বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে মজুরি নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ বারবার ফিরে আসছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বকেয়া বেতন, ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নে অসংগতি এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় পর্যাপ্ত মূল্য না পাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। শ্রমিকেরা ন্যায্য মজুরি চাইছেন, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার চাপের কথা তুলে ধরে মজুরি বাড়ানোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ জানাচ্ছেন কারখানার মালিকেরা।
গত ১৭ অক্টোবর ঢাকার উত্তরায় মাসিক ৩০ হাজার টাকা মজুরি এবং বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ৫০ জন আহত হন, যাঁদের মধ্যে ১৮ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। এর আগে ১৫ অক্টোবর উত্তরার আজমপুর এলাকায় মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে সড়ক অবরোধ করেন পোশাকশ্রমিকেরা।
শ্রমিকদের প্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক শ্রমিক মাসে ১৯ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করতে দিনে ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেন, যার মধ্যে অতিরিক্ত সময়ের কাজও রয়েছে। এত দীর্ঘ সময় কাজ করেও তাঁদের পক্ষে বাড়িভাড়া, খাবার, সন্তানের শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। কয়েক বছর আগে যে বাসার ভাড়া ছিল আড়াই হাজার টাকা, তা এখন বেড়ে প্রায় সাড়ে সাত হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন একজন শ্রমিক প্রতিনিধি।
বিক্ষোভকারী শ্রমিক শরিফা বেগম বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমাতে হবে, অথবা মজুরি বাড়াতে হবে, যাতে শ্রমিকেরা তাঁদের সংসারের খরচ চালাতে পারেন।
২০২৩ সালের নভেম্বরে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে উত্তরায় আন্দোলনরত শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার দাবি মূল বেতনের ভিত্তিতে করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই ন্যূনতম মোট মজুরি ও শ্রমিকদের বর্তমান দাবির অঙ্ক সরাসরি তুলনা করার ক্ষেত্রে পার্থক্যটি বিবেচনায় রাখা জরুরি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের অক্টোবরের বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমাচ্ছে এবং ব্যবসার ব্যয় বাড়াচ্ছে।
শ্রমিক অধিকারকর্মী কল্পনা আক্তার মনে করেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও চিকিৎসার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই মজুরির দাবি মূল্যায়ন করা উচিত। তাঁর মতে, শ্রমিকদের জন্য জীবনধারণের উপযোগী মজুরি নিশ্চিত করা জরুরি। এমন মজুরি হতে হবে, যাতে স্বাভাবিক কর্মঘণ্টার মধ্যেই একজন শ্রমিক নিজের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারেন। অতিরিক্ত সময় কাজের ওপর নির্ভর করে সংসার চালানোকে তিনি উদ্বেগজনক বলে মনে করেন।
কল্পনা আক্তার আরও বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের আশ্বাস দেওয়া হলেও শ্রমিকেরা কবে নাগাদ কোনো সিদ্ধান্ত বা সহায়তা পাবেন, সে বিষয়ে স্পষ্টতা কম।
মজুরি বাড়ানোর অর্থ জোগাবে কে
পোশাকশিল্পের মালিকদের একাংশ মনে করেন, মূল্যস্ফীতির কারণে মজুরি সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। তবে কাঁচামাল, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে নতুন করে মজুরি বাড়ানোর অর্থ জোগাড় করা কঠিন।
ডিবিএল গ্রুপের এম এ জব্বার বলেন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা থাকলেও কারখানাগুলোর আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। তাঁর দাবি, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে উৎপাদনমূল্য বাড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরছেন বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারকেরা। কিন্তু ক্রেতারা শ্রমিক অধিকার ও পরিবেশগত মান উন্নয়নের দাবি জানানোর পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, অপচয় কমানো এবং পণ্যের দাম কমানোর চাপও দেন।
জব্বারের প্রশ্ন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দিতে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা প্রতিটি পোশাকের দাম মাত্র পাঁচ বা দশ মার্কিন সেন্ট বাড়াতে পারেন না কেন?
