সর্বশেষ

রাহেল রাজিবের কবিতা: শব্দের শরীরে বোধের অনুরণন

  • 10:28 pm - October 23, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১১০ বার
কবি রাহেল রাজিব। ছবি : সংগৃহীত

কবিতা বোধের অনুরণন কিংবা নান্দনিক শিল্পভাষা—যেখানে মূর্ত জীবনচিত্রের আড়ালে বিমূর্ত অনুভূতিগুলো শব্দের অবয়ব লাভ করে। মানুষ, পৃথিবী, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, সময়ের অভিঘাত, স্মৃতির আলো-অন্ধকার এবং অস্তিত্বের নিঃসঙ্গ প্রশ্ন—সবকিছু কবিতার ভেতর এসে নতুন এক নন্দনতাত্ত্বিক বিন্যাস তৈরি করে এবং সে বিন্যাসে শব্দ হয়ে ওঠে অনুভবের বাহন, চিন্তার প্রতিরূপ এবং অন্তর্জগতের প্রতিধ্বনি। শূন্য দশকের কবি রাহেল রাজিবের (জন্ম: ১৯৮৪, ২৩ অক্টোবর) কবিতায় শব্দ ও বোধের আন্তঃসম্পর্ক শৈল্পিক তাৎপর্য বহন করে। তাঁর কবিতার শব্দমালা পাঠকের সামনে একটি বহুমাত্রিক অনুভবের জগৎ উন্মোচন করে, যেখানে ব্যক্তিমানুষের অন্তর্গত আলোড়ন বৃহত্তর জীবনবাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। তাঁর কবিতায় যে বিষয়টি লক্ষণীয় তা—শব্দ ব্যবহারের মধ্যে এক ধরনের অন্তর্মুখী গতি; ফলে এ গতি তাঁর কবিতায় শব্দের ভেতর দিয়ে অনুভূতির গভীর স্তরে পৌঁছে যায়। পাঠক সে অর্থ উন্মোচন করেন নিজের অনুভবের সঙ্গে কবিতার অনুভবকে মিলিয়ে নেন এবং এখানে তাঁর কবিতার নান্দনিক শক্তির একটি শিল্পিত অনুধ্যায় তৈরি হয়।

কবিতার ভাষা যখন ব্যক্তিগত অনুভূতিকে ধারণ করে, তখন সে অনুভূতি অনেক সময় ব্যক্তিগত সীমানা অতিক্রম করে সার্বজনীন হয়ে ওঠে। রাহেল রাজিবের কবিতায় ব্যক্তিমানুষের অভিজ্ঞতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে একাকিত্ব, প্রেম-অপ্রেম, প্রত্যাশা, বিচ্ছেদ, বিষাদ, স্মৃতি, স্বপ্ন ও আত্মজিজ্ঞাসা বৃহত্তর মানবিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংযুক্ত হয়। তাঁর কবিতার ‘আমি’র ভেতরে সময়ের চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং চারপাশের জীবনের নানা অনুরণন প্রবেশ করে এবং ব্যক্তিসত্তার এ বিস্তার তাঁর কবিতাকে গভীর মানবিক মাত্রা দেয়।

‘স্বদেশ স্বদেশ করিস কারে’ কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভূতি ধীরে ধীরে অতিক্রম করেছে আত্মপরিসরের সীমানা। কবির স্মৃতিতে দেশ, শৈশব, মাটি, ঘর এবং হারিয়ে যাওয়া আপনজনের যে বিচ্ছিন্ন অনুভব জমে আছে, তা একসময় বৃহত্তর মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে যায়। দেশভাগের ইতিহাস কবির ব্যক্তিমানসে ক্ষত-বিক্ষত, স্মৃতি ও স্বদেশচেতনার গভীর অনুরণন হয়ে ফিরে আসে। ফলে কবির নিজের হারানোর বেদনা পাঠকেরও হারানোর অনুভূতিতে রূপান্তরিত হয়। ‘মাটি’, ‘দেশ’ ও ‘স্বদেশ’ শব্দগুলো ব্যক্তিগত স্মৃতির আশ্রয় পেরিয়ে মানুষের শিকড়, পরিচয় ও আপন ভূখণ্ডের প্রতীক হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত কণ্ঠের ভেতর দিয়ে উচ্চারিত এ সার্বজনীন বেদনা কবিতাটিকে হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছে। এখানে কবির ‘আমি’ ধীরে ধীরে বহুমানুষের ‘আমরা’-তে বিস্তৃত হয়েছে; ব্যক্তিগত স্মৃতি তাই ধারণ করেছে একটি প্রজন্মের সম্মিলিত স্বদেশ-আকাঙ্ক্ষা।

