রেমিট্যান্স নেবে সরকার, প্রবাসীদের মরদেহের দায় কেন নেবে না?
সৌদি আরবে দুই চ নাগরিক নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিথি আখতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা, প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে…
বাংলাদেশে বন্দি সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের প্রসঙ্গ তুলে বামেদের তীব্র আক্রমণ করলেন পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার রাজারহাট-গোপালপুরে একটি গণেশপুজোর উদ্বোধনে গিয়ে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে সরব হন তিনি। একই সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও স্বামী প্রণবানন্দের ভূমিকার কথা তুলে ধরে দাবি করেন, বাংলায় তাঁদের অবদানকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে আগের বাম ও তৃণমূল সরকার।
শুভেন্দুর বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছে সিপিএম। দলের নেতা কলতান দাশগুপ্ত চিন্ময়কৃষ্ণের সঙ্গে উমর খলিদ ও স্ট্যান স্বামীর প্রসঙ্গ টেনে বিজেপির ‘দ্বিচারিতা’র অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, দেশ বা সীমান্তের ঊর্ধ্বে উঠে বামপন্থীরা সব জায়গাতেই সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান করে।
২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে বাংলাদেশে জেলবন্দি রয়েছেন সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাস। সম্প্রতি তাঁর মা সন্ধ্যারানি ধরের মৃত্যু হয়। মায়ের শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার জন্য আদালতের নির্দেশে পাঁচ ঘণ্টার প্যারোলে মুক্তি পান তিনি। শেষকৃত্যে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ার ছবি প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সেই প্রসঙ্গেই শুভেন্দু বলেন, ‘‘ও পার বাংলার চিন্ময় প্রভুর চোখের জল গোটা পৃথিবীর সনাতনীদের হৃদয় নাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে।’’
এর পরেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও স্বামী প্রণবানন্দের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তাঁদের লড়াইয়ের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ না হলে এ রাজ্যের বাঙালি হিন্দুদের অবস্থাও আজ চিন্ময়কৃষ্ণের মতো হতে পারত।
শুভেন্দুর অভিযোগ, ‘‘বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড তৈরির দাবি আদায়ের জন্য শ্যামাপ্রসাদ, স্বামী প্রণবানন্দের যে লড়াই, ভূমিকা, তাকে এই রাজ্যে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিল বাম, তৃণমূল। সেই ঐতিহ্য, পরম্পরা ফিরিয়ে আনতে চাই।’’
বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়ে এর আগেও একাধিকবার সরব হয়েছেন শুভেন্দু। গত বছর ময়মনসিংহে দীপু দাস হত্যার পরও তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে জবাবদিহি এবং হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছিলেন।
শুভেন্দুর বক্তব্যের জবাবে সিপিএম নেতা কলতান দাশগুপ্ত বলেন, বামপন্থীরা সবসময়ই সংখ্যালঘুদের অধিকারের পক্ষে এবং সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান করে এসেছে।
তিনি বলেন, ‘‘সেটা বাংলাদেশ, ভারত বা প্যালেস্টাইন সর্বত্র।’’
এর পরেই বিজেপিকে নিশানা করে কলতানের দাবি, চিন্ময়কৃষ্ণকে যেভাবে দেশদ্রোহী তকমা দিয়ে বন্দি রাখা হয়েছে, ভারতে একইভাবে উমর খলিদকেও বন্দি রাখা হয়েছে। তাঁর কথায়, স্ট্যান স্বামীকেও একইভাবে জেলে রাখা হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত কারাগারেই তাঁর মৃত্যু হয়।
কলতানের অভিযোগ, ‘‘বিজেপির দ্বিচারিতা ক্রমশ প্রকট হচ্ছে মানুষের সামনে।’’
আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী স্ট্যান স্বামীকে ২০২০ সালে কোভিড মহামারির সময় জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) গ্রেফতার করে। তাঁর বিরুদ্ধে ইউএপিএ আইনে মামলা করা হয়েছিল। পারকিনসন্সে আক্রান্ত এই প্রবীণ সমাজকর্মীকে শেষ পর্যন্ত জামিন দেওয়া হয়নি। ২০২১ সালে বিচারাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে, দিল্লির হিংসা সংক্রান্ত মামলায় ২০২০ সাল থেকে জেলে রয়েছেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রনেতা উমর খলিদ। অসুস্থ মায়ের দেখভাল এবং পরিবারের একটি মৃত্যুর পর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি জামিন চেয়েছিলেন। সেই আবেদনও আদালতে মঞ্জুর হয়নি।
চিন্ময়কৃষ্ণকে নিয়ে শুভেন্দুর বক্তব্যের পর এই দুই ঘটনার প্রসঙ্গই সামনে এনেছে সিপিএম।
গণেশপুজোর মঞ্চ থেকে বামেদের বিরুদ্ধে আরও একাধিক অভিযোগ তোলেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, ৩৪ বছরের বাম শাসনে বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ‘‘৩৪ বছর আমাদের পঞ্জিকা, শাস্ত্র, ঐতিহ্য, পুরোহিত, আরতি, পুষ্পাঞ্জলি সব ভুলিয়ে দিয়েছিল লাল রাজত্ব।’’
পুজোর মণ্ডপের পাশে বামেদের বইয়ের স্টল নিয়েও কটাক্ষ করেন তিনি। শুভেন্দুর দাবি, সেখানে স্বামী বিবেকানন্দ, লোকেশ্বরানন্দ, ভারত সেবাশ্রম সংঘ কিংবা পশ্চিমবঙ্গ তৈরির ইতিহাসের বই পাওয়া যেত না, বরং মার্কসীয় সাহিত্যই প্রাধান্য পেত।
তৃণমূলকেও একইসঙ্গে আক্রমণ করে শুভেন্দু অভিযোগ করেন, বামেদের পর তৃণমূলের শাসনেও বাংলাকে ‘জামাতিকরণ’-এর চেষ্টা হয়েছে। দুর্গাপুজোর বিসর্জনের দিন পরিবর্তন নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
শুভেন্দু জানান, এ বছর পঞ্জিকা মেনেই পুজো ও বিসর্জন হবে। পিতৃপক্ষে পুজোর উদ্বোধন করা হবে না এবং অষ্টমীর দিন মদের দোকান বন্ধ রাখার কথাও বলেন তিনি।
শুভেন্দুর বক্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী। তাঁর কটাক্ষ, রবীন্দ্রনাথের শারদোৎসব থেকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহালয়ার ঐতিহ্যকেও শুভেন্দু অস্বীকার করছেন।
সুজন বলেন, ‘‘কেউ মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন বলেই তিনি ঠিক করতে পারেন না, কে কী বই পড়বে, কে কী খাবে।’’
পুজোর মণ্ডপের পাশে মার্কসীয় সাহিত্যের বইয়ের স্টল বসানো নিয়ে শুভেন্দুর সাম্প্রতিক মন্তব্যেরও বিরোধিতা করেছে সিপিএম। তাদের বক্তব্য, এত বছর যেভাবে দুর্গাপুজোর সময় বইয়ের স্টল বসেছে, এ বারও একইভাবে তা হবে।
ফলে চিন্ময়কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া রাজনৈতিক চাপানউতোর শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের ধর্ম, রাজনীতি, পুজোর সংস্কৃতি এবং বাম-বিজেপির পুরনো আদর্শগত সংঘাতের বিতর্কে গিয়ে পৌঁছেছে।
সূত্র:আনন্দবাজার.কম
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au