সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজের জিডি, কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে শিশুরা?
দেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সারা দেশের বিভিন্ন থানায় শিশু নিখোঁজের ঘটনায়…
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে, এত অল্প সময়ের মধ্যে পুলিশ কীভাবে দুই সন্দেহভাজনের কাছে পৌঁছাল?
২২ আগস্ট রাতে তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধারের পর লাশ উদ্ধারের কার্যক্রম শেষ হওয়ার প্রায় দেড় ঘণ্টার মধ্যেই সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নামে দুই যুবককে আটক করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পুলিশ বলছে, ‘ম্যানুয়েল সোর্সের’ দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে সিদ্ধার্থকে শনাক্ত করা হয়। পরে তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও অন্য একটি সূত্রের মাধ্যমে মুগ্ধের অবস্থান শনাক্ত করে তাকে আটক করা হয়।
কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন।
যে ‘ম্যানুয়েল সোর্স’ হত্যাকারী হিসেবে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের নাম জানিয়েছিল, সে কি প্রত্যক্ষদর্শী ছিল? সে কীভাবে এত দ্রুত দুইজনের নাম জানতে পারল? হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে সোর্সটি কী ধরনের তথ্য দিয়েছিল? আর সোর্সের দেওয়া তথ্য যাচাই না করেই কি তাদের আটক করা হয়েছিল?
পুলিশ অবশ্য বলছে, শুধু সোর্সের তথ্যের ওপর নির্ভর করে নয়, পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদ ও অন্যান্য আলামতের ভিত্তিতেই তদন্ত এগিয়েছে। তবে গ্রেপ্তারের শুরুর পর্যায়ে ওই তথ্যের ভূমিকা কতটা ছিল, তা নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বিশেষ করে পুলিশের প্রাথমিক সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া ঘটনার বর্ণনা এবং পরে আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দির বরাতে পুলিশের বক্তব্যে কিছু পার্থক্য সামনে আসায় তদন্তের পদ্ধতি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দুই দিন ধরে ফোনে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না স্বজনরা। ২২ আগস্ট রাতে তারা মাছুয়াপাড়ার বাড়িতে গিয়ে দেখেন, বাড়িটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ।
বাড়ির ভেতর থেকে দুর্গন্ধও বের হচ্ছিল। অনেক ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তালা ভেঙে বাড়িতে প্রবেশ করেন।
বাড়ির ছাদে পাওয়া যায় গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ। ছাদে ওঠার সিঁড়িতে পাওয়া যায় তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ। আর শোবার ঘরের খাটের নিচে পাওয়া যায় ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ।
একই পরিবারের চারজনের এমন হত্যাকাণ্ডে এলাকায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়। ঘটনাস্থলে তখন বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। পুলিশ লাশ উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করতে থাকে।
আর এই লাশ উদ্ধারের অভিযান চলার মধ্যেই তদন্তে আসে দুই যুবকের নাম।
পুলিশের ভাষ্য, লাশ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্থানীয় একটি ‘ম্যানুয়েল সোর্স’ থেকে সিদ্ধার্থ দাসের নাম পাওয়া যায়।
রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘ম্যানুয়েল সোর্সের’ মাধ্যমে সিদ্ধার্থকে শনাক্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করা হয়।
তবে ওই সোর্স প্রত্যক্ষদর্শী কি না, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত বলতে চাননি।
