বিশ্ব

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ভারতে যা যা ঘটছে

  • 5:45 am - October 07, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৬৫ বার
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ভারতে বিক্ষোভ। ছবিঃ রয়টার্স

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী দলগুলোর বিক্ষোভ সমাবেশে অভিযান চালিয়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীসহ বেশ কয়েকজন বিরোধী আইনপ্রণেতাকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে ক্ষমতাসীন দলের সুবিধার্থে ভোটার তালিকায় পরিবর্তন আনার অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার দিল্লিতে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।

পুলিশ সন্ধ্যার দিকে বিক্ষোভস্থলে অভিযান চালিয়ে কয়েকজন আইনপ্রণেতাকে গাড়িতে তুলে নেয়। পরে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আটক রাহুল গান্ধী, তাঁর বোন ও কংগ্রেসের এমপি প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রাসহ অন্যদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, শান্তি বজায় রাখা ও জননিরাপত্তার স্বার্থে আইন অনুযায়ী তাঁদের আটক করা হয়েছিল।

মঙ্গলবার সকালে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কয়েক ডজন আইনপ্রণেতা ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) সদর দপ্তরের দিকে মিছিল করেন। পরে তাঁরা নির্বাচন কমিশনের পাশের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের কার্যালয় চত্বরে একটি গাছের নিচে সাদা গদি বিছিয়ে অবস্থান নেন। সেখানেই তাঁরা নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দেন এবং কমিশনের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের দাবি জানান।

রাহুল গান্ধী বলেন, শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনারদের তাঁদের সঙ্গে দেখা করতেই হবে। তাঁর ভাষ্য, তাঁরা শুধু নির্বাচন কমিশনারদের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করতে চান এবং তাঁদের বলতে চান যে ভোট চুরি করা হয়েছে। অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে তিনি বলেন, প্রয়োজন যতক্ষণ হবে, তাঁরা ততক্ষণ সেখানে বসে থাকবেন।

ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ

কংগ্রেসসহ ভারতের বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এমন পরিবর্তন করা হয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপিকে সুবিধা দিচ্ছে।

গত মাসে ভারতীয় সংবাদপত্র ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের ভেতরে ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়ে মতপার্থক্যের কথা তুলে ধরা হয়।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে উদ্বেগ আরও বাড়ে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার নরেন্দ্র মোদি সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হওয়ায় বিরোধীরা তাঁর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

তবে নির্বাচন কমিশন এবং ক্ষমতাসীন বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিজেপির মুখপাত্র সুধাংশু ত্রিবেদী অভিযোগ করেন, কংগ্রেসের আইনপ্রণেতারা নির্বাচন কমিশন নিয়ে ভিত্তিহীন দাবি তুলে দেশকে বিভ্রান্ত করছেন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার নিজে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।

নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে টানাপোড়েন

বিক্ষোভ চলাকালে রাহুল গান্ধী বলেন, বিরোধী আইনপ্রণেতারা নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে চান। তাঁদের অভিযোগ ও প্রশ্ন সরাসরি কমিশনের কাছে তুলে ধরাই তাঁদের উদ্দেশ্য বলে জানান তিনি।

পরে নির্বাচন কমিশন জানায়, মঙ্গলবার দিনের শেষ দিকে বিরোধী আইনপ্রণেতাদের পক্ষ থেকে বৈঠকের অনুরোধ তারা পেয়েছে। তবে আইনপ্রণেতারা যে স্থানে বৈঠক করতে চেয়েছিলেন, সেটি নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত প্রোটোকলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না বলে কমিশন জানায়।

কমিশনের পক্ষ থেকে একজন কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও বিরোধী আইনপ্রণেতারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে বৈঠক নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়।

দিল্লিতে মিছিল, ব্যারিকেডে রাহুল-প্রিয়াঙ্কা

মঙ্গলবার সংসদ ভবন এলাকা থেকে নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরের দিকে মিছিল বের করেন বিরোধী আইনপ্রণেতারা। প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই মিছিলে তাঁরা প্ল্যাকার্ড বহন করেন, ভারতের জাতীয় পতাকা ওড়ান এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন।

কয়েকটি প্ল্যাকার্ডে কুমারকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি বিজেপির বিরুদ্ধে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়।

নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের কাছে পৌঁছে বিক্ষোভকারীরা সড়কে বসে পড়েন এবং জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দেখা করার দাবি জানান। রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রাসহ কয়েকজন পুলিশ ব্যারিকেডের ওপর দাঁড়িয়ে জাতীয় পতাকা ওড়ান এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করেন।

