এইচআইভি সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ফিজিতে জাতীয় জরুরি অবস্থা
ফিজিতে এইচআইভি সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার। নতুন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির প্রতি ৬০ জন প্রাপ্তবয়স্কের একজন এইচআইভি নিয়ে…
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট এখন আর শুধু রান্নার সমস্যা নয়। দিনের পর দিন গ্যাস না পেলেও অনেক পরিবারকে নিয়মিত মাসিক বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। পাশাপাশি রান্না, পানি গরম করা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে বৈদ্যুতিক চুলা, এলপিজি, রেস্টুরেন্টের খাবারসহ বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে গিয়ে বাড়ছে সংসারের খরচ।
ঢাকার ধানমন্ডি ৭/এ এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গত দুই মাস ধরে তাদের বাসায় গ্যাস সরবরাহ নেই। অথচ নিয়মিত তিতাস গ্যাসের বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।
লালবাগের গৃহিণী ফারিয়া আহমেদ বর্ষাও জানিয়েছেন একই অভিজ্ঞতার কথা। তার পরিবার গত তিন থেকে চার মাস ধরে প্রায় গ্যাস পাচ্ছে না। এরপরও প্রতি মাসে তিতাস গ্যাসকে ১ হাজার ৮০ টাকা করে বিল দিতে হচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এখন অনেক পরিবারের বাস্তবতা এমনই। গ্যাসের জন্য নিয়মিত বিল পরিশোধ করলেও প্রয়োজনের সময় সরবরাহ না থাকায় বাধ্য হয়ে বিকল্প ব্যবস্থায় রান্না করতে হচ্ছে তাদের।
তবে ঢাকায় ঠিক কতসংখ্যক আবাসিক গ্রাহক গ্যাস পাচ্ছেন না, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন তিতাস গ্যাসের কয়েকজন কর্মকর্তা।
গ্যাস সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরা, পল্লবী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, তালতলা, ধানমন্ডি, লালমাটিয়া, লালবাগ, শুক্রাবাদ ও ফার্মগেট এলাকার কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। তাদের অধিকাংশই জানিয়েছেন, গ্যাস সংকটে রান্নাবান্নার স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প ব্যবস্থায় বাড়তি অর্থ খরচ হলেও মাস শেষে গ্যাসের বিল ঠিকই দিতে হচ্ছে।
লালবাগের বাসিন্দা ফারিয়া আহমেদ বর্ষা বলেন, মাঝে মাঝে রাতে গ্যাস এলেও চাপ এত কম থাকে যে রান্না করা সম্ভব হয় না।গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় তার পরিবার প্রায় ৪ হাজার টাকা দিয়ে একটি বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছে। এর ফলে বেড়েছে বিদ্যুৎ বিলও।
তিনি বলেন, আগে তাদের মাসিক বিদ্যুৎ বিল গড়ে ২ হাজার টাকা থাকত। বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহারের পর তা বেড়ে প্রায় ৪ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে।
প্রিপেইড বিদ্যুৎ সংযোগে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের খরচ হয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা।
ফারিয়া বলেন, বিষয়টি শুধু বাড়তি খরচের নয়। বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করা খাবারের স্বাদও আগের মতো হয় না। রান্না করতেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না তারা।
তার স্বামী মো. রবিন বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে তাদের সংসারের মাসিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তিনি বলেন, বেতন প্রতি মাসে বাড়ে না। অথচ গ্যাস সংকটের কারণে প্রতি মাসে অতিরিক্ত ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে।তার ভাষ্য, প্রায় চার মাস আগে মাঝে মাঝে সন্ধ্যার দিকে, বিশেষ করে শুক্রবার, কিছুটা গ্যাস পাওয়া যেত। এখন সেই সামান্য সরবরাহও অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।
লালবাগের আরেক বাসিন্দা গৃহিণী ফাহমিদা ইয়াসমিন জানান, কয়েক মাস ধরে তাদের পরিবারও একই সমস্যায় ভুগছে।
তিনি বলেন, ঈদুল আজহার পর থেকে কখন গ্যাস আসে আর কখন চলে যায়, তার কোনো ঠিক নেই। মাসের পর মাস গ্যাসে ঠিকমতো রান্না করা যাচ্ছে না।
বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করায় তাদের মাসিক খরচ প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা বেড়েছে।
গ্যাস সংকটে ছোট শিশু রয়েছে এমন পরিবারগুলো আরও বেশি সমস্যায় পড়ছে। পানি গরম করা, শিশুর খাবার গরম রাখা কিংবা দুধ প্রস্তুত করার মতো দৈনন্দিন কাজেও তাদের বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।
রাজধানীর অন্যান্য এলাকার ভাড়াটেরাও একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
মোহাম্মদপুরের জাকির হোসেন রোডের একটি ভাড়া বাসায় থাকা কামাল পাশা বলেন, পরিস্থিতি এতটাই কঠিন হয়ে পড়েছে যে তিনি বাসা পরিবর্তনের কথাও ভাবছেন।গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তার পরিবার ভোরে উঠে রান্না করে। অন্য সময় বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভর করতে হয়।
গ্যাসের চুলা নিয়মিত ব্যবহার করতে না পারলেও বাড়িওয়ালাকে প্রতি মাসে ভাড়ার সঙ্গে গ্যাসের বিল হিসেবে ১ হাজার ৮০ টাকা দিতে হচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ প্রায় থাকেই না। ফলে অনেক পরিবারকে গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে রান্না করতে হচ্ছে।
শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকরিজীবী তপু চন্দ্র দাস বলেন, কয়েক মাস ধরে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ নেই। কখনো কখনো বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে।