তুমি মাটি? কিংবা তুমি আমরাই স্মৃতির ধূঁধে ধূঁধে/ কেবল ছড়াও মৃদুস্বর আর কিছু নও?/ রেখায় রেখায় লুপ্ত মানচিত্র-শূন্যে চুপচাপি-/ তোমার সত্তাই শুধু অতীতের উদাসী উদাসী/ বাল্য সহচর! তুমি মাটি নও দেশ নও তুমি। (রাহেল রাজিব, স্বদেশ স্বদেশ করিস কারে) তাঁর কবিতায় শব্দের একটি নিজস্ব দেহ রয়েছে—সে দেহে কখনো আলো, কখনো অন্ধকার, কখনো স্মৃতির ধূসরতা, কখনো আকাঙ্ক্ষার উজ্জ্বলতা এসে জমা হয়। শব্দের এ দেহীভবন তাঁর কবিতাকে দৃশ্যমানতার পাশাপাশি অনুভবযোগ্য করে তোলে। একটি শব্দ কখনো একটি চিত্রকল্পের দরজা খুলে দেয়, কখনো একটি স্মৃতির দিকে নিয়ে যায়, কখনো আবার একটি অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড় করায়, যার নির্দিষ্ট কোনো নাম নেই। ফলে তাঁর কবিতার পাঠ স্বাভাবিক অর্থগ্রহণের অভিজ্ঞতাকে অতিক্রম করে এবং তৈরি করে এক ধরনের আবেশময় অনুসন্ধান এবং এ অনুসন্ধানের কেন্দ্রে রয়েছে বোধ। বোধ এখানে জীবনের সঙ্গে মানুষের গভীর সংযোগের এক অন্তর্গত উপলব্ধি। মানুষ যে পৃথিবীতে বাস করে, সে পৃথিবীকে সে শুধু চোখ দিয়ে দেখে না; স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, প্রেম ও স্বপ্নের মধ্য দিয়ে অনুভব করে; তাঁর কবিতায় এ অনুভবের স্তরগুলো শব্দের সঙ্গে মিশে যায়।

‘লিভ টুগেদার-১’ কবিতায় শব্দ প্রচলিত অর্থের গণ্ডি অতিক্রম করে এক স্বতন্ত্র নান্দনিক দেহ লাভ করেছে। ‘উত্তরপথ’, ‘ভাটিটান’, ‘দক্ষিণে মেরুকরণ’, ‘গোলকধাঁধা’, ‘ঘুড়ির সুতো’, ‘বেদুইন নারী’, ‘ফেরারি মৌমাছি’, ‘পদ্মায় লঞ্চ’, ‘মধ্যপ্রাচ্য’, ‘মৈনাক পর্বতমালা’—বিচিত্র ভূগোল, সংস্কৃতি, পুরাণ ও জীবনচিত্রের এ সমাবেশ কবিতার ভেতরে একটি বহুস্বর অনুভূতির দৃশ্য নির্মাণ করে। ফলে কবিতার শব্দ পড়তে হয় একই সঙ্গে দৃশ্য, গন্ধ, গতি ও অনুভূতি হিসেবে।

