প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ভারতে যা যা ঘটছে
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী দলগুলোর বিক্ষোভ সমাবেশে অভিযান চালিয়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীসহ বেশ কয়েকজন বিরোধী আইনপ্রণেতাকে আটক করেছে দিল্লি…
৬০টি দেশের প্রতিরক্ষা খাতের শীর্ষ নির্বাহী, প্রায় এক হাজার প্রদর্শনকারী প্রতিষ্ঠান, ১০ দিনের জন্য পুলিশের অতিরিক্ত ক্ষমতা এবং নিরাপত্তায় ১ কোটি ১৫ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলারের অতিরিক্ত বরাদ্দ। এসব আয়োজন নিয়েই আজ পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার (ডব্লিউএ) পার্থে প্রথমবারের মতো শুরু হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার বৃহৎ প্রতিরক্ষা প্রদর্শনী ‘ল্যান্ড ফোর্সেস’।
প্রতিরক্ষা শিল্পের এই সম্মেলন ও বাণিজ্য প্রদর্শনীতে সর্বাধুনিক স্থল প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার এবং এই খাতের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়েছে।
তবে প্রদর্শনীতে যেসব অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি প্রদর্শিত হবে, তার প্রতিবাদে বিভিন্ন সংগঠন কর্মসূচি নেওয়ায় পুরো আয়োজন ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া সরকার আশঙ্কা করছে, ২০২৪ সালে মেলবোর্নে ল্যান্ড ফোর্সেস প্রদর্শনীকে ঘিরে যে ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল, পার্থে যেন তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
এর মধ্যেই সামনে এসেছে একটি প্রশ্ন: এই প্রদর্শনী আসলে কার জন্য এবং এতে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার ভূমিকা কী?
কী এই ‘ল্যান্ড ফোর্সেস’?
ল্যান্ড ফোর্সেস অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি দুই বছর পরপর অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা শিল্প প্রদর্শনী। এবারের আয়োজন প্রথমবারের মতো পার্থে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পুলিশমন্ত্রী রিস হুইটবি গত সপ্তাহে বলেন, ‘কৌশলগত, বাণিজ্যিক এবং আরও অনেক কারণে এটি পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন।’
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া সরকার এই প্রদর্শনীকে আন্তর্জাতিক পরিসরের একটি বড় সম্মেলন হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে রাজ্যটি যখন নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে, তখন এ ধরনের আন্তর্জাতিক আয়োজনকে বিনিয়োগ আকর্ষণের একটি বড় সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রদর্শনী উপলক্ষে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল, ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রতিনিধিরা পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার হেন্ডারসন এলাকা পরিদর্শন করবেন। হেন্ডারসন অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোট ‘অকাস’ (AUKUS)-এর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
প্রতিনিধিরা নীরাবাপের অস্ট্রেলিয়ান অটোমেশন অ্যান্ড রোবোটিকস প্রিসিঙ্কটও পরিদর্শন করবেন।
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া সরকারের আশা, এই প্রতিরক্ষা শিল্প সফর ও প্রদর্শনী রাজ্যটিতে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ বাড়াতে, অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনতে এবং স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।
অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে প্রশ্ন
প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা থাকলেও প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এমন প্রযুক্তি তৈরি করে, যার মধ্যে ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধব্যবস্থা রয়েছে। এসব স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধব্যবস্থা বড় পরিসরে একযোগে কাজ করতে সক্ষম এবং অনেক ক্ষেত্রে দলবদ্ধভাবে বা ‘সোয়র্ম’ পদ্ধতিতে পরিচালনার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার প্রিমিয়ার ও প্রতিরক্ষা শিল্পমন্ত্রী রজার কুক রোববার বলেন, প্রতিরক্ষা শিল্প রাজ্যটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার ক্ষেত্র।
তিনি বলেন, ‘আমরা এই বাস্তবতা উপেক্ষা করতে পারি না বা বালিতে মাথা গুঁজে রাখতে পারি না যে আমরা ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত একটি অঞ্চলে বসবাস করি।’
পুলিশমন্ত্রী রিস হুইটবিও প্রদর্শনীটির গুরুত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, এটি পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার ‘কৌশলগত নিরাপত্তার’ সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সেই কারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রদর্শনীর অর্থায়ন নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন
ল্যান্ড ফোর্সেস প্রদর্শনীতে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার উভয়েই অর্থায়ন করছে। তবে এই আয়োজনের পেছনে সরকারি অর্থের পরিমাণ কত, তা প্রকাশ করা হয়নি।
আয়োজকেরা প্রদর্শনী আয়োজনের মোট ব্যয় জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া সরকারও নিজেদের দেওয়া অর্থের পরিমাণ জানাতে গিয়ে ‘বাণিজ্যিকভাবে গোপনীয়’ তথ্যের বিষয়টি উল্লেখ করেছে।
ফলে সরকারি অর্থে আয়োজিত একটি বড় আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীতে করদাতাদের কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের বক্তব্য, অর্থটি যেহেতু শেষ পর্যন্ত করদাতাদের কাছ থেকেই আসে, তাই সেই অর্থের পরিমাণ জানার অধিকারও জনগণের থাকা উচিত।