তিনি জানান, কোনো কোনো দিন রাত ২টার পর গ্যাস আসে এবং ভোর ৫টা পর্যন্ত থাকে।
তপু বলেন, অফিস থাকলে তিনি রাতে জেগে পাঁচ-ছয় দিনের খাবার একসঙ্গে রান্না করে রাখেন। পরে শুধু হোটেল থেকে ভাত কিনে খেতে হয়।
তবে এই ব্যবস্থাও এখন ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। তার ভাষ্য, আগে অনেক হোটেলে শুধু ভাত আলাদাভাবে কেনা যেত। এখন অনেক হোটেল ভাতের সঙ্গে তরকারি কিনতেও বাধ্য করছে।
তিনি বলেন, গ্যাস সংকট শুরুর পর কয়েকটি হোটেলে তরকারির দামও বেড়েছে। আগে ২০ টাকার তরকারি এখন ৩০ টাকা এবং ৪০ টাকার তরকারি ৬০ টাকা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাম না বাড়িয়ে খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মিরপুর-১১ এলাকার ব্যাচেলর বাসিন্দা শিমুল হোসেন বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে তাদের খাবার পানির ব্যবস্থাপনাতেও সমস্যা হচ্ছে।
তিনি জানান, আগে পানি ফুটিয়ে পান করতেন তারা। কিন্তু গ্যাস না থাকায় এখন অনেক সময় বাইরে থেকে পানি কিনতে হচ্ছে।
শিমুল বলেন, তারা এখন রাইস কুকারে পানি গরম করেন। তবে এটিও সব সময় সুবিধাজনক নয়।
কয়েকটি পরিবার জানিয়েছে, গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করলেও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সেই ব্যবস্থাও নির্ভরযোগ্য নয়। রান্নার মাঝখানে বিদ্যুৎ চলে গেলে আবার অপেক্ষা করতে হয়।
কেউ কেউ এলপিজি চুলা কিংবা মাটির চুলাও ব্যবহার করছেন।
আবাসিক পর্যায়ের এই সংকটের পেছনে রয়েছে দেশের সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে উদ্ধৃত পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে সরবরাহ সাধারণত ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুটের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে এলএনজি থেকে প্রায় ৯৯ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট এবং দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রায় ১৬২ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়।
গত ২১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জির মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। এতে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয় বলে সে সময়ের প্রতিবেদনে জানানো হয়।
পরে আংশিকভাবে সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও ওই ঘটনার প্রভাব আবাসিক গ্রাহকের পাশাপাশি শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতেও পড়ে।
তিতাস জানিয়েছে, এলএনজি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিতরণ নেটওয়ার্কে গ্যাসের চাপ খুব কম থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের গ্যাস সংকটের তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই। তবে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো গেলে সংকট কিছুটা কমানো সম্ভব।
গ্যাসের ঘাটতির কারণে বস্ত্র, নিট পোশাক, ডাইং ও ফিনিশিংসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে, আবার কিছু কারখানা সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, গ্রাহকরা যে সেবার জন্য অর্থ দিচ্ছেন, তা না পেলে তাদের কাছ থেকে পুরো বিল নেওয়া উচিত নয়।
তিনি বলেন, সরকার নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু সেই সেবা দেওয়া হচ্ছে না। তাহলে পুরো বিল কেন নেওয়া হবে?
নাজের হোসাইনের মতে, নির্দিষ্ট মাসিক আয়ের মানুষের জন্য বাড়তি এই ব্যয় বিশেষভাবে চাপ তৈরি করছে। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। তবে তিনি এমন কোনো পরিকল্পনা দেখতে পাচ্ছেন না বলে মন্তব্য করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সংকট দেখা দিলে মূল সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে অনেক সময় সরকার পরিকল্পনাহীনভাবে দাম বাড়ানোর পথে যায়।
গ্যাস না পেলেও মাসের পর মাস বিল পরিশোধ করা পরিবারগুলোর বিল মওকুফ বা কমানোর কোনো সুযোগ আছে কি না, জানতে চাইলে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ বলেন, বিদ্যমান বিলিং নীতিমালার কারণে এ ধরনের বিল মওকুফ বা কমানোর এখতিয়ার তাদের নেই।
তিনি বলেন, গ্রাহকদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার বিষয়ে তিতাসের আগ্রহ থাকলেও বিদ্যমান নীতিমালার কারণে গ্যাস বিল মওকুফ বা কমানোর সুযোগ নেই।
ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যা এড়াতে সব গ্রাহকের জন্য প্রিপেইড গ্যাস মিটার স্থাপন গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শাহনেওয়াজ পারভেজ বলেন, সব গ্রাহকের জন্য প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা গেলে এ ধরনের সমস্যা আর থাকবে না।
তিতাস কয়েক বছর আগে প্রিপেইড গ্যাস মিটার স্থাপনের কাজ শুরু করলেও এখনো সব গ্রাহকের জন্য তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
আবাসিক এলাকায় চলমান গ্যাস সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ কমে যাওয়ায় তিতাসের বরাদ্দও কমেছে। ফলে আবাসিক গ্রাহকদের পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, গ্যাস বিতরণের ক্ষেত্রে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এরপর আবাসিক গ্রাহকদের সরবরাহ দেওয়া হয়।
তার ভাষায়, সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহ না বাড়ানো পর্যন্ত আবাসিক পর্যায়ের সংকট পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au