ওয়াশিংটন থেকে ৯/১১-এর ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন করছেন চ্যানেল টেনের সাংবাদিক ডেবোরাহ নাইট। ছবি: নেটওয়ার্ক টেন
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। নাইন-ইলেভেনের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা বদলে দিয়েছিল বিশ্বকে। সেই দিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে ঘটনাগুলোর প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার এক তরুণ সাংবাদিক। ২৫ বছর পর সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি জানিয়েছেন, কীভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে স্বাভাবিক একটি সংবাদ সফর পরিণত হয়েছিল আতঙ্ক, বিভ্রান্তি ও মৃত্যুভয়ের এক অভিজ্ঞতায়।
সেদিনের কথা মনে হলে এখনো বিশ্বাস করা কঠিন, ওই ভয়াবহ ঘটনার ২৫ বছর পার হয়ে গেছে। অথচ যারা সেদিন ঘটনাগুলোর সাক্ষী ছিলেন, তাদের অনেকের কাছেই মনে হয়, যেন ঘটনাটি মাত্র গতকালই ঘটেছে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমি ওয়াশিংটনে ছিলাম অস্ট্রেলিয়ার চ্যানেল টেনের একজন তরুণ ফেডারেল রাজনীতি প্রতিবেদক হিসেবে। সেটিই ছিল সাংবাদিক হিসেবে আমার প্রথম বড় বিদেশ সফর। তৎকালীন অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ডের যুক্তরাষ্ট্র সফর কাভার করতেই ওয়াশিংটনে গিয়েছিলাম।
নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের একটি টাওয়ারে বিমান আঘাত করেছে, প্রথমে এমন খবর আসে। তবে তখন বিষয়টি খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি। ধারণা করা হয়েছিল, এটি হয়তো ভয়াবহ কোনো দুর্ঘটনা। এমনকি প্রথম দিকে মনে করা হচ্ছিল, কোনো যাত্রীবাহী বিমান নয়, একটি ছোট পর্যটন বিমান ভবনটিতে আঘাত করেছে।
কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়।
দ্বিতীয় একটি বিমান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের অন্য টাওয়ারে আঘাত করে। মুহূর্তের মধ্যে ভবনটি আগুনের গোলায় পরিণত হয়। আর পুরো ঘটনাটি আমরা টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচারে দেখছিলাম।
তখনই পরিষ্কার হয়ে যায়, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি পরিকল্পিত হামলা।নএর কিছুক্ষণ পর ওয়াশিংটনের উইলার্ড হোটেলে অস্ট্রেলীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জন হাওয়ার্ড। হোটেলটি হোয়াইট হাউস থেকে মাত্র কয়েক ব্লক দূরে।
সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে হাওয়ার্ড ছিলেন অত্যন্ত গম্ভীর। নিউইয়র্কে প্রাণহানির কথা উল্লেখ করে তিনি পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছিলেন।
কিন্তু তিনি যখন কথা বলছিলেন, তখনই ওয়াশিংটনের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছিল।আমরা যে কক্ষে ছিলাম, সেখানকার জানালা দিয়ে পেন্টাগন ভবনটি স্পষ্ট দেখা যেত। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সময় আলো নিয়ন্ত্রণের জন্য জানালার পর্দা টানা ছিল।
পর্দা খোলা থাকলে আমরা হয়তো নিজের চোখেই দেখতে পেতাম, তৃতীয় ছিনতাই করা বিমানটি ঠিক প্রধানমন্ত্রীর পেছনে থাকা পেন্টাগন ভবনে আছড়ে পড়ছে।
পেন্টাগনে বিমান আঘাত হানার পর মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তারা জন হাওয়ার্ডকে নিরাপদে সরিয়ে অস্ট্রেলীয় দূতাবাসের ভূগর্ভস্থ একটি সুরক্ষিত বাঙ্কারে নিয়ে যান।

৯/১১-এর সন্ত্রাসী হামলার পর পেন্টাগনের ভবনের ৬০ মিটারজুড়ে ধসে যাওয়া অংশ দিয়ে ভেতরের বিভিন্ন অংশ দৃশ্যমান। ছবি: গেটি
অস্ট্রেলীয় সাংবাদিকদেরও প্রায় এক কিলোমিটার দূরের একই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
সেই মুহূর্তের অনুভূতি ছিল অবিশ্বাস্য। কী ঘটছে, তা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু সবচেয়ে বড় ভয় ছিল, এরপর কোথায় হামলা হতে যাচ্ছে, সেটি কেউ জানত না।
পেন্টাগন থেকে ধোঁয়া আকাশে উঠছিল। চারদিকে পুলিশের সাইরেন ও জরুরি পরিষেবার গাড়ির শব্দ।
ওয়াশিংটনের রাস্তায় তখন মানুষের ঢল। সবাই নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন। অনেকেই আতঙ্কে কাঁদছিলেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন।
এর মধ্যে একের পর এক গুজব ও খবর আসতে থাকে। কোথাও বোমা রাখা হয়েছে, পাতাল রেলও হামলার লক্ষ্য হতে পারে, হোয়াইট হাউসও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে, নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনের বিভিন্ন জায়গায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, এমন নানা খবর ছড়িয়ে পড়ে।
কোনটি সত্য আর কোনটি গুজব, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
অস্ট্রেলীয় দূতাবাসের ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবস্থান করি। সেখানে প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড ও তার কর্মকর্তারা নিয়মিত পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের ব্রিফ করছিলেন।
অন্যদিকে একজন সাংবাদিক হিসেবে আমাকে চেষ্টা করতে হচ্ছিল, যা ঘটছে তা বোঝার এবং তা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার।কিছুক্ষণ আগেও যে সফর ছিল একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক সংবাদ কাভারেজ, সেটিই মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সন্ত্রাসী হামলা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধের সংবাদে।
নাইন-ইলেভেনের পরের কয়েক সপ্তাহ ওয়াশিংটন থেকে হামলা ও তার পরবর্তী ঘটনাগুলো নিয়ে প্রতিবেদন করি। অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যাওয়ার কিছুদিন পর আমাকে যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক সংবাদদাতা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

নাইন-ইলেভেনে হামলার পর নিউইয়র্ক সিটির টুইন টাওয়ারে আগুন জ্বলছে। ছবি: এপি
পরবর্তী তিন বছর যুক্তরাষ্ট্রে থেকে আমি প্রত্যক্ষ করি, নাইন-ইলেভেন কীভাবে দেশটির রাজনীতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বৈদেশিক নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। একই সঙ্গে সারা বিশ্বেও এর যে গভীর প্রভাব পড়ে, তার সাক্ষী হওয়ার সুযোগ হয়।
২৫ বছর পার হয়ে গেছে।
সময় অনেক দূর এগিয়েছে, বদলে গেছে পৃথিবীও। কিন্তু সেই দিনের আতঙ্ক, বিভ্রান্তি আর বুক কাঁপানো ভয় এখনো অনেকের স্মৃতিতে তাজা।
অনেক দিক থেকেই মনে হয়, ঘটনাটি যেন ঘটেছিল ঠিক গতকাল।
সূত্র:নাইন.কম.এইউ