টাইমস স্কয়ারে দুজনকে ছুরিকাঘাত, পুলিশের গুলিতে নারী আহত
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বিখ্যাত টাইমস স্কয়ারে দুই ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাতের পর পুলিশের গুলিতে এক নারী আহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় সোমবার এ ঘটনা ঘটে। আহত নারীকে আশঙ্কাজনক অবস্থায়…
জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ দ্রুত গলতে থাকায় বিপজ্জনক হয়ে উঠছে বহু হিমবাহ হ্রদ। আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সংস্থা আইসিআইএমওডি-এর ২০২৩ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী, হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে প্রায় ২০০টি হিমবাহ হ্রদকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নেপালে গত ২৬ আগস্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর এই ঝুঁকি নতুন করে সামনে এসেছে।
ওই বন্যায় এখন পর্যন্ত ৯০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নেপালের ভাটির দিকের বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যাটি সরাসরি কোনো প্রচলিত হিমবাহ হ্রদ ফেটে যাওয়ার কারণে হয়নি। নেপালের লেন্ডে উপত্যকার প্রায় ৫ হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতায় একটি বিশাল হিমবাহের অংশ ধসে পড়ার পর আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। ধসে পড়া বরফ ও পাথরের পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি থেকে ২০ কোটি ঘনমিটার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশাল পরিমাণ বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ উপত্যকার নিচে আছড়ে পড়ার পর পানি, পলি ও বড় বড় পাথর প্রবল বেগে ভাটির দিকে ধেয়ে যায়। স্যাটেলাইট চিত্র ও ভূকম্পনসংক্রান্ত তথ্যও হিমবাহ ধসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, দীর্ঘদিনের ঢাল অস্থিতিশীলতা এবং টেকটোনিক সক্রিয়তা এ ধরনের দুর্যোগের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্পও রেকর্ড করা হয়।
ঘটনার দুই দিন পর ধসে পড়া বরফ-পাথরের স্তূপ দিয়ে তৈরি একটি নতুন ধ্বংসাবশেষ-বাঁধযুক্ত হ্রদ উপচে পড়তে শুরু করে। এতে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয় এবং ভাটির জনপদগুলোতে নতুন করে সতর্কতা জারি করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা প্রচলিত হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা বা জিএলওএফ থেকে কিছুটা ভিন্ন। সাধারণত হিমবাহের ধ্বংসাবশেষ দিয়ে তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে কিংবা তুষার, বরফ বা শিলাধসের কারণে হ্রদে বড় ঢেউ সৃষ্টি হলে জিএলওএফের ঘটনা ঘটে। কিন্তু এবার প্রথমে কোনো হ্রদের বাঁধ ভেঙে বন্যা সৃষ্টি হয়নি। বরং বিশাল হিমবাহ সরাসরি পাহাড় থেকে ধসে উপত্যকায় পড়ে বন্যার ঢেউ তৈরি করেছে। বিজ্ঞানীরা এ ধরনের ঘটনাকে ‘হিমবাহ ধসজনিত বন্যা’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।
আইসিআইএমওডির মূল্যায়নে নেপালকে কেন্দ্র করে কোশী, গণ্ডকী ও কর্ণালী অববাহিকায় ৪৭টি হিমবাহ হ্রদকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১টি নেপালে, ২৫টি তিব্বতে এবং একটি ভারতে অবস্থিত। তবে নেপালে মোট হিমবাহ হ্রদের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। বিভিন্ন জরিপে দেশটিতে প্রায় ২ হাজার ৭০ থেকে ৩ হাজার হিমবাহ হ্রদের সন্ধান পাওয়া গেছে।
নেপালের জন্য ঝুঁকির বড় একটি অংশ সীমান্তের ওপার থেকেও আসছে। দেশটির অনেক নদীর উৎস তিব্বতে হওয়ায় নেপালের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বেশ কিছু হিমবাহ হ্রদ নেপালের ভূখণ্ডের বাইরে অবস্থিত। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮০ সালের পর দক্ষিণ-পূর্ব তিব্বত ও চীন-নেপাল সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যার পুনরাবৃত্তি বেড়েছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহ দ্রুত বরফ হারাচ্ছে এবং পিছিয়ে যাচ্ছে। পেছনে পড়ে থাকা পাথর, মাটি ও বরফ দিয়ে তৈরি প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে গলিত পানি জমে নতুন নতুন হ্রদ তৈরি হচ্ছে। এভারেস্টের কাছে ইমজা সো এবং মানাসলুর কাছে থুলাগি হ্রদ এর উদাহরণ। একই সঙ্গে হ্রদের পানির পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি আশপাশের পাহাড়ের ঢাল, পারমাফ্রস্ট ও ঝুলন্ত হিমবাহ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ায় তুষারধস, ভূমিধস বা বরফধসে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও বাড়ছে।
২৬ আগস্টের বন্যা নেপালের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও সামনে এনেছে। ভোতে কোশী ও সিয়াব্রুবেসীর স্বয়ংক্রিয় নদী পরিমাপ কেন্দ্রগুলো নদীর পানি দ্রুত বাড়লে সতর্কবার্তা দেওয়ার জন্য স্থাপন করা হলেও এবার সতর্কবার্তা দেওয়ার আগেই কেন্দ্রগুলো বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে স্থানীয় মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদের পানি নিয়ন্ত্রিতভাবে কমানো, প্রয়োজন হলে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা এবং আকস্মিক হিমবাহ ধস, তুষারধস ও ধ্বংসাবশেষ-বন্যা শনাক্তে আলাদা পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি তিব্বতে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ ও হ্রদগুলোর রিয়েল-টাইম তথ্য নেপালের সঙ্গে বিনিময়ের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করছেন, উচ্চঝুঁকির নদী উপত্যকায় নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সড়ক ও বসতি নির্মাণের নীতিও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। হিমবাহ বা হিমবাহ হ্রদের ঝুঁকি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হলেও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষের বসতি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর উপস্থিতি কমিয়ে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au