ফকির ফ্যাশনের ফকির কামরুজ্জামান নাহিদও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি সমন্বয়ের পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে তাঁর মতে, শ্রমিকদের বর্তমান দাবির পরিমাণ এবং নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের প্রস্তুতির মধ্যে চলমান বিক্ষোভের বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার। তিনি জানান, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার কারণে কয়েকটি কারখানা ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে।
নাহিদের মতে, আন্তর্জাতিক বড় ক্রেতাদের সঙ্গে দর-কষাকষিতে বাংলাদেশের অনেক কারখানার অবস্থান দুর্বল। বিশেষ করে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো না গেলে ক্রেতাদের কাছে ভালো দাম আদায় করা আরও কঠিন হয়। এ পরিস্থিতি বদলাতে নকশা, গবেষণা, পণ্যের বৈচিত্র্য ও বিপণনে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অন্যদিকে, কল্পনা আক্তারের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা এবং শক্তিশালী দর-কষাকষির অবস্থান তৈরি করতে না পারার কারণে পোশাক প্রস্তুতকারকেরা ক্রেতাদের শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হন। তাঁর মতে, ক্রয়াদেশ হারানোর আশঙ্কা দেখিয়ে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি অনির্দিষ্টকাল উপেক্ষা করা যায় না।
আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের পোশাক সরবরাহকারীদের মাত্র ১৭ শতাংশ বলেছেন, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির প্রভাব তাঁরা ক্রেতাদের কাছ থেকে পাওয়া পণ্যমূল্যে প্রতিফলিত হতে দেখেছেন। জরিপে অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন দেশের সরবরাহকারীদের ক্ষেত্রে মজুরি বৃদ্ধির অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে পণ্যমূল্য সমন্বয়ের জন্য গড়ে ১২ সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
স্টিচ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালের ন্যূনতম মজুরি সংশোধনের পর রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের বাইরের জরিপ করা ৬৭ শতাংশ কারখানা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছ থেকে কোনো মূল্যবৃদ্ধি পায়নি। যেসব কারখানা মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত উৎপাদন ব্যয়ের পুরোটা মেটানো সম্ভব হয়নি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের এক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রতিটি পোশাকের দাম সাত মার্কিন সেন্ট বাড়ানো হলে প্রস্তুতকারকদের মুনাফার হার না কমিয়েও প্রস্তাবিত ১৭ হাজার ৫৬৮ টাকা ন্যূনতম মজুরি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারত।
তবে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর বক্তব্য কিছুটা ভিন্ন। ২০২৪ সালে বিজনেস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস রিসোর্স সেন্টারের সংগ্রহ করা প্রতিক্রিয়ায় সাড়া দেওয়া ১০টি ব্র্যান্ডের মধ্যে নয়টি জানিয়েছিল, মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তারা পণ্যের ক্রয়মূল্য সমন্বয় করেছে। এইচঅ্যান্ডএম, ইন্ডিটেক্স, নেক্সট ও বেস্টসেলার তাদের মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থায় মজুরি ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানিয়েছিল। তবে এসব বক্তব্য থেকে ক্রেতারা বাস্তবে অতিরিক্ত মজুরি ব্যয়ের কতটা বহন করেছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন
২০২৪ সালে শ্রমিক অসন্তোষের পর শ্রমিক, মালিক ও তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে ১৮ দফা দাবি নিয়ে সমঝোতা হয়। ওই বছরের ডিসেম্বরে সরকার নিয়মিত ৫ শতাংশ বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে অতিরিক্ত ৪ শতাংশ বৃদ্ধির অনুমোদন দেয়।
তবে ২০২৩ সালের ন্যূনতম মজুরি সংশোধনের বাস্তবায়ন নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রশ্ন ওঠে। স্টিচ কনসোর্টিয়াম ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, জরিপ করা ৩৮৫টি কারখানার ৩২ শতাংশ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংশোধিত মজুরি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি। জরিপে মজুরি পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করা সব কারখানাই রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের বাইরে ছিল।
অন্যদিকে, শ্রম মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সদস্য কারখানাগুলোর ৯৯ শতাংশের বেশি সংশোধিত মজুরি বাস্তবায়ন করেছে। তবে দুটি গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত কারখানা ও তথ্য সংগ্রহের সময়কাল এক ছিল না। তাই ফলাফল সরাসরি তুলনা করা যায় না। তা সত্ত্বেও বৃহত্তর শিল্পে, বিশেষ করে সমিতির সদস্য নয় এমন কারখানাগুলোতে, মজুরি বাস্তবায়নের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
২০২৪ সালের নভেম্বরে শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মজুরি পর্যালোচনা করা দরকার কি না, তা যাচাই করে ২০২৫ সালের এপ্রিলের মধ্যে সুপারিশ দেওয়ার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে। তবে সেই উদ্যোগের ফলাফল কী হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
২০২৬ সালে শ্রম আইনের সংশোধনের মাধ্যমে ন্যূনতম মজুরি পর্যালোচনার মধ্যবর্তী সময় পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের জন্য মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিদের নামও চেয়েছে।
ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট কমিটি গঠিত হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হবে।
নতুন মজুরি বোর্ডেই কি মিলবে সমাধান
শ্রমিকদের অসন্তোষের সব কারণ অবশ্য ন্যূনতম মজুরির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বেতন বকেয়া থাকা, শ্রমিক ছাঁটাই এবং কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যার পেছনে আলাদা কারণ রয়েছে। শুধু নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করলেই এসব সমস্যার সমাধান হবে না।
নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের দাবি ও মালিকদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: নির্ধারিত মজুরি যথাসময়ে শ্রমিকদের হাতে পৌঁছানো, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি পর্যালোচনা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে উৎপাদন ব্যয়ের উপযোগী মূল্য নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে মজুরি নিয়ে বিরোধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে তাই শুধু নতুন মজুরি ঘোষণা যথেষ্ট নয়। সেই মজুরি বাস্তবায়নের কার্যকর ব্যবস্থা এবং শ্রমিক, মালিক ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে উৎপাদন ব্যয়ের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করাও জরুরি।
সুত্রঃদ্য ডেইলি স্টার