গাজার ধ্বংসস্তূপে মিলল মালকা পরিবারের ৫৫ জনের মরদেহ
গাজা সিটির জয়তুন এলাকায় একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ৫৫ জনের মরদেহ ও দেহাবশেষ উদ্ধার করেছে ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্স। নিহত সবাই মালকা পরিবারের সদস্য বলে…
কম্পিউটারে ডেটা এন্ট্রির চাকরির আশায় দালালের মাধ্যমে কম্বোডিয়ায় গিয়েছিলেন মো. শফিকুল ইসলাম। সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁর পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে একটি ‘স্ক্যাম সেন্টারে’ আটকে রেখে অনলাইনে প্রতারণার কাজে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। রাজি না হওয়ায় মারধর ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার পাশাপাশি তাঁকে বিক্রির চেষ্টাও করা হয়েছিল বলে তাঁর দাবি।
৩০ বছর বয়সী শফিকুলের ভাষ্য, কম্বোডিয়ায় ২২ দিনের দুঃসহ অভিজ্ঞতার মধ্যে ১৭ দিন তাঁকে ওই প্রতারণাকেন্দ্রে বন্দী থাকতে হয়। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশি কমিউনিটির সহায়তায় ৩ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার পরিশোধ করে তিনি মুক্তি পান। এরপর দেশে ফিরে আসেন ১৮ নভেম্বর।
শফিকুল রাজধানীর মিরপুরে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে থাকেন। প্রায় আট বছর ধরে তিনি অগ্নিনির্বাপণসামগ্রীর ব্যবসা করছিলেন। গত বছর ফেসবুকে মো. মাসুদ মিয়া নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয়ের পর বিদেশে চাকরির প্রস্তাব পান তিনি। পরে কম্পিউটারে ডেটা এন্ট্রির কাজের কথা বলে তাঁকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়।
শফিকুলের পাসপোর্ট, ভ্রমণসংক্রান্ত নথি ও আর্থিক লেনদেনের কিছু তথ্য এই প্রতিবেদক দেখেছেন। তবে কম্বোডিয়ায় তাঁকে আটকে রাখা, নির্যাতন করা কিংবা বিক্রির চেষ্টার অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
শফিকুল জানান, কম্বোডিয়ায় যাওয়ার আগে তিনি কম্পিউটারের প্রাথমিক কাজ শেখেন। গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর ২০০ টাকার স্ট্যাম্পে মাসুদের সঙ্গে তাঁর সাড়ে চার লাখ টাকার চুক্তি হয়। ঢাকার প্রবাসীকল্যাণ ভবনে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তিন দিনের প্রশিক্ষণ নেন এবং ছাড়পত্র বা স্মার্টকার্ডও পান।
প্রথমে ১৬ অক্টোবর তাঁর ফ্লাইটের সময় নির্ধারণ করা হলেও পরে তা পরিবর্তন করে ২৬ অক্টোবর করা হয়।
শফিকুল বলেন, ঢাকার বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাঁকে আটকে দেয়। পরে প্রবাসী ডেস্ক থেকে স্মার্টকার্ড যাচাই করে আসতে বলা হয়।
তাঁর ভাষ্য, প্রবাসী ডেস্কের একজন কর্মী সবার কার্ড স্ক্যান করে যাচাই করছিলেন। তাঁর পাসপোর্ট দেওয়ার পর নাম দেখে যাচাই ছাড়াই তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে ইমিগ্রেশনে গেলে তিনি দেশ ছাড়ার অনুমতি পান।
তবে কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁকে দেশটির ইমিগ্রেশন আটকে দেয় বলে দাবি শফিকুলের। তাঁর পাসপোর্ট জব্দ করে রাখা হয়। এ সময় নমপেন বিমানবন্দর থেকে কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত মাসুদের সহযোগী মোস্তফা মুকুলের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন তিনি।
শফিকুলের দাবি, কিছুক্ষণ পর সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ সদস্য তাঁর মুঠোফোনের বার্তা দেখেন। পরে তাঁর এমপ্লয়মেন্ট ভিসা পরিবর্তন করে ভ্রমণ ভিসা দেওয়া হয়। এরপর তাঁকে বিমানবন্দর থেকে বের করে দেওয়া হয়।
শফিকুল জানান, নমপেন বিমানবন্দরের বাইরে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন মুকুলের সহযোগী আরিফ। তাঁর সঙ্গে অটোরিকশায় করে প্রায় ৪০ মিনিট পর একটি আবাসিক ভবনে পৌঁছান তিনি। এর মধ্যেই আরিফ তাঁর কাছ থেকে ৮০০ মার্কিন ডলার নেন।
রাতে ওই ভবনে কিছু খাবার দেওয়া হয়। বলা হয়, কিছুক্ষণ পর তাঁর চাকরির সাক্ষাৎকার হবে। কিন্তু রাত একটার দিকে তাঁকে আরও একজনের সঙ্গে গাড়িতে তোলা হয়। পরদিন ২৭ অক্টোবর সকাল আটটার দিকে থাইল্যান্ড সীমান্তের কাছে একটি কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁদের।
শফিকুলের বর্ণনা অনুযায়ী, সীমানাপ্রাচীর ঘেরা ওই চত্বরে ছয়তলা তিনটি ভবন ছিল। তাঁদের রাখা হয় একটি ভবনের তৃতীয় তলায়। কাজের জায়গা ছিল পঞ্চম তলায়।
তাঁর দাবি, পুরো চত্বরটি ছিল অনেকটা কারাগারের মতো। চারপাশে নিরাপত্তাকর্মী থাকায় বাইরে বের হওয়ার সুযোগ ছিল না। তাঁর পাসপোর্ট ও মুঠোফোন নিয়ে নেওয়া হয়। চীনা ভাষায় লেখা একটি কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এরপর হিন্দি ও ইংরেজিতে লেখা দুটি স্ক্রিপ্ট দিয়ে সেগুলো মুখস্থ করতে বলা হয়।
