সদ্য পদত্যাগ করা যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি সেক্রেটারি ড্যান ডিসক্রল। ছবি: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট
যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি সেক্রেটারি ড্যান ডিসক্রল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে কয়েক মাস ধরে চলা টানাপোড়েনের মধ্যেই তার পদত্যাগের খবর সামনে এসেছে। একাধিক সূত্রের বরাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রথম এ খবর প্রকাশ করে।
মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, ড্যান ডিসক্রল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বাহিনীর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করার পর পদত্যাগপত্র জমা দেন। পিট হেগসেথের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি এবং বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধের কারণে এই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত খুব একটা অপ্রত্যাশিত ছিল না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র।
হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র অ্যানা কেলি এক বিবৃতিতে ড্যান ডিসক্রলের প্রশংসা করে বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘এমএজিএ’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে তিনি দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছেন। সামরিক অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউক্রেনসহ বিভিন্ন বিষয়ে কূটনৈতিক দর-কষাকষিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
সম্প্রতি ড্যান ডিসক্রল ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের মধ্যে দ্বন্দ্বের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ডিসক্রল মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের দীর্ঘদিনের বন্ধু হিসেবেও পরিচিত। চলতি বছরের শুরুতে পিট হেগসেথ দুই জেনারেল এবং সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ রেন্ডি জর্জকে বরখাস্ত করেন। রেন্ডি জর্জ ও ড্যান ডিসক্রল দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করেছেন। জর্জকে সরিয়ে দেওয়ার পরই ডিসক্রল ও হেগসেথের মধ্যকার টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এদিকে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত ছয় মাসে গড়ানোয় মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ছে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক সেনা, যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘ সময় ধরে মোতায়েন রাখতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে। এর ফলে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর প্রস্তুতি ও নিয়মিত দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে বলে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা উদ্বেগ জানিয়েছেন।
পিট হেগসেথকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক গোপনীয় মূল্যায়নেও মার্কিন সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান আরও দীর্ঘায়িত করার ঝুঁকি তুলে ধরেছেন। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর্মকর্তারা মনে করছেন, বর্তমান মাত্রায় অভিযান চালিয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য অঞ্চলে এমনকি নিজ ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
১৪ আগস্টের ‘সেক্রেটারি অব ডিফেন্স অর্ডার্স বুক’ বা এসডিওবিতে এই মূল্যায়নের বিষয়টি উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। সাধারণত মাসে দুইবার তৈরি করা এই নথিতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, বিমান, সেনাসদস্য ও অস্ত্রব্যবস্থার প্রাপ্যতা এবং সামরিক সম্পদ ব্যবহারের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়।
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের কারণে ইউরোপ, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় দায়িত্ব পালনকারী মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধজাহাজ, বিমান ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে এসব অঞ্চলে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন সামরিক মিশন পরিচালনা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিন নৌবাহিনী যুদ্ধকালীন চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে সক্ষমতার সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে বলে মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।
নৌবাহিনীর ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি বলে ওই মূল্যায়নে উঠে এসেছে। নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল পিট হেগসেথকে জানিয়েছেন, বর্তমান মাত্রায় ইরান যুদ্ধকে আর দীর্ঘ সময় ধরে সমর্থন করা সম্ভব নয়। কারণ সংঘাত কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট সময়সীমা নেই।
ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীকে বিপুলসংখ্যক যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করতে হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ইরানি বন্দর অবরোধ এবং হরমুজ প্রণালি খুলতে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেও এসব যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ ও নৌসদস্যের মোতায়েনের মেয়াদও একাধিকবার বাড়াতে হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ড্যান ডিসক্রলের পদত্যাগ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নেতৃত্বে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তার বিদায়ের ফলে মার্কিন সেনাবাহিনীর শীর্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্বে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা তৈরি হলো।
সুত্রঃ সিএনএন