বাংলাদেশ

দুই বছরেও সংস্কার হয়নি শাবিপ্রবির ‘চেতনা-৭১’, প্রস্তুতি নিলেও মেলেনি অনুমতি

ভাঙচুরে ক্ষতিগ্রস্ত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য, সংগ্রহ করা অর্থে সংস্কারের প্রস্তুতি নিয়েও অনুমতি মেলেনি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের; প্রশাসন বলছে, ধাপে ধাপে সমস্যার সমাধান করা হচ্ছে

  • 4:33 pm - October 23, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৬১ বার
দুই বছরেও সংস্কার হয়নি শাবিপ্রবির ‘চেতনা-৭১’। ছবিঃ সংগৃহীত

একসময় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ‘চেতনা-৭১’ ভাস্কর্যের পাদদেশ ছিল শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, গল্প, আড্ডা ও ছবি তোলার পরিচিত জায়গা। জাতীয় দিবসগুলোতে ভাস্কর্য ঘিরে মোমবাতি প্রজ্বালন, আলোকসজ্জা ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচিও পালন করা হতো। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধারণকারী এই ভাস্কর্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম পরিচিত স্থাপনা।

কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভাঙচুরের ঘটনায় বদলে যায় সেই চিত্র। ক্ষতিগ্রস্ত ভাস্কর্যটি দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সংস্কার করা হয়নি। শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ করে মূল শিল্পীর মাধ্যমে সংস্কারের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমতি না পাওয়ায় সেই উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।

বর্তমানে ভাস্কর্যটির বিভিন্ন অংশে ভাঙচুরের চিহ্ন স্পষ্ট। জাতীয় পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রের প্রতিকৃতির মুখাবয়ব বিকৃত হয়ে গেছে। ছাত্র ও ছাত্রীর প্রতিকৃতির পেছনের অংশ এবং পায়েও ক্ষতি হয়েছে। বেদি থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে ‘চেতনা-৭১’ লেখা নামফলক। দীর্ঘদিন সংস্কার ও পরিচর্যা না করায় প্রতিকৃতির গায়ে শ্যাওলা জমেছে, পড়েছে কালচে দাগ। ভাস্কর্যটির চারপাশের মেঝেও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থাপনার এমন অবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ ও সংস্কারের প্রস্তুতি নেওয়ার পরও কেন কাজটি এগোয়নি? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিজ উদ্যোগে সংস্কারের ব্যবস্থা না নেওয়ায় ভাস্কর্যটি কবে আগের অবস্থায় ফিরবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

যেভাবে ভাঙচুর করা হয় ভাস্কর্যটি

বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১০ জন নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মধ্যরাতে একদল ব্যক্তি মোটরসাইকেলে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনের ফটক দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। তাঁদের হাতে অস্ত্র ছিল বলে নিরাপত্তাকর্মীরা জানিয়েছেন। পরে তাঁরা ‘চেতনা-৭১’ ভাস্কর্য এলাকায় গিয়ে ভাঙচুর চালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে বেরিয়ে যান।

ওই ঘটনার পর ভাস্কর্যটি ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে থাকলেও দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। পরবর্তী সময়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ করে ভাস্কর্যটি মেরামতের চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রশাসনিক অনুমতি ও সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় তাঁদের সেই উদ্যোগও থেমে যায়।

অর্থ সংগ্রহ করেও সংস্কার করতে পারেননি শিক্ষার্থীরা

ভাস্কর্যটি ভাঙচুরের পর সংস্কারের উদ্যোগ নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী। তাঁরা হলেন ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান বিভাগের অন্তিক চৌধুরী এবং ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের স্থাপত্য বিভাগের মুহতাসিম ফিরদাউস মাহিন।

শিক্ষার্থীরা জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেন তাঁরা। ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। এর মধ্যে ভাস্কর্যটির মূল শিল্পী মোবারক হোসেন নৃপালকে দেওয়া হয় ২৫ হাজার টাকা। ওই অর্থ দিয়ে তিনি সংস্কারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনেন এবং মেরামতের জন্য ছাঁচ বা মোল্ড তৈরির কাজও করেন।

তবে বন্যা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন কারণে সংস্কারকাজ পিছিয়ে যায় বলে জানান শিক্ষার্থীরা। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে তাঁরা তৎকালীন প্রক্টর কার্যালয়ে সংস্কারের বিষয়ে আবেদন করেন। সেখান থেকে জানানো হয়েছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির সময়ে কাজটি করা সুবিধাজনক হবে এবং উপযুক্ত সময়ে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।