পরদিন, ২৮ অক্টোবর, শুরু হয় কাজ।
শফিকুলের দাবি, ওই প্রতিষ্ঠানটি মূলত একটি ‘স্ক্যাম সেন্টার’। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এর মালিক চীনা নাগরিক এবং পরিচালনার সঙ্গে পাকিস্তানিরা যুক্ত ছিলেন। সেখানে ‘কলিং’ ও ‘চ্যাটিং’ নামে দুটি প্রধান বিভাগ ছিল।
‘কলিং’ বিভাগে কয়েকটি ধাপে প্রতারণার কাজ চলত বলে জানান তিনি। প্রথম ধাপে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ফোন নম্বরে কল করে নাম-ঠিকানা যাচাই করা হতো। মূলত ভারতীয় নাগরিকদের লক্ষ্য করা হতো।
এরপর দ্বিতীয় ধাপে ফোন করে আধার কার্ডসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য যাচাই করা হতো। তৃতীয় ধাপে পুলিশ সেজে ভিডিও কল করা হতো। শফিকুলের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি কক্ষকে থানার আদলে সাজানো ছিল। সেখানে এক বা দুজনকে হাতকড়া পরিয়ে ‘আসামি’ হিসেবে দেখিয়ে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হতো।
চতুর্থ ধাপে ব্যাংকের আদলে সাজানো কক্ষ থেকে একই ব্যক্তিকে ফোন করা হতো। পুলিশের কথা বলে জরিমানা দাবি করা এবং ব্যাংক হিসাবের বিভিন্ন তথ্য ও পিন নম্বর নেওয়া হতো। পরে এসব তথ্য ব্যবহার করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হতো বলে দাবি করেন শফিকুল।
‘চ্যাটিং’ বিভাগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডেটিং অ্যাপে নারীদের নামে ভুয়া প্রোফাইল ব্যবহার করা হতো বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের লক্ষ্য করে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করা হতো। পরে অডিও কলে কথা বলার মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা হতো।
শফিকুল বলেন, পুরুষ কর্মীরা কথা বললেও সফটওয়্যারের মাধ্যমে অপর প্রান্তে নারীর কণ্ঠ শোনানো হতো। কথোপকথনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য সংগ্রহ করে পরে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হতো।
শফিকুল জানান, ২৮ অক্টোবর তিনি ও ইশতিয়াক রাব্বী নামের আরেক বাংলাদেশি ‘কলিং’ বিভাগের দ্বিতীয় ধাপের কাজে যোগ দেন। দুই দিন পর তাঁরা ওই কাজ করতে অস্বীকৃতি জানান।
এরপর তাঁদের দুজনকে হাতকড়া পরিয়ে আটকে রাখা হয় বলে দাবি করেন শফিকুল। তাঁর ভাষ্য, ওই রাতেই তাঁদের ‘ইন্টারভিউ’ নেওয়া হয়। পরে রাব্বীকে অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া হয় এবং তাঁর ওপর নির্যাতন শুরু হয়।
শফিকুলের অভিযোগ, তাঁকে মারধর করা হয় এবং বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। পাশাপাশি পর্যাপ্ত খাবারও দেওয়া হতো না। কয়েক দফা তাঁকে বিক্রির চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি বলে দাবি তাঁর।
শফিকুল বলেন, ১৬ নভেম্বর হঠাৎ তাঁকে ছেড়ে দিয়ে একটি গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়। গাড়িটি তাঁকে সিয়েম রিয়েপের একটি নির্জন এলাকায় নামিয়ে দেয়। এ সময় তাঁর পাসপোর্ট ও মুঠোফোন ফেরত দেওয়া হয়।
পরে গাড়ির চালককে অনুরোধ করলে তিনি শফিকুলকে একটি বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যান এবং সেখান থেকে নমপেনের টিকিট করে দেন।
দেশে ফোন করে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের পর তিনি জানতে পারেন, তাঁকে উদ্ধারের জন্য তাঁর ছোট ভাই কম্বোডিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছে সহায়তা চেয়েছেন। শফিকুলের দাবি, ওই কমিউনিটির সদস্যরাই ৩ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার পরিশোধ করে তাঁকে ‘স্ক্যাম সেন্টার’ থেকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করেন।
নমপেনে পৌঁছানোর পর কমিউনিটির এক প্রতিনিধির বাসায় দুই দিন থাকেন তিনি। পরে বাংলাদেশ থেকে টিকিটের ব্যবস্থা করা হলে ১৮ নভেম্বর দেশে ফেরেন। তাঁর ভাষ্য, দেশে ফিরেছেন শূন্য হাতে।
দেশে ফেরার পর শফিকুল দালাল মাসুদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর দাবি, কম্বোডিয়ায় তাঁকে বিক্রির চেষ্টা কিংবা আটকে রাখার বিষয়ে কিছুই জানতেন না বলে মাসুদ দাবি করেন। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও বলেছিলেন তিনি।
তবে এরপর থেকে মাসুদের আর কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না শফিকুল। তাঁর কথিত অফিসও বন্ধ রয়েছে বলে জানান তিনি।
শফিকুল বলেন, কম্বোডিয়ায় নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপূরণ বা বিচার পাননি। এ ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও সরকারের সহযোগিতা চান এই যুবক।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au