সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাড বলেছেন, চীনকে প্রতিহত করতে অস্ট্রেলিয়াকে মিত্রদের সঙ্গে আরও জোরালোভাবে কাজ করতে হবে। ছবি: নিউজওয়্যার/মার্টিন ওলম্যান
তাইওয়ানে চীনের সম্ভাব্য সামরিক হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়াকেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাড।
তিনি সতর্ক করে বলেছেন, চীন যদি তাইওয়ানে হামলা চালায়, তাহলে অস্ট্রেলিয়ার দোরগোড়ায় একটি ভয়াবহ যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হবে। সেই যুদ্ধ ঠেকানোর চাবিকাঠি হলো চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যেন প্রতিদিন নিজেকে বোঝান, ‘এখনো ঝুঁকিটা অনেক বেশি।’
বৃহস্পতিবার ক্যানবেরায় ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে দেওয়া এক বিস্তৃত বক্তৃতায় কেভিন রাড তাঁর ‘চূড়ান্ত সূত্র’ হিসেবে SMTX ধারণার কথা তুলে ধরেন। তাঁর ব্যাখ্যায়, SMTX হলো ‘Shaving Mirror Test of Xi’, অর্থাৎ সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শেভ করার সময় শি জিনপিংয়ের মনে যেন প্রতিদিন একই বার্তা আসে, ‘কমরেড, এখনো এটি অনেক ঝুঁকিপূর্ণ।’
রাড বলেন, এটাই প্রতিরোধের মূল উদ্দেশ্য। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র, বন্ধু, অংশীদার ও মিত্রদের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়াকে এই প্রতিরোধব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তবে প্রতিরোধ ব্যর্থ হলে অস্ট্রেলিয়ার কী করা উচিত, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
রাড বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করা কারও জন্য এ ধরনের কাল্পনিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করা দায়িত্বশীল আচরণ হবে না।
বর্তমানে এশিয়া সোসাইটি নামের একটি প্রভাবশালী থিংকট্যাংকের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রাড। এর আগে চলতি বছরের শুরু পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূত ছিলেন।
২০২৮ সালে তাইওয়ানে হামলার আশঙ্কা
চীনবিষয়ক আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত বিশেষজ্ঞ কেভিন রাড চলতি বছরের শুরুতে সতর্ক করে বলেছিলেন, ২০২৮ সালে বেইজিংয়ের তাইওয়ানে হামলা চালানোর সম্ভাবনা তিন ভাগের এক ভাগ। ওই বছর স্বশাসিত দ্বীপটিতে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে।
রাডের আশঙ্কা, এই নির্বাচন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের জন্য সম্ভাব্য ‘ট্রিগার’ বা সামরিক পদক্ষেপের সূচনাবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, তাইওয়ানের ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি (DPP) আবারও নির্বাচিত হলে দলটির নেতৃত্বে টানা চার মেয়াদ সরকার গঠিত হবে। চীনের নেতৃত্ব এটিকে ২০০৫ সালের অ্যান্টি-সিসেশন আইন কার্যকরের জন্য ‘ট্রিপ-ওয়্যার’ বা নির্ধারিত সীমা অতিক্রমের ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করতে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা।
চীনের ওই আইনের ৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, তাইওয়ানের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে পুনরেকত্রীকরণের সব পথ ‘শেষ হয়ে গেলে’ চীনা সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় ‘অশান্তিপূর্ণ উপায় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নিতে পারবে।
রাড বলেন, এ কারণেই তিনি ২০২৮ সালের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন।

চীনা সামরিক বাহিনী নিয়মিত তাইওয়ানে সম্ভাব্য আগ্রাসনের মহড়া চালায়। ছবি: পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)
‘আত্মতুষ্টিতে ভুগছে অস্ট্রেলিয়া’
বক্তৃতার বড় অংশজুড়ে কেভিন রাড অনিশ্চিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব শিল্প ও উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠনে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দ্রুত একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ৬০ বছর আগে লেখক ডোনাল্ড হর্ন অস্ট্রেলিয়াকে ‘লাকি কান্ট্রি’ বা সৌভাগ্যবান দেশ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু সেই ধারণা এখন আর বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
রাডের ভাষায়, অস্ট্রেলিয়া এখন ‘ধার করা সময়ের’ ওপর চলছে। দেশটির মানুষ এখনো নিজেদের সান্ত্বনা দেয় যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারা নিজেদের সামর্থ্যের তুলনায় বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু বাস্তবে অনেক দিন ধরেই এমনটি ঘটছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জাতীয় অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাতটি খাত চিহ্নিত করেছেন রাড। এগুলো হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), বায়োটেকনোলজি, জ্বালানি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, প্রতিরক্ষা শিল্প, গাড়ি উৎপাদন এবং অর্থনীতি।

ড. রাড বলেছেন, অস্ট্রেলিয়া এখন ‘ধার করা সময়ের’ ওপর চলছে। ছবি: নিউজওয়্যার/মার্টিন ওলম্যান
অস্ট্রেলিয়ার গাড়ি উৎপাদন শিল্পের পতন নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। তিনি দেশটিতে নতুন করে গাড়ি উৎপাদন শিল্প গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
রাড বলেন, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে অদূরদর্শী অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে অ্যাবট-হকি সরকারের আমলে অস্ট্রেলিয়ার গাড়ি উৎপাদন শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়া অন্যতম।
তাঁর দাবি, তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে অস্ট্রেলিয়ার গাড়ি শিল্পে ভর্তুকি বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় খুব বেশি ছিল না। কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে শিল্পটি বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে হাজার হাজার মানুষ চাকরি হারান। একই সঙ্গে দেশটির প্রকৌশল ও উৎপাদনভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং গাড়ির ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে যায়।
তবে থ্রিডি প্রিন্টিং ও বৈদ্যুতিক গাড়ির (EV) প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সুযোগ কাজে লাগিয়ে অস্ট্রেলিয়া আবারও নিজস্ব গাড়ি শিল্প গড়ে তুলতে পারে বলে মনে করেন রাড। তাঁর মতে, এটি জাতীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতাও কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে।
অস্ট্রেলিয়ায় আবারও উৎপাদন বাড়ানোর এই আহ্বান দেশটির লিবারেল পার্টির নেতা অ্যান্ড্রু হ্যাস্টির সাম্প্রতিক বক্তব্যের সঙ্গেও অনেকটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনিও নতুন করে অস্ট্রেলীয় গাড়ি শিল্প গড়ে তোলার পক্ষে মত দিয়েছেন।
বক্তৃতার শেষে কেভিন রাড বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি এখনো ‘গভীরভাবে আশাবাদী’। তবে সেই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে অস্ট্রেলিয়াকে এখনই ঐক্যবদ্ধভাবে উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা ভালো মানুষ, আমাদের রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস এবং আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরি করার সুযোগ। তবে সেই ভবিষ্যৎ অর্জন করতে হলে এখনই দুই হাতে তা আঁকড়ে ধরতে হবে এবং আবারও ক্ষুদ্র দলীয় কোন্দলে ডুবে যাওয়া যাবে না।’
সূত্র:নিউজ.কম.এইউ