‘পদ্মায় লঞ্চে উঠি মধ্যপ্রাচ্য ঘুরি’—এ পঙ্‌ক্তিতে স্থানগত দূরত্ব এক আশ্চর্য কল্পনাশক্তির মাধ্যমে বিলীন হয়ে যায়। পদ্মা থেকে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর থেকে দক্ষিণ, মরুপথ থেকে মেরুপথ—কবির শব্দভুবনে ভূগোল কোনো স্থির ভূপ্রকৃতি নয়; তা মানুষের অভিজ্ঞতা ও অস্তিত্বের বিচিত্র পথের প্রতীকে রূপান্তরিত হয়। ‘জীবন যেখানে মরু পথ’ উচ্চারণে এ যাত্রা আরও গভীর অস্তিত্ববোধে পৌঁছায়। বাইরের পৃথিবীর পথ ধীরে ধীরে মানুষের অন্তর্জগতের পথ হয়ে ওঠে।

‘উত্তরপথ প্রিয়, ভাটিটানে দক্ষিণে মেরুকরণ/গোলকধাঁধা আর ঘুড়ির সুতোয় পড়ুক টান/ বেদুইন নারী/ লাজনম্র বিকেল উপহার/ মেলবন্ধন খুঁজে ফেরে ফেরারি মৌমাছির ঘ্রাণ!/ এসো, পদ্মায় লঞ্চে উঠি মধ্যপ্রাচ্য ঘুরি বাউন্ডুলে হয়ে মরণ পথে মিলুক মেরু পথ। জীবন যেখানে মরু পথ!’ (রাহেল রাজিব, লিভ টুগেদার-১) কবিতার নান্দনিক শক্তির আরেকটি জায়গা—শব্দের তীব্র বৈপরীত্য। ‘যুদ্ধ শুধু যুদ্ধ রক্ত-মৃত্যু’—এর বিপরীতে রয়েছে ‘লাজনম্র বিকেল’, ‘ঘ্রাণ’, ‘মেলবন্ধন’; একদিকে মৃত্যুর নির্মমতা, অন্যদিকে জীবনের কোমল আকাঙ্ক্ষা এবং এ দ্বন্দ্ব কবিতার অনুভূতিকে বহুমাত্রিক করেছে। ‘মৃত্যু ভয় তবু নিষ্ঠুর নীরবতা’ পঙ্‌ক্তিতে মানুষের ভেতরের আতঙ্ক ও বহির্জগতের উদাসীনতা পাশাপাশি এসে এক গভীর মানবিক অস্বস্তি তৈরি করে। ‘আয়নায় আমাদের উটপাখি’ একটি শক্তিশালী প্রতীক। আয়না যেখানে আত্মদর্শনের স্থান, সেখানে উটপাখি হয়ে ওঠে বাস্তবতা এড়িয়ে চলা মানুষের প্রতিচ্ছবি। ‘আমরা খুব সহজে ভুলে থাকি’ এবং ‘আমরা স্বার্থপরের মতো বাঁচি’ উচ্চারণে ব্যক্তিগত বোধ ক্রমে সমষ্টিগত আত্মসমালোচনায় বিস্তৃত হয় এবং এ কবিতার শব্দই অনুভূতির শরীর তৈরি করে।

তাঁর কবিতায় সময় ও স্মৃতি বিশেষভাবে অনুভূতিনির্ভর। সময়ের এ অন্তর্গত প্রবাহ কবিতাকে দেয় স্মৃতিময় আবহ এবং মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা। মানুষ অতীতকে যেমন মনে রাখে, তেমনই অতীতও মানুষের বর্তমান অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। তাঁর কবিতায় স্মৃতি তাই কখনো কোমল, কখনো বিষণ্ন, কখনো তীব্র। কোনো হারিয়ে যাওয়া মুখ, কোনো অসমাপ্ত সম্পর্ক, কোনো উচ্চারিত বা অনুচ্চারিত কথা—সবই স্মৃতির ভেতর নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসে এবং এ ফিরে আসার মধ্যে রয়েছে বিষাদ, আবার একই সঙ্গে রয়েছে সৌন্দর্য।

