চীনের জিয়াংসিতে ভূমিধসে নিহত ১, নিখোঁজ ১১
চীনের জিয়াংসি প্রদেশে ভারী বৃষ্টির মধ্যে ভূমিধসে অন্তত একজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও ১১ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। আজ শনিবার স্থানীয়…
‘ওয়েট অ্যান্ড সি’। গত ২০ আগস্ট নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পুলিশের উদ্দেশে এমন হুমকি দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের রাউজানের সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত মো. রায়হান। চার দিন পর আরেক পোস্টে অনুসারীদের উদ্দেশে লিখেছিলেন, ‘ছোট ভাইয়েরা সবাই রেডি হও। রাউজানে কার কার ঘরে ভাঙচুর করা লাগবে লিস্ট করো।’
এর ১০ দিনের মাথায় গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাউজানের কেরানীহাট বাজারে প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় যুবদল কর্মী মোহাম্মদ করিমকে (৩৫)। একদল অস্ত্রধারী মোটরসাইকেলে এসে তাঁকে ঘিরে ধরে হামলা চালিয়ে চলে যায়। আতঙ্কে প্রায় এক ঘণ্টা সড়কের ওপর পড়ে ছিল করিমের লাশ। পরে পুলিশ গিয়ে তা উদ্ধার করে।
হত্যাকাণ্ডের প্রায় ছয় ঘণ্টা পর, শুক্রবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে নিজের ফেসবুক স্টোরিতে গুলি ছোড়ার একটি ভিডিও প্রকাশ করেন রায়হান। স্থানীয় বাসিন্দা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের ভাষ্য, এভাবে প্রকাশ্যে ভিডিও ও হুমকি দিয়ে রায়হান যেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করছেন।
রায়হানকে ধরতে পুলিশের অভিযান ব্যর্থ হওয়ার ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ জুলাই নোয়াখালীতে পুলিশের অভিযানের সময় একটি বাসার ছাদ থেকে পালিয়ে যান তিনি। এরপর তাঁর প্রকাশ্য হুমকি এবং রাউজানে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সন্ত্রাসীদের সংঘবদ্ধ হওয়ার আগাম তথ্য থাকার পরও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না কেন, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে রাউজানে ২৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ২০টি হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধসহ সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।
বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত রায়হানের বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা রয়েছে। গত ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী চৌমুহনী এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে হত্যার ঘটনায়ও রায়হানের নির্দেশের কথা মামলার আসামিদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। তবে এখনো তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপুলিশ পরিদর্শক মো. নাজিমুল হক বলেন, রাউজান ও আশপাশের এলাকায় সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে চারটি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ক্যাম্প স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিটি ক্যাম্পে এক প্লাটুন সদস্য রাখার পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের চলাচলের পথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ক্যামেরা স্থাপন ও থার্মাল ড্রোন দিয়ে নজরদারির প্রস্তাব রয়েছে। রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সের সদস্যদেরও টহলে রাখার কথা বলা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে কেরানীহাট বাজারে ঢোকার সময় চার-পাঁচটি মোটরসাইকেলে করে আসা একদল অস্ত্রধারী করিমকে ঘিরে ধরে।
তাঁদের একজন কিরিচ দিয়ে করিমের ঘাড় ও মাথায় কোপ দেন। রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি মাটিতে পড়ে গেলে কয়েকজন তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। পরে মৃত্যু নিশ্চিত করে মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল থেকে চলে যান হামলাকারীরা।
পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করিমের পেট, ঊরু ও নিতম্বে গুলির আঘাত রয়েছে। একটি গুলি কোমরের পাশ দিয়ে ঢুকে পেট দিয়ে বের হয়ে যায়। তাঁর ঘাড় ও কপালেও কোপের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের আশপাশে কোনো ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা ছিল না।
শুক্রবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে করিমের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, করিমের বিরুদ্ধে চুরি, মাদক, ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণসহ বিভিন্ন অভিযোগে অন্তত ১০টি মামলা ছিল। তিনি একাধিকবার কারাগারেও ছিলেন।
করিমের পরিবারের বসবাস হাটহাজারীর আমানবাজার এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় তিনি দেশে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন। পরে বড় ভাইয়ের সহযোগিতায় বিদেশে যান। দেশে ফিরে মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ স্থানীয় লোকজনের।
করিমের স্ত্রী বিলকিস আকতার বলেন, কয়েক দিন ধরে করিমকে গ্রামের একটি বৈঠকে বসার জন্য কয়েকজন সন্ত্রাসী ফোন করে ডাকছিলেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি বাড়ি থেকে বের হন। রাতে তাঁর গুলি করে হত্যার খবর পান তাঁরা।
রায়হানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকলেও করিম হত্যার সঙ্গে কোনো সন্ত্রাসী বাহিনীর যোগসূত্র এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, রাউজানের সব কটি হত্যাকাণ্ডে পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার করেছে এবং অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। রায়হানসহ অন্য জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। সম্প্রতি জামিনে বের হওয়া সন্ত্রাসীদের ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
তবে করিম হত্যার পেছনে মাদকের বিরোধ থাকতে পারে বলে জানান পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, সব বিষয় সামনে রেখে ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে।
রাউজানে একের পর এক প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্ত্রাসীদের হুমকির পরও আগাম ব্যবস্থা নিতে না পারা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে চলাচল ও সংঘবদ্ধ হওয়ার তথ্য থাকার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না কেন, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের গতিবিধি নজরদারিতে পুলিশের গোয়েন্দা তথ্য ও সোর্সব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সোর্স মানি যথাসময়ে দিতে হবে।
তাঁর মতে, পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে এনে স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের পেছনে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকলে তাঁদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au