এই জায়গাটিই তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ কোনো হত্যাকাণ্ডে একজন সন্দেহভাজনের নাম পুলিশের কাছে পৌঁছানো এবং তাকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আটক করা এক বিষয়। কিন্তু সেই নামের ভিত্তি কী, সোর্সের তথ্যের উৎস কী এবং তা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, সেটি তদন্তের স্বচ্ছতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডিবির উপকমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, সিদ্ধার্থকে আটকের পর তাঁর শরীরেও কিছু আঁচড়ের দাগ পাওয়া যায়। পুলিশ দাবি করে, গলা, কপাল ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে থাকা এসব দাগের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সিদ্ধার্থ ফুটবল খেলার কথা বলেন।
পুলিশের সন্দেহ, এসব দাগ নখের আঁচড়ের হতে পারে।
তবে শুধু শরীরে আঁচড় থাকা কোনো ব্যক্তিকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। আঁচড় কীভাবে হয়েছে, তা ফরেনসিক পরীক্ষায় নিশ্চিত করা হয়েছে কি না, কিংবা ওই দাগের সঙ্গে নিহতদের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ।
লাশ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থলের আশপাশে সিদ্ধার্থ দাসকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায় বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
পরে তাঁর বাবা বিনয় দাস তাকে পাশের কাকার বাড়িতে গিয়ে ঘুমাতে বলেন।
ঘটনার সময়কার একটি সিসিটিভি ফুটেজেও সিদ্ধার্থকে তাঁর কাকাতো ভাই আদিত্য দাস ও ঠাকুমার সঙ্গে কাকার বাড়ির দিকে যেতে দেখা যায় বলে জানা গেছে।
ফুটেজ সম্পর্কে জানতে চাইলে আদিত্য দাস বলেন, ওই সময় তারা তিনজন ঘুমানোর জন্য তাদের বাড়িতে যাচ্ছিলেন।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, রাত ৩টার কিছু পর সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাসের কাছে যায় পুলিশ। ছেলের অবস্থান জানতে চাইলে তিনি জানান, সিদ্ধার্থ পাশের কাকার বাড়িতে ঘুমাতে গেছে।
পরে বিনয় দাসকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যায় পুলিশ।
বিনয় ছেলেকে ডাকলে সিদ্ধার্থ বেরিয়ে আসেন। এরপর পুলিশ তাকে মুগ্ধ দাসকে চেনেন কি না এবং মুগ্ধের বাড়ি কোথায়, তা জিজ্ঞাসা করে।
এরপর সিদ্ধার্থকে সঙ্গে নিয়েই মুগ্ধের বাড়ির দিকে যায় পুলিশ।
পুলিশের ওই সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, মুগ্ধের বাড়ির সামনে গিয়ে সিদ্ধার্থ তাঁর মাকে ডাকেন। মুগ্ধের মা দরজা খুলে বাইরের আলো জ্বালিয়ে দেন।
এ সময় পুলিশের উপস্থিতি বুঝতে পেরে মুগ্ধ বাড়ির পেছনের দিকে একটি টিন সরিয়ে পালিয়ে যান বলে দাবি পুলিশের।
পুলিশও পেছন দিয়ে তার পিছু নেয়। মুগ্ধ পাশের রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুঁতবাগানে ঢুকে পড়েন। সেখানে খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
পরে ডিবির দল গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সামনে ফিরে আসে।
কিছুক্ষণ পর অন্য একটি সূত্র থেকে পুলিশ জানতে পারে, মুগ্ধ দখিগঞ্জ শ্মশানে আশ্রয় নিয়েছেন।
এরপর পুলিশ সেখানে অভিযান চালিয়ে কেয়ারটেকারের থাকার ঘরের সামনে বসে থাকা অবস্থায় মুগ্ধকে আটক করে।
দখিগঞ্জ শ্মশানের অবস্থানও এই ঘটনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। শ্মশানের এক পাশ ও পেছনে রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুঁতবাগান। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তুঁতবাগান থেকে শ্মশানের ভেতরে সহজেই প্রবেশ করা যায়।
শ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ মহন্ত জানান, মুগ্ধ তুঁতবাগান থেকে এসে দরজায় পানি চেয়েছিলেন। তিনি প্রথমে জানালা খুলেছিলেন। পরে প্রশাসনের লোকজন এসে মুগ্ধকে নিয়ে যায়।
অর্থাৎ পুলিশ যে ধারাবাহিকতায় মুগ্ধের অবস্থান শনাক্ত করার কথা বলছে, তাতে একাধিক ধাপ রয়েছে। প্রথমে সিদ্ধার্থ, এরপর মুগ্ধের বাড়ি, সেখান থেকে তুঁতবাগান এবং শেষ পর্যন্ত শ্মশান।
কিন্তু এই পুরো অনুসন্ধানের শুরুতে ছিল সেই ‘ম্যানুয়েল সোর্স’-এর তথ্য।
পুলিশের দাবি, লাশ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্থানীয় একটি সূত্র সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের নাম দেয়। কিন্তু ওই ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন কি না, পুলিশ তা প্রকাশ করেনি।
যদি তিনি প্রত্যক্ষদর্শী না হন, তাহলে তিনি কীভাবে দুই সন্দেহভাজনের নাম জানলেন?
