতে নতুন করে বড় ধরনের বিক্ষোভ শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ব্যাপক বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করেছিল কর্তৃপক্ষ।

এখন ইরানের শাসকগোষ্ঠীর প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উঠে এসেছে রাষ্ট্রীয় কাঠামো টিকিয়ে রাখা, সামরিক প্রতিরোধক্ষমতা পুনর্গঠন করা এবং অর্থনৈতিক সংকট যাতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় রূপ না নেয়, তা নিশ্চিত করা।

যুদ্ধের আগে মোজতবা খামেনি নিজেও অনেকটা আড়ালে থেকেই কাজ করতেন। তিনি তার বাবার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে প্রভাবশালী হলেও জনসমক্ষে খুব কমই আসতেন।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। দেশের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তার ওপর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব ন্যস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি মোকাবিলা করছে।

এই পরিস্থিতিতে তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি ক্ষমতার বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

অ্যালেক্স ভাতানকার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো বড় সমঝোতা করতে হলে মোজতবার স্পষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও তার অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ।

তার ভাষায়, মোজতবার দীর্ঘ অনুপস্থিতি এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী দাবি করতে পারে যে তারা জানে সর্বোচ্চ নেতা আসলে কী চান।

ফলে মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা, তার প্রকৃত ক্ষমতা এবং ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে তার ভূমিকা এখন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং চলমান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

সূত্র- রয়টার্স

এই শাখার আরও খবর

ভিক্টোরিয়ায় এমপি হেলেন হেইনসকে গাড়িচাপা: আটক চালককে জিজ্ঞাসাবাদ, হামলার উদ্দেশ্য খুঁজছে পুলিশ

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যে নিজ নির্বাচনী কার্যালয়ের বাইরে গাড়ির আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন স্বতন্ত্র ফেডারেল সংসদ সদস্য হেলেন হেইনস। এ ঘটনায় আটক ৪৩…

রাষ্ট্রপতির মন্তব্যে হেফাজতের তীব্র প্রতিবাদ, বক্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বান

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনটির নেতারা দাবি করেছেন, রাষ্ট্রপতির বক্তব্য ইসলামের মৌলিক তাওহিদি বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক…

পূজায় নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব, অংশ নিলে ঈমান থাকবে না: বায়তুল মোকাররমের খতিব

দেশে বসবাসরত অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেছেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতী আব্দুল মালেক। তবে উদারতা বা…

ঋণ করে বিদেশে পাঠানো ছেলের মৃত্যুদণ্ড, বিচার ও মরদেহ ফেরত চান বাবা

সৌদি আরবের মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তবে নজরুলের বাবা…

৯ মাসে মব সহিংসতায় নিহত ১৮৭, ধর্ষণের শিকার ৬৫৭ নারী ও শিশু

চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, সারা দেশে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ধর্ষণের শিকার…

অষ্টমী পূজার দিনে গ্রেপ্তার ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের এমডি দিলীপ আগরওয়ালা

দুর্গাপূজার অষ্টমীর দিনে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সোমবার (১৯…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au