অর্থ সংগ্রহ করেও সংস্কার করতে পারেননি শিক্ষার্থীরা। ছবিঃ সংগৃহীত

কিন্তু দীর্ঘদিন অপেক্ষার পরও আর কোনো সাড়া পাননি বলে অভিযোগ তাঁদের। এতে পাঁচ থেকে ছয় মাস পেরিয়ে যায়। একপর্যায়ে সংস্কারের জন্য কেনা সামগ্রী নষ্ট হয়ে যায় বলে জানতে পারেন তাঁরা। ফলে অর্থ সংগ্রহ ও প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও কাজটি আর শুরু করা সম্ভব হয়নি।

অন্তিক চৌধুরী বলেন, “চেতনা-৭১ ভাস্কর্যটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আমরা কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে এর মূল শিল্পী মোবারক হোসেন নৃপালের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি জানান, ভাস্কর্যটি মেরামত করতে ২৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকা লাগতে পারে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে আমরা ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা সংগ্রহ করি। এর মধ্যে ২৫ হাজার টাকা শিল্পীকে দেওয়া হলে তিনি মেরামতের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনেন এবং কাজের প্রস্তুতি নেন।”

তিনি আরও বলেন, “কিন্তু তৎকালীন দক্ষিণাঞ্চলের বন্যার কারণে মেরামতের কাজ পিছিয়ে যায়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে আমরা তৎকালীন প্রক্টর অফিসে মেরামতের বিষয়ে আবেদন করি। প্রক্টর অফিস থেকে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির সময়ে কাজটি করা সুবিধাজনক হবে। উপযুক্ত সময়ে তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে বলেও জানানো হয়। কিন্তু এরপর আর সাড়া না পাওয়ায় কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।”

সংস্কারের উদ্যোগটি কীভাবে থেমে যায়, তার বর্ণনা দিয়ে অন্তিক চৌধুরী বলেন, “এভাবে কয়েক মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর আমরা জানতে পারি, মেরামতের জন্য কেনা সামগ্রীগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ ও প্রস্তুতি নেওয়া সত্ত্বেও ভাস্কর্যটি সংস্কার করা যায়নি। এখন আমাদের কাছে সংগ্রহ করা অর্থের অবশিষ্ট প্রায় আট হাজার টাকা আছে। ভবিষ্যৎ সংস্কারকাজের জন্য প্রশাসনের কাছে জমা দিতেও আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া আরেক শিক্ষার্থী মুহতাসিম ফিরদাউস মাহিনও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিজ উদ্যোগে সংস্কারের দায়িত্ব না নিলে এখন শিক্ষার্থীদের পক্ষে কাজটি এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

মূল শিল্পীও প্রস্তুত, প্রয়োজন প্রশাসনের অনুমতি

‘চেতনা-৭১’ ভাস্কর্যটির নকশাকার ও নির্মাতা শিল্পী মোবারক হোসেন নৃপাল জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ পাওয়ার পর তিনি সংস্কারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতার কারণে কাজটি আর এগোয়নি।

তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীরা টাকা সংগ্রহ করে একটা অ্যামাউন্ট আমাকে দিয়েছিল। তখন সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে কাজটি আর এগোয়নি।”

ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি বিবেচনায় অনুমতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কাজ শুরু করতে চাননি বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, “শিক্ষার্থীদের বলেছিলাম, প্রশাসনের অনুমতি ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে যেন আমাকে জানায়। ক্যাম্পাসের পরিস্থিতিতে কাজটি করতে গিয়ে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা বিতর্ক তৈরি হোক, তা আমি চাইনি।”

সংস্কারের জন্য তৈরি করা মোল্ডের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত নন শিল্পী। তবে সেটি নষ্ট হয়ে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

নৃপাল বলেন, “মোল্ডটি এখনো ভালো আছে না-কি নষ্ট হয়ে গেছে, তা দেখতে হবে। নষ্ট হয়ে থাকলে আমি নিজ থেকে তা ব্যবস্থা করব। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সংস্কারের অনুমতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে ভাস্কর্যটি আগের আদলে ফিরিয়ে আনতে আমি শ্রম ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।”

