মাদকসামগ্রী। ছবি : সংগৃহীত
কুমিল্লার সীমান্ত দিয়ে দেদারছে ঢুকছে মাদক। পরে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। জেলার ১৮টি থানায় অন্তত ২০০টি হটস্পটে চলছে মাদক কেনাবেচা। সীমান্তের অর্ধশতাধিক পথ ব্যবহৃত হচ্ছে মাদক প্রবেশের রুট হিসেবে। অভিযান, গ্রেপ্তার ও মামলা চললেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না কারবার। জামিনে বেরিয়ে আবারও মাদক ব্যবসায় জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত এক হাজার ৭৭৩ জন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিজিবি চিহ্নিত করেছে মাদক চোরাচালানের ১২টি হটস্পট।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কও মাদক পরিবহনের অন্যতম রুট। সম্প্রতি এ মহাসড়কে একটি ল্যান্ডক্রুজার প্রাডো গাড়ি থেকে তিন লাখ ইয়াবা জব্দ করে পুলিশ। এসব ইয়াবার আনুমানিক মূল্য ১৫ কোটি টাকা।
সীমান্তের পথে মাদকের চালান
বিজিবির দাবি, ব্রাহ্মণপাড়ার আশাবাড়ি থেকে সালদা পর্যন্ত সীমান্তের কিছু অংশে কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় মাদক ও চোরাচালানের পণ্য প্রবেশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ব্রাহ্মণপাড়া ও বুড়িচংয়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকাল ট্রেনে মাদকের চালান শশীদল রেলস্টেশনে আসে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সন্ধ্যার পর শশীদল স্টেশনে শতাধিক ব্যক্তি কুলির বেশে ট্রেন থেকে সাদা বস্তা নামান। স্থানীয়দের দাবি, এসব বস্তায় মাদক ও চোরাচালানের পণ্য থাকে। পরে বিভিন্ন পরিবহনে সেগুলো দেশের নানা এলাকায় পাঠানো হয়।
বিজিবি চিহ্নিত ১২টি হটস্পটের মধ্যে রয়েছে ব্রাহ্মণপাড়ার আশাবাড়ি ও তেতাভূমি, বুড়িচংয়ের ছয়গ্রাম, চড়ানল, ভাল্লক, বাঁশতলী ও নারায়ণপুর, চৌদ্দগ্রামের আমানগণ্ডা, সদর উপজেলার গোলাবাড়ি ও নিশ্চিন্তপুর এবং সদর দক্ষিণের রাজেশপুর, যশপুর ও সূর্যনগর।
জামিনে ফিরে ফের কারবারের অভিযোগ
অনুসন্ধানে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে সাতজনের নাম পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন বাগরা গ্রামের ‘মুরগি হেলাল’, শশীদল গ্রামের রবি হোসেন ও রহুল আমিন এবং গঙ্গানগর গ্রামের ওয়াসিম, আনোয়ার, দেলোয়ার ও উজ্জ্বল মিয়া।
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় গড়ে ২০ থেকে ২৫টি মামলা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের মাধ্যমে ভারত থেকে আসা মাদক পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। ঢাকার অভিজাত এলাকার বারগুলোতে বিদেশি মদ সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অনেক মাদক কারবারি গ্রেপ্তারের দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আবার একই কাজে জড়াচ্ছেন। গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে জেলার ১৮টি থানায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত দুই হাজার ৬৪৭ জন কিশোরকে আটকের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মাদক কারবার বা সেবনে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
উদ্বেগ বাড়াচ্ছে অপরাধের বিস্তার
সদর উপজেলার গোলাবাড়ি সীমান্তে মাদক কারবারের বিস্তার নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর সেখানে বিপুলসংখ্যক মোটরসাইকেল নিয়ে কারবারিরা চলাচল করেন। কয়েক বছরে তাঁদের হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকেরাও। মাদকের অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. মোসলেহ উদ্দিন বলেন, মাদক কারবারিরা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছেন। সীমান্তে মাদক সরবরাহের ব্যবস্থাও গড়ে উঠেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্ত এলাকায় সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
বিজিবি কুমিল্লা সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল রকিবুল হাসান বলেন, সীমান্তে চোরাচালান ও অপরাধ দমনে বিজিবি তৎপর। কাঁটাতারের বেড়া নেই, এমন এলাকায় কারবারিদের আনাগোনা বেশি। বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে অনেকে পণ্য ফেলে পালিয়ে যান। মাদক বন্ধে প্রশাসন ও স্থানীয়দের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় কুমিল্লায় মাদকের বিস্তার বেশি। মাদক উদ্ধার ও কারবারিদের গ্রেপ্তারে জেলা পুলিশ সারা দেশে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। মাদকের মূল হোতাদের শনাক্ত করে প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। মাদক নির্মূলে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে।