‘মাত্র ১০ সেকেন্ডের জন্য বেঁচে গেছি’, ৯০০ শিক্ষার্থীকে বাঁচিয়ে নেপালে নায়ক স্কুলপ্রধান
মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল রাজেন্দ্র দাওয়াদিকে। তিনি যে সতর্কবার্তা শুনছিলেন, সেটি সত্যিই বড় বিপদের ইঙ্গিত কি না, তা বোঝার সময়ও ছিল না…
ছাপাখানাটির দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ভিক্টোরিয়া হাইদাই। নতুন শিক্ষাবর্ষ সামনে রেখে যেখানে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল কর্মীদের, সেখানে এখন পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপ। আগুনে পুড়ে গেছে ছাপাখানার সবকিছু। উদ্ধারযোগ্য নেই কোনো বই, যন্ত্রপাতি বা কাগজ।
কিয়েভের উপকণ্ঠের ওই ছাপাখানায় রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় নতুন শিক্ষাবর্ষের জন্য ১৩ লাখ বই ছাপার কাজ চলছিল। ইউক্রেনের স্কুলগুলোর মোট পাঠ্যবইয়ের প্রায় ১০ শতাংশের সমান এই বইগুলো এক হামলাতেই ধ্বংস হয়ে গেছে।
ধ্বংসস্তূপের ছাইয়ের মধ্যে পড়ে ছিল ইংরেজি ভাষার একটি পাঠ্যবইয়ের পোড়া পৃষ্ঠা। তাতে লেখা ছিল, ‘আমার নাম উইলিয়াম। আমার বাড়ি যুক্তরাজ্যে। আমার দাদি নটিংহামে থাকেন। এটি একটি সুন্দর শহর।’
সম্প্রতি ইউক্রেনজুড়ে ছাপাখানা ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক হামলা চালানো হচ্ছে। এসব হামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ বই নষ্ট হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর ইউক্রেনে ছাপা হওয়া মোট বইয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই রুশ হামলায় ধ্বংস হয়েছে।
কিয়েভের ওই ছাপাখানায় আগুন থেকে কিছু বই বেঁচে গেলেও সেগুলোও রক্ষা করা যায়নি। অগ্নিনির্বাপণের পানি এবং খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকার কারণে বইগুলোর পাতাও নষ্ট হয়ে গেছে।
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কনভির বাণিজ্যিক পরিচালক হাইদাই মনে করেন, এসব হামলা পরিকল্পিত। তিনি বলেন, গত দুই মাসে বড় কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সরবরাহকেন্দ্র হামলায় ধ্বংস হয়েছে। এসব কেন্দ্রে বিপুলসংখ্যক বই মজুত ছিল।
হাইদাই বলেন, ‘ইউক্রেন জাতিকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে রাশিয়া। তাই ছাপাখানাগুলো ধ্বংস করছে তারা। তবে সত্যি বলতে, তারা সফল হবে না।’
গত কয়েক সপ্তাহে ইউক্রেনের ৩৫টির বেশি প্রকাশনা ও মুদ্রণ স্থাপনায় হামলা হয়েছে। হামলার লক্ষ্য শুধু নতুন বইয়ের ছাপাখানা বা সরবরাহকেন্দ্র নয়, কিয়েভের পুরোনো বইয়ের বাজারও।
এসব হামলায় শত শত বিক্রয়কেন্দ্র এবং অসংখ্য মূল্যবান বই ধ্বংস হয়েছে। ফলে যুদ্ধের প্রভাব শুধু ইউক্রেনের বর্তমান প্রকাশনাশিল্পেই নয়, দেশটির পুরোনো বই ও সাহিত্যিক ঐতিহ্যের ওপরও পড়ছে।
কিয়েভের ওই ছাপাখানায় অগ্নিনির্বাপণ কর্মীরা আগুন নেভানোর কাজ শেষ করার আগেই সেখানে পৌঁছান ২৮ বছর বয়সী বইবিষয়ক ব্লগার লিলিয়া ভেলিকা। জ্বলতে থাকা ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে কিছু বই উদ্ধারের চেষ্টা করছিলেন তিনি। তাঁর হাতে ছিল পানিতে ভিজে যাওয়া একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির বই।
লিলিয়া বলেন, ‘বই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। এগুলো হারানো মানে আমাদের হৃদয় হারিয়ে ফেলার মতো।’
যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের বিভিন্ন জাদুঘর, আর্ট গ্যালারি, ফিল্ম স্টুডিও, গ্রন্থাগার ও অপেরা হাউসও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।ইউক্রেনের সংস্কৃতিমন্ত্রী তেতিয়ানা বেরেজনা বলেন, ‘রাশিয়া আমাদের দীর্ঘদিনের ইতিহাসের প্রতীক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।’
তেতিয়ানা জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়া ইউক্রেনের ১ হাজার ৯০০-এর বেশি ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন এবং ২ হাজারের বেশি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে শিল্প ও সাহিত্যকে টিকিয়ে রাখতে এবং শিশুদের পড়াশোনা সচল রাখতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেনের পুরো প্রকাশনাশিল্প এখন চরম হুমকির মুখে। এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।
যুক্তরাজ্যে অবস্থিত রুশ দূতাবাস বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইউক্রেনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংসের জন্য দেশটির সরকারকেই দায়ী করেছে।
রুশ দূতাবাসের দাবি, ইউক্রেন নিজেরাই পুরোনো স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে ফেলছে এবং রাস্তাঘাটের নাম বদলে দিচ্ছে। ইউক্রেনীয় বাহিনী সামরিক স্থাপনা ও অস্ত্র লুকিয়ে রাখার জন্য সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো ব্যবহার করছে বলেও দাবি করেছে তারা।
তবে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই রাশিয়া বলে আসছে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় না।
সূত্র-বিবিসি
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au