মূল শিল্পীর এই আগ্রহের পরও সংস্কারকাজ শুরু না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। তাঁদের মতে, প্রয়োজনীয় অনুমতি ও প্রশাসনিক সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে ভাস্কর্যটি পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করা সম্ভব।

ছয় লাখ ৮০ হাজার টাকায় নির্মিত হয়েছিল ‘চেতনা-৭১’

‘চেতনা-৭১’ ভাস্কর্যটির ইতিহাসও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৫-০৬ শিক্ষাবর্ষের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ও তৎকালীন ভাস্কর্য পুনঃস্থাপন কমিটির আহ্বায়ক ফেরদৌস হাসান ফাহিম জানান, ২০০৯ সালের ২৬ মার্চ ভাস্কর্যটি স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়।

সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মিনি অডিটোরিয়ামের পশ্চিম পাশে শিক্ষার্থীরা একটি অস্থায়ী ভাস্কর্য স্থাপন করেন। পরে এটিকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ উদ্দেশ্যে বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠন করা হয় ‘ভাস্কর্য পুনঃস্থাপন কমিটি’।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং একটি বেসরকারি ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় প্রায় ছয় লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে স্থায়ী ভাস্কর্যটি নির্মিত হয়। এর নকশা করেন নারায়ণগঞ্জের ‘নৃ স্কুল অব স্কাল্পচার’-এর প্রতিষ্ঠাতা শিল্পী মোবারক হোসেন নৃপাল।

২০১১ সালের ৩০ জুলাই তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ উদ্দিন আহমেদ ভাস্কর্যটির উদ্বোধন করেন। এরপর থেকে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্মারক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিচিত কেন্দ্রে পরিণত হয়।

ভাস্কর্যটির নকশায় রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক

বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ভবন ‘এ’-এর উত্তর-পশ্চিম পাশে তিন রাস্তার মোড়ে অবস্থিত ‘চেতনা-৭১’। ভাস্কর্যটির বেদি তিনটি ধাপে তৈরি। লাল ও কালো সিরামিক ইটের তৈরি ধাপগুলোর ব্যাস যথাক্রমে ১৫ ফুট, সাড়ে ১৩ ফুট ও ১২ ফুট। প্রতিটি ধাপের উচ্চতা ১০ ইঞ্চি।

এই ধাপগুলোর ওপর চার ফুট উঁচু মূল বেদিতে স্থাপন করা হয়েছে আট ফুট উঁচু দুটি প্রতিকৃতি। এর একটিতে একজন ছাত্রের হাতে উঁচু করে ধরা রয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। অন্য প্রতিকৃতিতে একজন ছাত্রীর হাতে রয়েছে একটি বই, যা সংবিধানের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ভাস্কর্যটির নকশায় মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের সাংবিধানিক চেতনার প্রতীকী উপস্থাপন রয়েছে। ফলে এটি কেবল ক্যাম্পাসের একটি স্থাপনা নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির সঙ্গেও যুক্ত।

জাতীয় দিবসে আলোকসজ্জা, কিন্তু সংস্কার নেই

ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে থাকলেও বিভিন্ন জাতীয় দিবস এবং বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সময় ‘চেতনা-৭১’ ভাস্কর্য এলাকায় আলোকসজ্জা করা হয় বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন এসব আয়োজন করে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘শিকড়’-এর সভাপতি মিনহাজুল ইসলাম বলেন, “চেতনা-৭১ আমাদের ক্যাম্পাসে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধারণকারী একমাত্র স্মারক এবং সিলেট অঞ্চলের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে দুষ্কৃতকারীরা এই ভাস্কর্যে আঘাত করে।”

তিনি আরও বলেন, “গত দুই বছরে দেশে অনেক পরিবর্তন হয়েছে, নির্বাচিত সরকার এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনও পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই ভাস্কর্যটি আজও দেশবিরোধী হায়েনাদের দেওয়া ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই ভাস্কর্য সংস্কার না হওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। আমরা চাই, এটি দ্রুত সংস্কার করা হোক।”

শিক্ষার্থীদের মতে, জাতীয় দিবসে ভাস্কর্যটি আলোকসজ্জায় সাজানো হলেও এর মূল কাঠামোর ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো মেরামত করা জরুরি। নিয়মিত পরিচর্যা ও সংস্কার ছাড়া এভাবে পড়ে থাকলে ভাস্কর্যটির অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে বলেও তাঁরা আশঙ্কা করছেন।

