আরও দুই মামলায় চিন্ময় দাসের জামিন
ভাঙচুর ও পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা আরও দুই মামলায় সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে জামিন দিয়েছেন হাই কোর্ট। রোববার…
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় তদন্তের সময়-রেখা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসায়ী এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর দাবি, নিহত গণপতি চক্রবর্তী হত্যাকাণ্ডের আগের দিন, অর্থাৎ ১৯ আগস্ট, তার দোকানে এসে নির্মাণসামগ্রী কেনার কথা জানিয়েছিলেন। এমনকি পরদিন ২০ আগস্ট তার দোকানে এসে লোহার রড ও সিমেন্ট কেনার পরিকল্পনাও ছিল গণপতির।
এই বক্তব্য পুলিশের তদন্তে উঠে আসা ঘটনাক্রমের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার দাবি রাখে। কারণ, পুলিশি তদন্তে ১৯ আগস্টকেই হত্যাকাণ্ডের দিন হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে। অথচ ব্যবসায়ী দেবাশীষ গুপ্তের বক্তব্য সত্য হলে ১৯ আগস্ট গণপতি স্বাভাবিকভাবে নিজের নির্মাণকাজ নিয়ে পরিকল্পনা করছিলেন এবং পরদিন দোকানে গিয়ে মালামাল কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ফলে ১৯ আগস্ট থেকে ২২ আগস্ট মরদেহ উদ্ধারের মধ্যবর্তী সময়ের প্রতিটি ঘণ্টার ঘটনাক্রম নতুন করে যাচাই করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

রংপুরে একটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু পরিবারের চার সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ছবিঃ সংগৃহীত
৭৫ বছর বয়সী দেবাশীষ গুপ্ত রংপুরের ইমারত ট্রেডিংয়ের মালিক। সেনপাড়া রোডে ১৯৭৮ সাল থেকে ব্যবসা করে আসা এই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণসামগ্রী কিনতেন গণপতি চক্রবর্তী। উত্তর-পূর্ব নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেবাশীষ গুপ্ত দাবি করেন, ১৯ আগস্ট বুধবার গণপতি তার হার্ডওয়্যারের দোকানে এসেছিলেন।
দেবাশীষ গুপ্তের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপতি তাকে জানান, তার দাসপাড়া-মেছুয়াপাড়ার বাড়ির তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য নির্মাণসামগ্রী প্রয়োজন। তিনি বিশেষ করে লোহার রড ও সিমেন্ট কেনার কথা বলেন। গণপতি তাকে আরও জানিয়েছিলেন, পরদিন ২০ আগস্ট শুক্রবার তিনি আবার দোকানে এসে এসব নির্মাণসামগ্রী কিনবেন।
এখানেই তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে আসে। যদি ১৯ আগস্ট গণপতি ইমারত ট্রেডিংয়ে গিয়ে পরদিন নির্মাণসামগ্রী কেনার পরিকল্পনার কথা বলে থাকেন, তাহলে ওই দিন তার চলাফেরা, দোকানে যাওয়া, কার সঙ্গে দেখা করা এবং এরপর তার অবস্থান কী ছিল, তা কি তদন্তকারীরা পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাই করেছেন?
দেবাশীষ গুপ্ত জানান, গণপতি তার সঙ্গে বাড়ির তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ নিয়ে কথা বললেও নিজে শ্রমিক দিয়ে কাজ করানোর পরিকল্পনা করেননি। তিনি অন্য শ্রমিক নিয়োগ করে কাজটি করাবেন বলে জানিয়েছিলেন। গণপতির হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার চেম্বারও ইমারত ট্রেডিং থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না বলে জানান এই ব্যবসায়ী।
শুধু তাই নয়, দোকানের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে দেবাশীষ গুপ্ত জানান, গণপতি সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ইমারত ট্রেডিং থেকে নির্মাণসামগ্রী কিনেছিলেন। সে সময় তার তিনতলা বাড়ির কিছু অংশের নির্মাণকাজ চলছিল। ফলে বাড়ির নির্মাণকাজ নিয়ে গণপতির নিয়মিত যোগাযোগ ও নির্মাণসামগ্রী কেনার বিষয়টি ব্যবসায়ীর কাছে অস্বাভাবিক ছিল না।
দেবাশীষ গুপ্ত গণপতিকে দীর্ঘদিনের পরিচিত হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, তিনি ছিলেন শান্ত ও নিরিবিলি স্বভাবের মানুষ। সাধারণত কারও সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদে জড়াতেন না। দীর্ঘদিনের পরিচয় থাকা সত্ত্বেও গণপতি কখনো তার কাছে নিজের কোনো বিপদ, বিরোধ বা সমস্যার কথা বলেননি বলে দাবি করেন তিনি।
এই বক্তব্য চার সদস্যের হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। গণপতির বাড়ির নির্মাণকাজ, তৃতীয় তলা নির্মাণের পরিকল্পনা এবং এ-সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেন নিয়ে আগে থেকেই কোনো বিরোধ ছিল কি না, সেটি তদন্তে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। নির্মাণকাজের জন্য কার সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল, কারা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন, নির্মাণসামগ্রী কার কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছিল এবং নির্মাণের কারণে কারও সঙ্গে অর্থনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিরোধ তৈরি হয়েছিল কি না, এসব প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ।