‘নিরন্তর ডুবে থাকা শৈবালের বুকে থাকা হাহাকার’ পঙ্‌ক্তিতে প্রকৃতির একটি নিস্তরঙ্গ দৃশ্যের মধ্যে কবি সঞ্চার করেছেন গভীর মানবিক বেদনা। শৈবাল এখানে স্থির জলজ উপাদান থেকে স্মৃতির প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে; তার ‘বুকে’ জমে থাকা হাহাকার যেন অতীতের অস্পষ্ট অথচ অনিবার্য উপস্থিতি। ফলে প্রকৃতি ও মানুষের অনুভূতি একই আবেগের শরীরে এসে মিলিত হয়।

‘থরথর ভূমি / কেঁপে ওঠে জল’—এ চিত্রকল্প মূলত অন্তর্জগতের আলোড়নের প্রতিধ্বনি। জল এখানে সময়ের মতো—তার উপর সামান্য স্পর্শও অতীতের সুপ্ত বৃত্তকে জাগিয়ে তোলে। ‘শামুকেরা আসে উঠে, সময়ের ভিড়ে’ পঙ্‌ক্তিতে সময় যেন দৃশ্যমান ও স্পর্শযোগ্য হয়ে ওঠে। শামুকের উঠে আসা অতীতের কোনো চাপা স্মৃতি, বিস্মৃত অনুভব কিংবা দীর্ঘদিনের নিঃশব্দ অপেক্ষার পুনরাবির্ভাবের ইঙ্গিত বহন করে। পরবর্তী পঙ্‌ক্তিগুলোতে স্মৃতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে—‘নিঃসঙ্গ প্রশ্নের তীরে জর্জরিত করে / ক্ষত না শুকাতেই ফের তীর বেঁধে / ফিরে আসে দিন।’ এখানে ‘তীর’ ও ‘ক্ষত’ একই সঙ্গে মানসিক যন্ত্রণা এবং স্মৃতির পুনরাগমনের প্রতীক। একটি ক্ষত শুকিয়ে ওঠার আগেই নতুন তীরের আঘাত নিয়ে দিনের ফিরে আসা সময়ের নির্মম পুনরাবৃত্তিকে প্রকাশ করে। প্রতিটি নতুন দিন তাই নতুন সূচনার প্রতীক না হয়ে পুরোনো বেদনার পুনরুজ্জীবন ঘটায়। অতীত এখানে বর্তমানের অনুভূতিতে বারবার ফিরে এসে বর্তমানকে নতুন অর্থ দেয়। তাঁর কবিতার নান্দনিকতার বিশেষত্ব এখানে—তিনি সময়কে অনুভবের এবং স্মৃতিকে অস্তিত্বের ভাষায় রূপ দেন। শৈবাল, জল, শামুক, তীর, ক্ষত ও দিন—প্রকৃতির এ শব্দগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এমন এক কাব্যিক আবহ নির্মাণ করে, যেখানে সময় দৃশ্যমান হয় ও স্মৃতি স্পর্শযোগ্য হয়ে ওঠে। ফলে কবিতার সময় ও স্মৃতি কখনো বেদনাময় কখনো প্রেমময় অনুরণন। চারপাশের জীবন, মানুষের সম্পর্ক, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, নগরজীবনের ক্লান্তি কিংবা সময়ের পরিবর্তন—এ সব অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতার অন্তর্গত বোধকে নির্মাণ করে। ফলে ব্যক্তিগত অনুভূতির ভেতরও বৃহত্তর সময়ের একটি ছাপ থাকে।