নিরাপত্তায় অতিরিক্ত ১ কোটি ১৫ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার
ল্যান্ড ফোর্সেসকে কেন্দ্র করে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশমন্ত্রী রিস হুইটবি এটিকে রাজ্যের ইতিহাসে পুলিশের ‘সবচেয়ে বড় অভিযান’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তাঁর দাবি, ২০১১ সালে কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের বৈঠক বা চোগাম (CHOGM) উপলক্ষে ব্রিটিশ রানি এলিজাবেথের সফরের সময় যে মাত্রার পুলিশি তৎপরতা হয়েছিল, এবারের অভিযান তার চেয়েও বড়।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে অতিরিক্ত ১ কোটি ১৫ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন আইনের আওতায় পুলিশকে সাময়িকভাবে অতিরিক্ত কিছু ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
এই ক্ষমতার আওতায় ল্যান্ড ফোর্সেস প্রদর্শনী এবং পার্থ কনভেনশন অ্যান্ড এক্সিবিশন সেন্টারের বাইরে নির্ধারিত নিরাপত্তা এলাকায় নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে।
তবে নিষেধাজ্ঞা পাওয়া ব্যক্তিরা নিরাপত্তা এলাকার বাইরে থেকে প্রতিবাদ করতে পারবেন।
এই নিষেধাজ্ঞা জারির পর থেকেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
আদালতে অভিযোগ, সীমিত সময়ের জন্য প্রবেশের অনুমতি
ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ান গ্রিনস দলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপক মাতিল্ডা লেন-রোজ আইনজীবীর মাধ্যমে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার সুপ্রিম কোর্টে অভিযোগ করেন।
এরপর মঙ্গলবার তাঁকে অল্প সময়ের জন্য প্রদর্শনীর এলাকায় প্রবেশ করে ভিডিও ধারণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
লেন-রোজ বলেন, ‘আমি শুধু যেখানে বাস করি এবং যেখানে কাজ করি, সেই শহরের ভেতর স্বাধীনভাবে চলাচল করতে চাই। আমাকে সেটি করতে দেওয়ার দিকে এটি একটি পদক্ষেপ।’
পুলিশ জানিয়েছে, এ ধরনের অভিযোগ পাওয়ার পর পরিস্থিতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং প্রয়োজন হলে তাঁদের প্রবেশাধিকার সীমিত বা কমিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
মেলবোর্নের মতো পরিস্থিতি চায় না সরকার
২০২৪ সালে মেলবোর্নে ল্যান্ড ফোর্সেস প্রদর্শনীকে ঘিরে ব্যাপক বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে প্রতিবাদকারীদের সংঘর্ষ হয়েছিল। এবারের পার্থ আয়োজনের ক্ষেত্রে সেই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে মরিয়া পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া সরকার।
প্রিমিয়ার রজার কুক বলেন, ভিক্টোরিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে তাঁরা জানেন যে ল্যান্ড ফোর্সেস সম্মেলনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে চান এমন মানুষ থাকবেন। তবে একটি গণতান্ত্রিক দেশে প্রতিবাদের অধিকারকে তিনি সম্মান করেন বলেও জানান।
তিনি বলেন, ‘তাঁদের প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে। তবে তাঁদের শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনকভাবে এবং রাজ্যের আইন মেনে প্রতিবাদ করতে হবে।’
তবে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ান গ্রিনসের আইনসভার সদস্য সোফি ম্যাকনিল মনে করেন, পূর্ব উপকূলের তুলনায় পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার প্রতিবাদের পরিবেশ ভিন্ন।
তিনি বলেন, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সংস্কৃতি রয়েছে। তাই পুলিশের জন্য ১ কোটি ১৫ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার ব্যয় করে নতুন সরঞ্জাম কেনার প্রয়োজন নেই।
প্রতিবাদকারীরাও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির কথা বলছেন
প্রতিবাদ আয়োজকদের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, তাঁরা শান্তিপূর্ণ ও অহিংস কর্মসূচি চান।
আয়োজিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে ইয়াগান স্কয়ার থেকে এলিজাবেথ কেয়ের দিকে একটি প্রতিবাদ মিছিল করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া অ্যান্টি-ওয়ার কালেক্টিভের স্যাম ওয়েইনরাইট বলেন, প্রতিবাদকারীদের পক্ষ থেকে সহিংসতা হতে পারে এমন ধারণা আসলে একটি ‘ধোঁয়াশা তৈরির কৌশল’।
তিনি বলেন, ‘প্রতিবাদকারীদের পক্ষ থেকে সহিংসতা হতে পারে, এমন ধারণা আসলে একটি ধোঁয়াশা তৈরির কৌশল। মূল সমস্যা হচ্ছে সেখানে যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান প্রদর্শনী করবে, তাঁদের কার্যক্রম।’
ল্যান্ড ফোর্সেস শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ পুরো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। একই সঙ্গে করদাতারাও নজর রাখবেন, এই বিশাল আয়োজন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সরকারি অর্থের ব্যবহার কতটা যৌক্তিক এবং প্রদর্শনীতে দেখানো সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে প্রতিবাদ করা কতটা প্রয়োজনীয়।
একদিকে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া সরকার এটিকে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রতিরক্ষা শিল্প সম্প্রসারণের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে শান্তিকামী ও যুদ্ধবিরোধী সংগঠনগুলো প্রশ্ন তুলছে, অস্ত্র ও যুদ্ধপ্রযুক্তির এমন প্রদর্শনী আয়োজন এবং এর নিরাপত্তায় বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় করা আদৌ জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
সূত্রঃ এবিসি নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au