আর যদি প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে থাকেন, তাহলে তদন্তের স্বার্থে তাঁর বক্তব্য, অবস্থান এবং ঘটনার সময় তাঁর উপস্থিতির বিষয়টি যাচাই করা হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
একজন ‘ম্যানুয়েল সোর্স’ পুলিশের তদন্তে তথ্য দিতে পারেন। কিন্তু সেই তথ্য তদন্তের সূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া এবং সেই তথ্যকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা এক বিষয় নয়।
সোর্সের তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা গেলেও, তার পরবর্তী তদন্তে স্বাধীন ও বস্তুগত প্রমাণ দিয়ে সেই সন্দেহের সত্যতা যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে।
এই মামলায় সেই যাচাই কীভাবে হয়েছে, তা প্রকাশ্যে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
সিদ্ধার্থকে আটকের পর তাঁর শরীরে আঁচড়ের দাগ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তীর ভাষ্য অনুযায়ী, সিদ্ধার্থ এসব দাগের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ফুটবল খেলার কথা বলেছেন। পুলিশ মনে করছে, এগুলো নখের আঁচড় হতে পারে।
কিন্তু এখানেও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে।
আঁচড়ের দাগের ফরেনসিক পরীক্ষা হয়েছে কি না, দাগ কত দিনের পুরোনো, সেটি মানুষের নখের কারণে হয়েছে কি না এবং নিহত চারজনের কারও সঙ্গে সেই দাগের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, এসব বিষয় নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
কারণ একজন সন্দেহভাজনের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া মানেই তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
দুই আসামিকে আটকের পর পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের একটি বর্ণনা দেয়।
তৎকালীন মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদের বক্তব্য অনুযায়ী, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ পুলিশকে জানিয়েছিলেন, তারা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনের জন্য গিয়েছিলেন।
সেখানে শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী খালি গায়ে ও গলায় গামছা নিয়ে ছাদে আসেন। এরপর অভিযুক্তরা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করেন বলে পুলিশ জানায়।
পরে গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ছাদে এলে তাকেও হত্যা করা হয়। মায়ের চিৎকার শুনে মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ছাদে এলে তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
এরপর শোবার ঘরে থাকা প্রিয়ম চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানায়। এই বর্ণনা অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহের একটি নির্দিষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। কিন্তু কয়েক দিন পর আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দির বরাতে পুলিশ যে বর্ণনা দেয়, সেখানে কিছু পার্থক্য দেখা যায়।

গণপতির ১৫ লাখ টাকা কোথায় গেল, হত্যার ২২ দিন আগে উত্তোলন।
২৭ আগস্ট আয়োজিত আরেক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের পক্ষ থেকে দুই আসামির আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে জানানো হয়, চারজনের মধ্যে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে বাড়ির ছাদেই হত্যা করা হয়।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। পরে তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে ছাদে এলে তাদেরও হত্যা করা হয়।
এরপর সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ার আশঙ্কায় বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় বলে পুলিশ জানায়। গণপতির মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয় এবং তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ ছাদের সিঁড়ির গেটের আড়ালে রাখা হয় বলে জানানো হয়।
প্রশ্ন হলো, তদন্তের প্রথম পর্যায়ে পুলিশের দেওয়া বর্ণনা এবং পরে আদালতের জবানবন্দির ভিত্তিতে দেওয়া বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য কেন?
এটি কি তদন্তের সময় নতুন তথ্য পাওয়ার ফল, নাকি প্রথম বর্ণনাটি আসামিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের অসম্পূর্ণ সংস্করণ ছিল? পুলিশের কাছ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে তদন্তের স্বচ্ছতা আরও পরিষ্কার হতো।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, সিদ্ধার্থকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তিনি হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেননি।
বারবার তিনি বলেছেন, ‘আমি কিছু করিনি।’
এরপর মুগ্ধকে আটক করে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার পথে গাড়িতেই তিনি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত বলতে শুরু করেন বলে পুলিশ দাবি করেছে।
পরে দুজনকে আলাদা কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
পুলিশের দাবি, মুগ্ধ তুলনামূলকভাবে সহজেই ঘটনার বিষয়ে কথা বলছিলেন। অন্যদিকে সিদ্ধার্থ তখনো নীরব ছিলেন।
একপর্যায়ে দুজনকে মুখোমুখি করা হয়। তখন মুগ্ধ সিদ্ধার্থকে বলেন, ‘বলে দে ভাই, বলে দে। আমি বলে দিছি।’
এরপর সিদ্ধার্থও পুলিশের কাছে বক্তব্য দেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এই পর্যায়ে তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, দুজনের বক্তব্য কতটা স্বাধীনভাবে নেওয়া হয়েছিল এবং জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাদের আইনগত অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল।
বিশেষ করে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া বক্তব্যের মধ্যে আইনগত পার্থক্য রয়েছে। আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি একজন বিচারিক কর্মকর্তার সামনে রেকর্ড হওয়ার কথা।
তাই পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে আদালতের জবানবন্দির সামঞ্জস্যও তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশ জানিয়েছে, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দুজনই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পুলিশের দাবি, ওই জবানবন্দিতে তারা হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
তবে তদন্তের স্বচ্ছতার প্রশ্নে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বিষয়বস্তু এবং তার প্রমাণমূল্য আদালতই মূল্যায়ন করবে। পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে কোনো বক্তব্যের বরাত দিলেই সেটি চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত সত্য হয়ে যায় না।
অপরাধের বিচারিক সত্যতা নির্ভর করবে অন্যান্য সাক্ষ্য, আলামত, ফরেনসিক পরীক্ষা, ঘটনাস্থলের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রমাণের ওপর।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের আগের রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ তাদের বন্ধু সীমান্তের বাড়িতে গিয়ে ইয়াবা সেবন করেছিলেন।
সীমান্তও আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এই তথ্যও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ সীমান্তের বক্তব্যের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের আগের রাতে দুই আসামির গতিবিধি যাচাই করা সম্ভব হতে পারে।
তবে সীমান্তের বক্তব্য কী ছিল, তিনি ঠিক কী দেখেছেন, কখন দেখেছেন এবং তাঁর বক্তব্য অন্য কোনো স্বাধীন প্রমাণের সঙ্গে মেলে কি না, সেসব প্রকাশ্যে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
অন্যদিকে, মুগ্ধকে দখিগঞ্জ শ্মশান থেকে আটক করার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ মহন্ত।
পুলিশ জানিয়েছে, মুগ্ধকে আটকের সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে বিদ্যুৎ মহন্ত আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
এটি তদন্তের একটি তুলনামূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ একজন নিরপেক্ষ স্থানীয় ব্যক্তি হিসেবে তিনি মুগ্ধকে শ্মশানে দেখেছেন এবং পুলিশ তাকে কী অবস্থায় আটক করেছে, সে বিষয়ে তথ্য দিতে পারেন।
এই সাক্ষ্যের সঙ্গে পুলিশের অভিযানসংক্রান্ত তথ্য কতটা মেলে, সেটিও তদন্তের স্বচ্ছতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
দুই আসামিকে আটকের পর সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার জানিয়েছিলেন, হত্যাকাণ্ডের সময় এক নারী চিৎকারের শব্দ শুনেছিলেন।
ওই নারী পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন বলেও তিনি জানান।
এমনকি পুলিশকে জানানোর কারণে তাঁর স্বামী তাঁকে মারধর করেছিলেন বলেও ওই নারী দাবি করেছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
যদি ওই নারী হত্যাকাণ্ডের সময় বা তার কাছাকাছি সময়ে কোনো শব্দ শুনে থাকেন, তাহলে তাঁর বক্তব্য মামলার গুরুত্বপূর্ণ পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য হতে পারে।
তবে তিনি ঠিক কোথায় ছিলেন, কত দূর থেকে শব্দ শুনেছেন, সময়টি কতটা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং তিনি কী ধরনের শব্দ শুনেছিলেন, সেসব তথ্য প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়।
চারজনকে হত্যার মতো একটি গুরুতর অপরাধে দ্রুত সন্দেহভাজন শনাক্ত করে আটক করা পুলিশের তদন্তের সক্ষমতার দৃষ্টান্ত হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
কিন্তু দ্রুত গ্রেপ্তারের সঙ্গে তদন্তের স্বচ্ছতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই মামলায় লাশ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সন্দেহভাজনের নাম পাওয়া, রাতের মধ্যেই সিদ্ধার্থকে আটক, তাঁর কাছ থেকে মুগ্ধের অবস্থান জানা, মুগ্ধের পালিয়ে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত শ্মশান থেকে তাকে আটক করার যে ধারাবাহিকতা পুলিশ বলছে, তা নিঃসন্দেহে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিন্তু এর প্রথম ধাপটি এখনো অনেকটাই অস্বচ্ছ। ‘ম্যানুয়েল সোর্স’ কে, তার তথ্যের উৎস কী, সে কীভাবে দুইজনের নাম জানল এবং সেই তথ্যের স্বাধীন যাচাই কীভাবে হলো, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্য হত্যার তদন্তে এখন কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি।
‘ম্যানুয়েল সোর্স’ কি প্রত্যক্ষদর্শী?
সে কখন এবং কোথা থেকে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের নাম পেয়েছিল?
সোর্সের তথ্যের সঙ্গে অন্য কোনো বস্তুগত প্রমাণ মিলেছিল কি না?
সিদ্ধার্থের শরীরের আঁচড়ের ফরেনসিক পরীক্ষা হয়েছে কি না?
ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামতের সঙ্গে দুই আসামির কোনো বৈজ্ঞানিক যোগসূত্র পাওয়া গেছে কি না?
হত্যাকাণ্ডের সময় দুই আসামির মোবাইল ফোনের অবস্থান কোথায় ছিল?
তাদের ফোনের কললিস্ট, বার্তা ও যোগাযোগের তথ্য পরীক্ষা করা হয়েছে কি না?
ঘটনার আগে ও পরে তারা কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল?
সিসিটিভি ফুটেজে তাদের গতিবিধির কোনো অংশ ধরা পড়েছে কি না?
সীমান্তের দেওয়া জবানবন্দি স্বাধীন কোনো প্রমাণের সঙ্গে মেলে কি না?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, পুলিশের প্রথম সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য এবং পরে ১৬৪ ধারার জবানবন্দির ভিত্তিতে দেওয়া বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্যের কারণ কী?
সূত্রঃ কালবেলার প্রতিবেদনের আলোকে
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au