বালিঘর কবিতায় ‘কৌণিক সুরঙ্গ পথরেখা’, ‘চেনা পথ’, ‘বালিগুহা’, ‘উপত্যকা’—এ শব্দগুলো মানুষের চলার পথকে বহির্জগতের ভূগোল থেকে অন্তর্জগতের মানচিত্রে রূপান্তরিত করেছে। চেনা পথের মধ্যেও অনিশ্চয়তা, অপেক্ষা ও বিপদের যে অনুভব, তা একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিমানসের অভিজ্ঞতা পেরিয়ে সময়ের সামগ্রিক অস্থিরতাকে স্পর্শ করে। ‘শুধু অপেক্ষার কর গুণতে গুণতে পথচলা’—এ উচ্চারণে সময়ের দীর্ঘতা অত্যন্ত অনুভূতিময় হয়ে উঠেছে। এখানে অপেক্ষা ক্রমাগত এগিয়ে চলা জীবনের সঙ্গে যুক্ত এক মানসিক ভার তৈরি করে। ‘উপত্যকাময় গভীর জলের নীচে এক আততায়ী’ এবং ‘বুকের ভেতর দুর্দমনীয় একটা বুলেট বন্দুকে জেগে থাকে’—এ চিত্রকল্প ব্যক্তিগত ভয়ের সঙ্গে সময়ের অদৃশ্য সহিংসতার সম্পর্ক তৈরি করে। বাইরের পৃথিবীর অস্থিরতা যেন এসে আশ্রয় নেয় মানুষের মনন ও মেধায়। ‘শব্দ জমা হয় বুকে’ পঙ্‌ক্তিটি এ ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতম স্তর উন্মোচন করে। উচ্চারিত হতে না-পারা শব্দ, জমে থাকা অভিজ্ঞতা ও সময়ের অনুচ্চারিত ইতিহাস—সব মিলিয়ে হৃদয় হয়ে ওঠে এক স্মৃতিভাণ্ডার।

‘মায়াময় স্নান’ একটি ভিন্নতর অনুভূতির দ্বার খুলে দেয়। কুয়াশা, জল, উষ্ণতা, রোদ, অপেক্ষা ও স্পর্শ—এ সব উপাদানের মধ্য দিয়ে কবি মানসিক ক্লান্তি থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করেছেন। ‘মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কষ্টগুলোকে ধুয়ে ফেলতে’ যে আহ্বানের প্রয়োজন, তা ব্যক্তিগত সম্পর্কের আবেগকে অতিক্রম করে দীর্ঘদিনের জমে থাকা যন্ত্রণার প্রতীক হয়ে ওঠে এবং এখানে স্নান শারীরিক ক্রিয়া থেকে আত্মশুদ্ধি ও পুনর্জন্মের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ‘বুকের অসহ্য যন্ত্রণা উপেক্ষা করে স্নানঘর বিনির্মিত হয়; বাসরঘর!’—এ আকস্মিক রূপান্তর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যক্তিগত ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা ও আশ্রয়ের সঙ্গে নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা যুক্ত হয়েছে।

‘বেহুলা’ ও ‘সর্পদংশন’-এর অনুষঙ্গ ব্যক্তিগত প্রেমকে বাংলা লোক-ঐতিহ্যের দীর্ঘ স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক সময়ের সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে ব্যক্তিমানসের প্রেমের ভেতরেও প্রবেশ করে পুরাণ, লোকবিশ্বাস ও বহুযুগের বাঙালি স্মৃতি। ‘এখনো আমাদের স্নান হয়নি’—এ উচ্চারণে অপেক্ষা আবার ফিরে আসে। সময় এগিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তের পূর্ণতা অধরা থেকে যায়। ‘অলিগলি খুঁজে ফিরি নিজেদের স্নানঘর’—এখানে নিজেদের আশ্রয়, শান্তি ও অন্তরঙ্গতার সন্ধান বৃহত্তর জীবনের অনিশ্চিত পথচলার সঙ্গে মিশে যায়। ফলে কবিতাটির ব্যক্তিগত অনুভূতি আসলে সময়ের একটি অন্তরঙ্গ প্রতিচ্ছবি। প্রেম, অপেক্ষা, ক্ষত, ভয়, আকাঙ্ক্ষা ও আশ্রয়ের অনুসন্ধান—প্রতিটি অনুভূতির ভেতরে সমকালীন মানুষের অস্থির জীবনবোধের ছাপ রয়েছে। কবি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভাষায় এমন এক সময়কে ধারণ করেছেন, যেখানে মানুষ নিরাপদ আশ্রয়, মানসিক প্রশান্তি এবং ভালোবাসার উষ্ণতা খুঁজে চলেছে এবং এ ব্যক্তিগত অনুভূতি বৃহত্তর সময়ের স্পন্দন ধারণ করে কবিতাটিকে মানবিক ও নান্দনিক করেছে।

