বিশ্ব

ট্রাম্পই হয়তো ব্রিকসের সবচেয়ে বড় ‘নিয়োগকর্তা’

  • 3:29 pm - September 13, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৬৫ বার
মাসুদ পেজেশকিয়ান, নরেন্দ্র মোদি ও ভ্লাদিমির পুতিন একসাথে হেঁটে যাচ্ছেন। ছবি : পিটিআই

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ব্রিকসের প্রতি বিরোধিতা প্রকাশ করে আসছেন। গত বছর তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, ব্রিকসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী নীতি অনুসরণ করা দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এরপর ব্রাজিল, ভারত ও চীনের মতো ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর বিরুদ্ধেও কঠোর শুল্কনীতি গ্রহণ করেছে তার প্রশাসন।

তবে ট্রাম্পের এই চাপের নীতি উল্টো ব্রিকসকে আরও সক্রিয় করে তুলতে পারে বলে মনে করছে আল জাজিরার একটি মতামতধর্মী বিশ্লেষণ। বিশ্লেষণটিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি তার বাজার, আর্থিক ব্যবস্থা ও ডলারের প্রভাবকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে, অন্য দেশগুলোর মধ্যে তত বেশি নিজেদের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার আগ্রহ তৈরি হবে। সেই অর্থে ট্রাম্পই হয়তো ব্রিকসের সবচেয়ে বড় ‘নিয়োগকর্তা’ হয়ে উঠছেন।

ব্রিকসকে অবশ্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট হিসেবে দেখা যায় না। বর্তমানে জোটটির ১১ সদস্য হলো ব্রাজিল, চীন, মিসর, ইথিওপিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, রাশিয়া, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষের বাস এসব দেশে এবং বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ৪০ শতাংশ তাদের দখলে থাকলেও তাদের অভিন্ন কোনো রাজনৈতিক আদর্শ, নিরাপত্তানীতি বা ভূরাজনৈতিক অবস্থান নেই।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতেও এই বিভাজন স্পষ্ট। ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। গত মে মাসে দিল্লিতে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ইরানি ও আমিরাতি প্রতিনিধিদের মধ্যে উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটে। আবার ভারত ও চীনের মধ্যে ২০২০-২১ সালে প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষ হয়েছিল। যদিও গত দুই বছরে দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়েছে।

তাই ট্রাম্পের নীতির কারণে ব্রিকস সদস্যরা ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ কোনো ভূরাজনৈতিক ফ্রন্ট তৈরি করছে, এমনটা বলা কঠিন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি কমানো এখন তাদের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি অভিন্ন কারণ হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বের অনেক দেশ আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে এমন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে। ফলে কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানকে মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার সীমিত করা কিংবা নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার একটি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব। এ কারণেই পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বিকল্প অর্থনৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থা তৈরির আগ্রহ বাড়ছে।

তবে ব্রিকস শিগগিরই ডলারের আধিপত্য শেষ করে দেবে, এমন কোনো প্রমাণ নেই। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বিশ্বের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের অংশ ছিল ৫৭ দশমিক ১ শতাংশ। বিপরীতে চীনা ইউয়ানের অংশ ছিল মাত্র ২ শতাংশ। অর্থাৎ ডলারকে সরিয়ে দেওয়া এবং ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো দুটি আলাদা বিষয়।

ব্রিকসের দেশগুলো মূলত দ্বিতীয় পথেই এগোচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকা চীনের আন্তঃসীমান্ত আন্তঃব্যাংক লেনদেন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে সরাসরি ইউয়ানে লেনদেন নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে। ব্রাজিল ও চীনও নিজেদের মুদ্রায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াচ্ছে। ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রুপি ও দিরহামে লেনদেন নিষ্পত্তি করেছে। একইভাবে চীন ও রাশিয়া দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বড় একটি অংশ নিজেদের জাতীয় মুদ্রায় সরিয়ে নিয়েছে।

ব্রিকসও সদস্য দেশগুলোর আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। গত বছর জোটের নেতারা আন্তঃসীমান্ত অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। গত আগস্টে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা জানান, ব্রিকস দেশগুলো নিজেদের দ্রুত অর্থ পরিশোধ নেটওয়ার্ক এবং সম্ভাব্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডিজিটাল মুদ্রা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা করছে।

এ ক্ষেত্রে ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ব্যাংকটি স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ দেওয়াকে কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছে। বর্তমান কৌশলে মোট অর্থায়নের ৩০ শতাংশ স্থানীয় মুদ্রায় দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ২০২৭ থেকে ২০৩১ সালের পরবর্তী মেয়াদে এই হার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে এসব উদ্যোগ এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ বিকল্প বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেনি। অনেক উদ্যোগই পরীক্ষামূলক, দ্বিপক্ষীয় কিংবা সীমিত পরিসরে রয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি হলো দেশগুলো ধীরে ধীরে এমন ব্যবস্থা তৈরি করছে, যার মাধ্যমে ডলার ও পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত আর্থিক অবকাঠামোর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করেও কিছু লেনদেন করা সম্ভব হবে।

ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি এই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত এগিয়ে দিতে পারে। উদাহরণ হিসেবে ব্রাজিলের কথা বলা হয়েছে। জুলাইয়ে ওয়াশিংটন ব্রাজিলের বিভিন্ন পণ্যের ওপর নতুন করে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। এতে কয়েকশ কোটি ডলারের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন ব্রাজিলের জনপ্রিয় তাৎক্ষণিক অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা ‘পিক্স’ নিয়েও নজরদারি বাড়িয়েছে। এই ব্যবস্থা প্রচলিত কার্ডভিত্তিক অর্থ পরিশোধ নেটওয়ার্কের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। পশ্চিমা আর্থিক নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার সীমিত হওয়ার কারণে রাশিয়া ও ইরান বিকল্প অর্থ পরিশোধ ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়েছে। এখন রুশ জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর বিরুদ্ধেও আরও পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে ওয়াশিংটন। এসব দেশের মধ্যে ভারত ও চীনও রয়েছে।

বিশ্লেষণটিতে বলা হয়েছে, ব্রিকসের সদস্যদের মস্কো বা তেহরানের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার প্রয়োজন নেই। তাদের জন্য বিষয়টি হলো, ভবিষ্যতে একই ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তাদের ওপরও প্রয়োগ হতে পারে কি না। সে কারণে নিজেদের বিকল্প ব্যবস্থা থাকা তাদের কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

তবে ব্রিকসের অধিকাংশ দেশই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীনের ওপর নির্ভরশীল হতে চায় না। ভারত যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেও রাশিয়ার জ্বালানি কিনছে এবং ব্রিকসের ভেতরে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। ব্রাজিলও দীর্ঘদিন ধরে বৃহত্তর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের চেষ্টা করছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত পশ্চিমা অর্থনীতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়াচ্ছে।

অর্থাৎ এসব দেশের লক্ষ্য সম্ভবত একটি আধিপত্যশীল শক্তিকে আরেকটি শক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়াসহ একাধিক শক্তিকেন্দ্রের মধ্যে নিজেদের অবস্থান আরও স্বাধীনভাবে নির্ধারণের সুযোগ তৈরি করাই তাদের উদ্দেশ্য।

একটি লেনদেন রুপিতে করা, কোনো ঋণ ইউয়ান বা র‌্যান্ডে নেওয়া কিংবা পশ্চিমা মধ্যস্থতাকারী ছাড়া অর্থ পরিশোধ করা, এসব পদক্ষেপ একা ডলারের আধিপত্য শেষ করবে না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এ ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা যত বাড়বে, ওয়াশিংটনের কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার অর্থনৈতিক খরচও তত কমতে পারে।

এই কারণেই ব্রিকসকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী হুমকি হিসেবে দেখার নীতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে বলে বিশ্লেষণটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করা দেশগুলোকে শাস্তি দিতে গিয়ে ওয়াশিংটন যদি আরও কঠোর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে, তাহলে সেই দেশগুলোর বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির প্রেরণাও বাড়তে পারে।

ফলে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা ব্যয়বহুল করতে চাইছেন, কিন্তু তার নীতিই হয়তো অন্য দেশগুলোর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। আর সেই পরিস্থিতিতে ব্রিকসের অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার উদ্যোগ আরও গতি পেতে পারে।

সূত্র : আল জাজিরা

এই শাখার আরও খবর

চুল কাটতে বেরিয়ে ৭ মাস পর এক পা হারিয়ে ফিরল রায়হান

মাত্র ১০০ টাকা নিয়ে চুল কাটতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১২ বছরের শিশু মোহাম্মদ রায়হান। এরপর কেটে যায় দীর্ঘ সাত মাস। অবশেষে গত ১৩ সেপ্টেম্বর…

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে রাশেদ খাঁনের নানা অভিযোগ

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও সাবেক সংসদ সদস্যদের ‘প্রটেকশন’ ও পুনর্বাসনের অভিযোগ তুলেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী (সচিব…

মোদিকে দ্রুত ইরান সফরের আমন্ত্রণ পেজেশকিয়ানের

ব্রিকস সম্মেলনে যোগদান শেষে নয়াদিল্লি ছেড়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তেহরানের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে শিগগিরই ইরান সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনি।…

জাভা সাগরে ফেরি উল্টে নিহত ৬, নিখোঁজ ১২৯

ইন্দোনেশিয়ার জাভা সাগরে ২৪৩ জন আরোহী নিয়ে ‘ভার্গো ট্রান্সপোর্ট ৮’ নামে একটি যাত্রীবাহী ফেরি উল্টে অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১২৯ যাত্রী। দুর্ঘটনার…

সুইডেনের নির্বাচনে বাম জোট সামান্য এগিয়ে

সুইডেনের সাধারণ নির্বাচনে এখনো কোনো পক্ষের জয় নিশ্চিত হয়নি। ভোট গণনা প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকলেও সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে সামাজিক গণতন্ত্রী দলের নেত্রী ম্যাগদালেনা আন্দেরসনের…

রুশ ড্রোন হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা ইউরোপীয় নেতারা

ইউক্রেনের পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে রুশ ড্রোন হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনসহ ইউরোপের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি। হামলার মাত্র কয়েক মিনিট…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au