এ সময় বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়। তাঁদের কয়েকজন দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম পরেছিলেন এবং হাতে লাঠি ছিল। নিরাপত্তাকর্মীরা রাহুল গান্ধীসহ অন্য আইনপ্রণেতাদের নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের দিকে এগোতে বাধা দেন।

রাহুল গান্ধীর দাবি, প্রায় ৩০০ জন আইনপ্রণেতা এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।

‘সরকারের হাতের পুতুল’ নির্বাচন কমিশন: খাড়গে

মিছিল শুরুর সময় কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ তোলেন।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন সরকারের হাতে একটি ‘পুতুলে’ পরিণত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, কংগ্রেস ও বিরোধী দলগুলো গণতন্ত্র রক্ষার জন্য লড়াই করছে।

অন্যদিকে বিজেপি এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির নেতারা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরির অভিযোগ করেছেন।

ধারাবাহিক বিক্ষোভের অংশ

মঙ্গলবারের বিক্ষোভ ও আটকের ঘটনা গত কয়েক দিনের ধারাবাহিক আন্দোলনের সর্বশেষ পর্ব। গত সপ্তাহ থেকে ভারতের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র সংগঠন, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং ‘ককরোচ’ যুব আন্দোলনের সদস্যরা ভোটার তালিকা সংশোধন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করে আসছেন।

এর আগে দিল্লি ও মুম্বাইয়েও একই দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে। কিছু কর্মসূচিতে পুলিশ ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা এবং বিক্ষোভকারীদের আটকের ঘটনাও ঘটেছে।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, গত বছর শুরু হওয়া দেশব্যাপী ভোটার যাচাই ও তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়েছে এবং এর ফলে ক্ষমতাসীন বিজেপি সুবিধা পেতে পারে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য হলো ভোটার তালিকা থেকে একই ব্যক্তির একাধিক নাম, মৃত ব্যক্তি এবং অযোগ্য ভোটারের নাম বাদ দেওয়া এবং নির্বাচনী তালিকার নির্ভুলতা নিশ্চিত করা।

নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি কর্মকর্তাদের যোগ্য কিন্তু ভুলবশত বাদ পড়া ভোটারদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশও দিয়েছে।

মোদি সরকারের জন্য রাজনৈতিক চাপ

বিরোধীদের এই আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তৃতীয় মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। এর কয়েক মাস আগেও পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের মুখে মোদি সরকারের শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেছিলেন।

সাম্প্রতিক ভোটার তালিকা সংশোধনকে ঘিরে বিরোধীদের আন্দোলন তাই শুধু নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে একটি কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি ভারতের নির্বাচনব্যবস্থা, ভোটার তালিকার নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়েও বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে।

তবে ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়ম বা ক্ষমতাসীন দলকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ এখনো বিরোধী দলগুলোর দাবি হিসেবেই রয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সূত্রঃ রয়টার্স

এই শাখার আরও খবর

মোদির পর সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক, বাংলাদেশ নিয়ে কী বার্তা দিলেন ত্রিবেদী?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরাজ শেঠের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। একই দিনে…

পার্থে ‘ল্যান্ড ফোর্সেস’: অস্ট্রেলিয়ায় বিশাল প্রতিরক্ষা প্রদর্শনী, বাইরে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ

৬০টি দেশের প্রতিরক্ষা খাতের শীর্ষ নির্বাহী, প্রায় এক হাজার প্রদর্শনকারী প্রতিষ্ঠান, ১০ দিনের জন্য পুলিশের অতিরিক্ত ক্ষমতা এবং নিরাপত্তায় ১ কোটি ১৫ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলারের…

বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের অসম্পূর্ণ ভাস্কর্যে জুতার মালা, গ্রেফতার ১

ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় মহাসড়কের দ্বীপে নির্মাণাধীন বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের অসম্পূর্ণ ভাস্কর্যে জুতার মালা ঝুলিয়ে দেওয়ার অভিযোগে আব্দুর রহমান সম্রাট নামে এক ব্যক্তিকে…

‘কালোজাদু’র অপবাদে তিন নারীকে জুতার মালা পরিয়ে ঘোরানোর অভিযোগ

নাটোরের গুরুদাসপুরে ‘কুফরি কালাম’ বা কালোজাদু করার অপবাদ দিয়ে তিন নারীকে বাড়ি থেকে ডেকে এনে মারধর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের গলায় জুতার মালা…

দিল্লিতে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী আটক

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বিরোধী জোটের দীর্ঘ প্রায় ৯ ঘণ্টার বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচির পর কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী…

‘আপামর ছাত্রজনতা’র ব্যানারে উপাচার্যকে হেনস্তা, জোর করে পদত্যাগপত্রে সই নেওয়ার অভিযোগ

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক জাওয়াদুল হককে ঘেরাও করে কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল তাঁর…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au