তাঁর কবিতার শিল্পরীতি তাই অনুভূতি ও নির্মাণের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে- অনুভূতি কবিতার প্রাণ ও ভাষা তার শরীর। অনুভূতি যখন ভাষার যথার্থ অবয়ব লাভ করে, তখন কবিতা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সীমানা অতিক্রম করে শিল্পে পরিণত হয়। তাঁর কবিতায় এ রূপান্তরের প্রক্রিয়া লক্ষ করা যায় এবং তাঁর শব্দের মধ্যে ব্যক্তিগত জীবনের স্মৃতি যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বৃহত্তর মানবিক অস্তিত্বের প্রশ্ন এবং এ দ্বিমুখী প্রবাহ তাঁর কবিতাকে একই সঙ্গে অন্তরঙ্গ ও বিস্তৃত করে।

রাহেল রাজিবের কবিতায় শব্দ অনুভূতির শরীর ধারণ করে এবং অনুভূতি শব্দের ভেতর নতুন জীবন পায়। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিমানুষের নিঃসঙ্গতা, প্রেম ও অপ্রেম, স্মৃতি ও স্বপ্ন, সময়ের অভিঘাত, আত্মজিজ্ঞাসা এবং জীবনের অনিশ্চয়তা এ সব অভিজ্ঞতা এক ধরনের নান্দনিক ঐক্য গড়ে তোলে। সেখানে প্রতিটি শব্দের নিজস্ব আলো ও প্রতিটি নীরবতার নিজস্ব ভাষা রয়েছে, প্রতিটি চিত্রকল্পের ভেতরে লুকিয়ে থাকে অন্য কোনো অনুভবের জগৎ। সে জগৎ পেরিয়ে পাঠক যখন কবিতার গভীরে পৌঁছান, তখন শব্দ শুধু শব্দ থাকে না—তা হয়ে ওঠে বোধের অনুরণন এবং এ অনুরণনে তাঁর কবিতার সৌন্দর্য ও শিল্পসত্তা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

লেখক : রুমা আক্তার, এমফিল গবেষক, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

এই শাখার আরও খবর

পিএইচপিতে গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি, সাইবার হামলার শঙ্কায় বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইট

বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে (PHP) গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের কম্পিউটার সিস্টেমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত হালনাগাদ…

নিজ ফ্ল্যাট থেকে আওয়ামী লীগ নেত্রীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে নিজ ফ্ল্যাট থেকে ডালিয়া আক্তার সুমা (৫০) নামে এক আওয়ামী লীগ নেত্রীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকালে বাস্তা…

ফরিদপুরে বাস-অ্যাম্বুলেন্স সংঘর্ষে নিহত ৩

ওটিএন বাংলা ডেস্ক: ফরিদপুরের মধুখালীতে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে বাস ও অ্যাম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও চারজন। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দুপুর…

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মৃত্যুর ও ধর্ষণের হুমকি সরানোর আহ্বান অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া মৃত্যুর হুমকি ও ধর্ষণের হুমকিমূলক পোস্ট সরিয়ে ফেলার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। দেশটির স্বতন্ত্র…

বাবা থমাস মার্কেলকে ঘিরে শিশু নির্যাতনসামগ্রী রাখার অভিযোগ, মুখ খুললেন মেগান

বাবা থমাস মার্কেল সিনিয়রকে ঘিরে শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও রাখার অভিযোগের তদন্ত শুরুর খবর প্রকাশ্যে আসার পর মুখ খুলেছেন ব্রিটিশ রাজপরিবারের সাবেক সদস্য…

সৌদিতে ৩ শ্রেণির বিদেশির জন্য বিশেষ আবাসন ও স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ

বিদেশি মেধাবী ও প্রতিভাবান ব্যক্তিদের আকৃষ্ট করতে বিশেষ আবাসন কর্মসূচি চালু করেছে সৌদি আরব। ‘গিফটেড রেসিডেন্সি’ নামে এ কর্মসূচির আওতায় তিন শ্রেণির বিদেশি নাগরিক দীর্ঘমেয়াদে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au