আছিয়া ধর্ষণ-হত্যা: হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল
মাগুরার বহুল আলোচিত আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে…
শোকের মাসের শেষ সূর্যটি আজ অস্তমিত হওয়ার পথে। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আগস্ট বিদায় নিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বাঙালির জাতীয় মানসপটে আগস্টের আবহ কখনো ফুরোয় না। পঁচাত্তরের পনেরো আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হারানোর যে অপূরণীয় ক্ষত বাঙালি হৃদয়ে তৈরি হয়েছিল, তা সময়ের প্রলেপেও ম্লান হওয়ার নয়।
প্রতি বছর আগস্ট ফিরে আসে এক দীর্ঘশ্বাস আর বিনম্র শ্রদ্ধার পসরা নিয়ে; আর বারবার এটি প্রমাণিত হয় যে, শারীরিকভাবে ধ্বংস করা গেলেও আদর্শকে কখনোই মুছে ফেলা যায় না। আগস্ট যায়, আগস্ট আসে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকেন অনন্তকাল।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কেবল একটি সাধারণ হত্যাকাণ্ড ছিল না; এটি ছিল সদ্য স্বাধীন একটি দেশের ভিত্তিমূলে সরাসরি আঘাত। ঘাতকরা চেয়েছিল বাঙালিকে নেতৃত্বশূন্য করতে, মুছে ফেলতে লাল-সবুজের স্বাধীনতা অর্জনের মূল নায়ককে।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে রক্তেভেজা যে ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তা মানবসভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায়। কিন্তু ঘাতকরা বুঝতে পারেনি, বুলেট দিয়ে শরীর ভেদ করা যায়, অমর একটি আইডিয়া বা স্বপ্নকে হত্যা করা যায় না। যে মানুষটি নিজের সমস্ত জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এই দেশের মানুষের মুক্তির জন্য, তাঁকে সপরিবারে কেড়ে নিলেও তাঁর তর্জনীর ইশারা আর সাহসিকতা চিরকালের জন্য গেঁথে গেছে এই মাটির গভীরে।
তবে ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, ২০২৪-এর ৫ আগস্ট দেশি ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন আমলে এই বাংলায় শুরু হয়েছে নতুন এক অপচেষ্টা। ইতিহাসের সত্যকে ঢেকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে চিরতরে মুছে ফেলার এক গভীর ষড়যন্ত্র দেখতে পাচ্ছে দেশবাসী। যে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িটি ছিল বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের সূতিকাগার, ইতিহাসের সেই পবিত্র স্মারক চিহ্ন কয়েক দফায় বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা হাজারো বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ও ভাস্কর্য নির্মমভাবে ভাঙচুর করা হয়েছে। ইতিহাসের পাতা থেকে একটি জাতির স্থপতির নাম ও চিহ্ন মুছে ফেলার এমন নজিরবিহীন তাণ্ডব সভ্য বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে। গত ১৫ আগস্ট সহ পর পর তিনবছর ধরে শোকের দিনে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এবং টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধি সৌধ অবরুদ্ধ করে রেখে সাধারণ মানুষকে শ্রদ্ধা জানাতে বাধা দেওয়া হয়েছে—যা কেবল একটি স্মৃতির ওপর আঘাত নয়, বরং বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূলে কুঠারাঘাত। শুধু বর্তমান বা অন্তর্বর্তী আমলেই নয়, এর আগে বিএনপির বিভিন্ন আমলেও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ও ইতিহাসকে সংকুচিত করার এবং রাজনৈতিকভাবে তাঁকে অবমূল্যায়ন করার সেই ধারা ও অপচেষ্টা বিভিন্ন সময়ে অব্যাহত ছিল।
কিন্তু শত নিপীড়ন আর চক্রান্তেও কি ইতিহাস মুছে ফেলা যায়? শোককে শক্তিতে রূপান্তর করার অনন্য ক্ষমতা বাঙালির রয়েছে। আগস্ট মাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ত্যাগের মহিমা। এটি কেবল কান্নার মাস নয়, বরং আত্মোপলব্ধি ও নতুন শপথ নেওয়ার সময়। যে অসাম্প্রদায়িক, শোষণমুক্ত ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলার স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথেই আমাদের প্রতিনিয়ত হাঁটতে হবে। যখনই জাতি কোনো সংকটে পড়েছে, তখনই ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা হিসেবে অবয়ব হয়ে ভেসে উঠেছে তাঁর সেই ঐতিহাসিক বজ্রকণ্ঠ—’কেউ আমাদের দাবায়া রাখতে পারব না’।
বঙ্গবন্ধু কোনো একক ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ কোনো নাম নন; তিনি একটি প্রতিষ্ঠান, একটি বিপ্লব, একটি চলমান ইতিহাস। যতদিন এই বদ্বীপের বুকে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা প্রবহমান থাকবে, যতদিন লাল-সবুজের পতাকা উড়বে এবং যতদিন বাঙালি থাকবে, ততদিন এই বাংলায় মুজিবের নাম চিরঅম্লান থাকবে। ষড়যন্ত্রকারীরা ইট-পাথরের প্রতিকৃতি ভাঙতে পারে, কিন্তু কোটি বাঙালির বুক থেকে তাঁর আদর্শের নাম মুছে ফেলতে পারবে না। বাংলা ভাষা, মাটি ও মানুষের সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে আছে তাঁর নাম। তাই আগস্টের শেষ দিনে দাঁড়িয়ে এ কথাই নতুন করে অঙ্গীকার করার সময়—শোকের চাদরে মুড়ে থাকা আগস্ট বিদায় নিলেও বাঙালির চেতনায় বঙ্গবন্ধু চিরঞ্জীব, অনন্ত ও অবিনশ্বর।
(মানিক লাল ঘোষ : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au