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চারজনকে হত্যার খবরে স্বজনদের আহাজারি। ছবিঃ সংগৃহীত
রংপুর নগরীর দাসপাড়া-মেছুয়াপাড়া এলাকায় গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগমী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীকে হত্যার পর ২২ আগস্ট রাতে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য ফরেনসিক আলামত থেকে হত্যার ধরন ও সময় নির্ধারণের চেষ্টা চলছে।
তবে হত্যার পর ঘটনাস্থলে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মরদেহ উদ্ধারের রাতে স্থানীয় থানার কর্মকর্তাদের পাশাপাশি গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হিসেবে সেখানে থাকা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মুখে মাস্ক থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে প্রথমে কারা প্রবেশ করেছিলেন, কে কোন আলামত সংগ্রহ করেছিলেন, ঘটনাস্থল কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল এবং ফরেনসিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, এসব তথ্যও তদন্তের স্বচ্ছতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ঘটনার পর খুব দ্রুত মামলাটির তদন্ত গোয়েন্দা শাখার কাছে হস্তান্তর করা হয়। তদন্তে গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তীর ভূমিকা সামনে এসেছে। তবে তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘটনাক্রম ও গ্রেপ্তার হওয়া দুই সন্দেহভাজনকে ঘিরে পুলিশের বক্তব্যে অসঙ্গতি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব বক্তব্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ১৯ আগস্টের ঘটনাক্রম এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গণপতি যদি ওই দিন ইমারত ট্রেডিংয়ে গিয়ে ২০ আগস্ট ফেরার কথা বলে থাকেন, তাহলে দোকানের উপস্থিতির প্রমাণ, কর্মচারীদের বক্তব্য, দোকানের হিসাবখাতা, বিক্রয় রেজিস্টার, আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ এবং গণপতির মোবাইল ফোনের অবস্থান যাচাই করে তার গতিবিধি নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে শুধু একজন ব্যবসায়ীর মৌখিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে ডিজিটাল ও নথিভিত্তিক প্রমাণের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। ১৯ আগস্ট গণপতি কখন বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন, কখন দোকানে গিয়েছিলেন, সেখানে কতক্ষণ ছিলেন, এরপর কোথায় গিয়েছিলেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং শেষবার কখন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, এসব তথ্য একত্র করলে হত্যার সময় সম্পর্কে একটি নির্ভরযোগ্য সময়রেখা তৈরি হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০ আগস্ট গণপতির দোকানে যাওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছিল কি না। যদি তিনি ২০ আগস্ট দোকানে না গিয়ে থাকেন, তাহলে কেন যাননি, তিনি তার পরিকল্পনা পরিবর্তন করেছিলেন কি না, নাকি তার আগেই কোনো ঘটনা ঘটে গিয়েছিল, সেটিও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত। আবার তিনি অন্য কোথাও গিয়ে থাকলে সেই তথ্যও মোবাইল ফোন, সিসিটিভি, প্রত্যক্ষদর্শী ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব।
চারজনের হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে তাই শুধু আটক দুই সন্দেহভাজনের বক্তব্য বা একটি নির্দিষ্ট তত্ত্বের ওপর নির্ভর না করে পুরো সময়রেখা পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। গণপতির নির্মাণকাজ, পরিবারের আর্থিক অবস্থা, সম্ভাব্য বিরোধ, সাম্প্রতিক যোগাযোগ, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক, চিকিৎসা চেম্বারে তার নিয়মিত যাতায়াত এবং ১৯ আগস্টের দোকান সফর সবকিছু একই সঙ্গে বিশ্লেষণ করা দরকার।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন, ১৯ আগস্ট গণপতি যদি স্বাভাবিকভাবে নির্মাণসামগ্রী কেনার পরিকল্পনা করে থাকেন, তাহলে ওই দিন থেকে তার পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধারের আগ পর্যন্ত আসলে কী ঘটেছিল?
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au