বাংলাদেশে ৪৭.২ শতাংশ নারীর বিয়ে ১৮ বছরের আগেই। ছবিঃ ইউনিসেফ
বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ বন্ধ, কিশোরীদের মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করা এবং শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষায় জরুরি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল। তিন দিনের বাংলাদেশ সফর শেষে মঙ্গলবার (২২ অক্টোবর) তিনি এসব বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন। একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ করে বিনিয়োগের সরকারি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিশুদের মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশ সফরের সময় ঢাকার কড়াইল বস্তিতে শিশু ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেন ক্যাথরিন রাসেল। সেখানে তিনি জানতে পারেন, দারিদ্র্য, শিক্ষাজীবনে বিঘ্ন এবং মৌলিক সেবার সীমিত সুযোগ কীভাবে শিশুদের জীবনকে প্রভাবিত করছে। কিশোরীরা নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানানোর পাশাপাশি স্কুল ছেড়ে বাল্যবিবাহে বাধ্য হওয়ার মতো সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের কথাও তুলে ধরে।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক বলেন, মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং তাদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ যেমন উজ্জ্বল হবে, তেমনি উপকৃত হবে তাদের পরিবার, সমাজ ও বাংলাদেশ।
১৮ বছরের আগেই বিয়ে ৪৭.২ শতাংশ নারীর
বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের ব্যাপকতা তুলে ধরে ইউনিসেফ জানিয়েছে, বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই।
বাল্যবিবাহের কারণে বহু কিশোরীর শিক্ষাজীবন থেমে যায়। এর ফলে অল্প বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ে এবং ভবিষ্যতে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ব্যক্তিগত উন্নয়নের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ। পাশাপাশি বাংলাদেশের আইনে যেসব ফাঁকফোকর বাল্যবিবাহের সুযোগ তৈরি করে, সেগুলো বন্ধ করার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।
কড়াইল বস্তিতে কিশোরীদের সঙ্গে কথা বলার সময় ক্যাথরিন রাসেল তাদের আকাঙ্ক্ষা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানতে পারেন। দারিদ্র্য এবং শিক্ষার সুযোগে বাধা কীভাবে তাদের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করছে, তা-ও উঠে আসে আলোচনায়।
ইউনিসেফের মতে, বাল্যবিবাহ বন্ধে শুধু সচেতনতা বৃদ্ধি নয়, মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা, শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং তাদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য ও সুরক্ষাসেবা নিশ্চিত করাও জরুরি।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ
বাংলাদেশ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকেও শিশুদের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরেন ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক। বৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানান ক্যাথরিন রাসেল। তবে শুধু প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না, তা বাস্তবে কার্যকর করতে হবে বলেও গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, “বাজেটই অগ্রাধিকার প্রতিফলিত করে।” শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সুরক্ষায় বিনিয়োগকে বাংলাদেশের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
ইউনিসেফের বক্তব্য অনুযায়ী, শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ তাদের বর্তমান জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশের উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। এ কারণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ করে বিনিয়োগের সরকারি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘রোহিঙ্গা শিশুরা শিক্ষার সুযোগও হারাতে পারে না’
বাংলাদেশ সফরের অংশ হিসেবে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবির পরিদর্শন করেন ক্যাথরিন রাসেল। সেখানে তিনি রোহিঙ্গা শিশু ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত একটি শিক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন করেন।
শিক্ষাকেন্দ্রটিতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনায় শিশুদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতা অর্জনের গুরুত্ব উঠে আসে।
ইউনিসেফ বলেছে, শিক্ষা শুধু শিশুদের জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যম নয়, এটি তাদের শোষণ, মানব পাচার, বাল্যবিবাহ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীতে নিয়োগের ঝুঁকি থেকেও সুরক্ষা দিতে পারে।
ক্যাথরিন রাসেল বলেন, “সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার কারণে রোহিঙ্গা শিশুরা অনেক কিছু হারিয়েছে। তাদের শিক্ষার সুযোগও হারাতে দেওয়া যায় না।”
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা শিশুদের পাশাপাশি তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্যও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিনিয়োগ ও সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
কমছে মানবিক সহায়তার অর্থায়ন, উদ্বেগ ইউনিসেফের
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়ে ক্যাথরিন রাসেল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করেন, মানবিক সহায়তা খাতে অর্থায়ন কমে আসার সময়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় সেবা সচল রাখতে দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কক্সবাজারে ইউনিসেফ ও সহযোগী সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা শিশু ও তাদের পরিবারের জন্য জীবন রক্ষাকারী এবং অন্যান্য জরুরি সেবা দিয়ে থাকে। এসব সেবার মধ্যে শিশুদের সুরক্ষা ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সংস্থাটির মতে, মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে গেলে শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর শিশুদের মৌলিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি, যাতে কোনো শিশুই শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়।
বাংলাদেশ সফর শেষে ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালকের আহ্বানে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে: বাল্যবিবাহ বন্ধ করে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার সুযোগ নিশ্চিত করা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় সেবা অব্যাহত রাখা।
তথ্যসূত্র: ইউনিসেফ