গুলশানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে আওয়ামী লীগের বিশাল মিছিল
রাজধানীর গুলশানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে আওয়ামী লীগের কয়েকশ নেতাকর্মী মিছিল বের করেছেন। শুক্রবার দুপুরে গুলশান-১ নম্বরের ভোলা মসজিদের সামনে থেকে মিছিলটি বের হওয়ার উদ্যোগ নেওয়া…
বাংলাদেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে হাম-সদৃশ রোগের প্রাদুর্ভাব। চলতি বছরে সন্দেহভাজন হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১ হাজারে পৌঁছেছে। একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১ লাখ ৬৬ হাজার। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে কয়েক বছর ধরে নানা ধরনের বাধা ও টিকাদানের হার কমে যাওয়াকে এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজধানীর একটি হাসপাতালে শ্বাসকষ্টে কাতর আট মাস বয়সী রোজাতুন জান্নাত রামিসা। পাশে অসহায়ভাবে বসে আছেন তার মা-বাবা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাম ছড়িয়ে পড়ায় অসুস্থ হয়ে পড়া হাজারো শিশুর মধ্যে রামিসাও একজন।
পূর্বাঞ্চলীয় বাংলাদেশের একটি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা রামিসাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালে পাঠান। মেয়েকে নিয়ে শত শত মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় আসেন তার মা রনু আক্তার।
ঢাকা শিশু হাসপাতালে দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে রনু আক্তার বলেন, ‘১৪ দিন আগে যখন আমরা জেলা হাসপাতালে ছিলাম, তখন আমার মেয়ের সঙ্গে আরও কয়েকজন শিশুর চিকিৎসা চলছিল। আমি দেখেছি, তাদের শরীরেও লালচে ফুসকুড়ি, মুখে ঘা এবং জ্বর ছিল।’
তিনি বলেন, ‘তখনই বুঝতে পারি, হাম কতটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।’
প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা
মার্চ থেকে বাংলাদেশে হাম প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। ওই মাসে এক মাসেরও কম সময়ে শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়।
সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার পর্যন্ত চলতি বছরে সন্দেহভাজন হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৯৯ জনে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে দেশে ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ১৯ হাজার ৮৩৫ জনের হাম সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে।
প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় মার্চে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ এবং গ্যাভি ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের সহযোগিতায় এই কর্মসূচি শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরে ধাপে ধাপে কর্মসূচি সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হয়।
অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হাম
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক বায়ুবাহিত রোগ। সাধারণত জ্বর, শ্বাসতন্ত্রের নানা উপসর্গ এবং শরীরে বিশেষ ধরনের লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এ রোগ কখনো কখনো গুরুতর জটিলতা তৈরি করে মৃত্যুর কারণ হতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
হামের টিকার দুটি ডোজ রোগটির বিরুদ্ধে শক্তিশালী সুরক্ষা দেয়। তবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে একটি জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় থাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ডব্লিউএইচও।
উচ্চহারে টিকাদান শুধু টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি এমন শিশুদেরই সুরক্ষা দেয় না, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকা মানুষকেও সুরক্ষা দিতে সহায়তা করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ শিশু হামের টিকার দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৯৩ শতাংশ।
কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি ছিল নিয়ন্ত্রণে
কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশে হাম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল। দীর্ঘদিনের টিকাদান কর্মসূচির কারণে যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টঙ্কার, পোলিও ও হামসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগ থেকে শিশু ও মায়েদের সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।
২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বছরে মাত্র ১০০ থেকে ৩০০টি হাম আক্রান্তের ঘটনা রেকর্ড করা হয়। এর আগে ২০২০ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৪১০।
তবে গত কয়েক বছরে টিকাদান কর্মসূচিতে নানা ধরনের বিঘ্নের কারণে টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকে।
প্রথমে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। এরপর ২০২৪ সালে চার বছর পরপর পরিচালিত হয়ে আসা একটি গুরুত্বপূর্ণ টিকাদান কর্মসূচিও বড় ধরনের ব্যাঘাতের মুখে পড়ে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের নবজাতক ও শিশু বিশেষজ্ঞ আতিউল ইসলাম বলেন, ২০২১ ও ২০২২ সালে মহামারির সময় অনেক অভিভাবক সন্তানদের টিকা দিতে কেন্দ্রে নিয়ে যাননি।
তিনি বলেন, ‘এখন যেসব শিশুর বয়স ৪ বা ৫ বছর, তাদের অনেকেই টিকা পায়নি। এতে একটি বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও অনেক টিকাদান কেন্দ্রে টিকা পাওয়া যেত না।’
রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও ব্যাহত টিকাদান
বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বলছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকাদান কর্মসূচির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণে দেশে টিকার ঘাটতি তৈরি হয় এবং টিকাদানের কাভারেজও পিছিয়ে পড়ে।
২০২৪ সালের হাম টিকাদান কর্মসূচিও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যাহত হয়। ওই বছরের আগস্টে ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন। পরে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর সেই সরকারের কাছ থেকে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।
ভারতে নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনা হাম পরিস্থিতির জন্য ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারকে দায়ী করেছেন।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসক আতিউল ইসলাম বলেন, পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সংকট এখনো কাটেনি।
তার ভাষ্য, আক্রান্ত শিশুরা প্রায়ই হাসপাতালে আসে গুরুতর জটিলতা নিয়ে। তাদের অনেকের নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এমনকি এনসেফালাইটিস বা মস্তিষ্কে প্রদাহ দেখা দিচ্ছে।
ইসলাম বলেন, ‘গত ছয় মাস ধরে আমরা একটানা হাম আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি। আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।’
হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের হার দ্রুত বাড়ানো এবং বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা এখন বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র:এনবিসি নিউজ.কম
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au