‘ধাপে ধাপে কাজ হচ্ছে’, বলছে প্রশাসন

ভাস্কর্যটির সংস্কার নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মোখলেসুর রহমান বলেছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, এটি সংস্কার করা প্রয়োজন। তবে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করেও এখন পর্যন্ত সমস্যার সমাধান করা যায়নি।

তিনি বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এটা সংস্কার করা দরকার। ভাস্কর্যটা আমাদের স্বাধীনতার চেতনার অংশ। গত দু-এক বছরে আমি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছি। কিন্তু বিভিন্ন পর্যায়ে সেটার সমাধান পাইনি।”

সংস্কারের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি আরও বলেন, “এটার যেটুকু ক্ষতি হয়েছে, আমার মনে হয়, এটা সংস্কার করা সম্ভব। আমি ইতিবাচকভাবে চিন্তা করছি। দেখি প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে এ ব্যাপারে খুব শিগগিরই কিছু করা যায় কি-না।”

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার কালাম আহমদ চৌধুরীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

উপাচার্য অধ্যাপক খায়রুল ইসলাম বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক সমস্যা রয়েছে এবং সেগুলো ধাপে ধাপে সমাধানের চেষ্টা চলছে। ‘চেতনা-৭১’ ভাস্কর্য সংস্কারের বিষয়টিও সেই সমস্যাগুলোর একটি।

তিনি বলেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান অনেকগুলোই সমস্যা আছে। তার মধ্যে চেতনা-৭১ এটাও একটা। সবগুলো নিয়ে আমরা ধাপে ধাপে কাজ করছি।”

কবে সংস্কার হবে, সেই অপেক্ষায় শিক্ষার্থীরা

শিক্ষার্থীদের অর্থ সংগ্রহ, মূল শিল্পীর প্রস্তুতি এবং সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশাসনের ইতিবাচক বক্তব্য থাকা সত্ত্বেও ‘চেতনা-৭১’ ভাস্কর্যের সংস্কারকাজ এখনো শুরু হয়নি। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রশাসনিক অনুমতি ও সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় তাঁদের উদ্যোগ থেমে যায়। অন্যদিকে প্রশাসন বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যা ধাপে ধাপে সমাধানের চেষ্টা চলছে।

ফলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ভাস্কর্যটির ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো কবে মেরামত করা হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, প্রশাসন দ্রুত প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে মূল শিল্পীর সহযোগিতায় ভাস্কর্যটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেবে।

যে ভাস্কর্য একসময় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, আড্ডা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের কেন্দ্র ছিল, সেটি এখনো ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। সংস্কারের উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হওয়ায় শুধু একটি স্থাপনার মেরামতই আটকে নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এই শাখার আরও খবর

এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় আনা রাবি শিক্ষার্থী চেসি ত্রিপুরার মৃত্যু

পূজার দাওয়াত খেয়ে ক্যাম্পাসে ফেরার পথে ট্রাকের ধাক্কায় গুরুতর আহত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থী চেসি ত্রিপুরা মারা গেছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় নেওয়ার…

হরমুজ প্রণালিতে এক রাতেই ৭ জাহাজে হামলা, ফের সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে এক রাতেই সাতটি তেলবাহী জাহাজে হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির খবর জানিয়েছে…

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি করেছেন জুলাই আন্দোলনে আহত হওয়ার অভিযোগে মামলা

জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের হামলায় আহত হওয়ার অভিযোগে করা একটি মামলার তদন্তে ভিন্ন তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,…

চীনের তিব্বতে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহত ১৬, আহত ৩২

চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তিব্বত অঞ্চলে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন। আহতদের মধ্যে ১১ জনের অবস্থা…

দুই মাস ধরে আলাদা, জানুয়ারিতে বিচ্ছেদের ঘোষণা দেবেন ফারুকী-তিশা

ওটিএন বাংলা ডেস্ক : দীর্ঘ ২০ বছরের সম্পর্ক ও ১৬ বছরের দাম্পত্য জীবন শেষে বিচ্ছেদের পথে হাঁটছেন নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ…

সংঘর্ষে ইথিওপিয়া ছেড়ে কেনিয়ায় আশ্রয় নিচ্ছেন শত শত মানুষ

ইথিওপিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় সংঘর্ষের জেরে শত শত মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রতিবেশী দেশ কেনিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। বাস্তুচ্যুত এসব মানুষের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। তাঁদের…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au