পাবনায় শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টা হুজুরের, মাদ্রাসায় আগুন দিল স্থানীয়রা
ওটিএন বাংলা ডেস্ক : পাবনা সদর উপজেলায় আবাসিক মহিলা মাদ্রাসার এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক আবু ইউসুফকে (৫৫) আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছেন স্থানীয়রা।…
রোববার সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ের অভিজাত এলাকা জুহুতে ফুটবল খেলতে গিয়েছিলেন বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফ। সবুজে ঘেরা এই এলাকায় চলচ্চিত্র তারকাদের বসবাস, ভক্তদের আনাগোনা এবং তারকাদের দেখা পাওয়ার ঘটনা নিত্যদিনের। কিন্তু ফুটবল খেলা শেষে ৩৬ বছর বয়সী এই অভিনেতা যখন নিজের বিএমডব্লিউ গাড়িতে করে মাঠ ছাড়ছিলেন, তখনই গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে এলাকা। হামলায় তাঁর গাড়িচালক আহত হন। আহত হন এক ভ্লগারও, যিনি অভিনেতার ভিডিও ধারণ করতে সেখানে এসেছিলেন।
সিনেমায় জটিল অ্যাকশন দৃশ্য ও বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে রোমাঞ্চকরভাবে বেরিয়ে আসার জন্য পরিচিত টাইগার শ্রফ এবার বাস্তবেই একটি গুলি হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন।
ঘটনার চার দিন পরও ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোর শিরোনামে রয়েছে এই হামলা। তদন্তে নতুন তথ্য সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হচ্ছে নানা তত্ত্ব, পাল্টাপাল্টি দাবি ও সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের নতুন ব্যাখ্যা।
পুলিশ এ ঘটনায় ১০ জনকে আটক বা গ্রেপ্তার করেছে। তদন্তকারীরা বিভিন্ন রাজ্যের মধ্য দিয়ে অস্ত্র সরবরাহের কথিত নেটওয়ার্ক অনুসরণ করছেন। পাশাপাশি হামলাকারীদের অর্থ পরিশোধের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই হামলার পর ভারতের কুখ্যাত গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোইয়ের নামও আবার আলোচনায় এসেছে। হামলার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের এক কথিত সহযোগীর নামে ছড়ানো একটি পোস্টের স্ক্রিনশট সামনে আসে। এতে হামলার দায় স্বীকারের দাবি করা হয়। পরে একটি অডিও রেকর্ডিং ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে অনিল পণ্ডিত নামে পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি একই দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিনেতা সালমান খানের সঙ্গে কথিত যোগাযোগের কারণে টাইগার শ্রফকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। সালমান খানকে দীর্ঘদিন ধরেই হুমকি দিয়ে আসছেন বিষ্ণোই।
তবে মুম্বাই পুলিশ এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি। হামলার পেছনে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের হাত রয়েছে, এমন প্রমাণও এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কে এই হামলার নির্দেশ দিয়েছিল এবং এর উদ্দেশ্য কী, তা নির্ধারণে তদন্ত চলছে।
টাইগার শ্রফের ওপর হামলার ঘটনা বলিউডের আরও কয়েকটি সাম্প্রতিক নিরাপত্তা ঘটনার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। ২০২৪ সালে সালমান খানের বাড়ির বাইরে গুলিবর্ষণ এবং চলতি বছরের শুরুতে চলচ্চিত্র নির্মাতা রোহিত শেঠির বাড়িতে হামলার ঘটনা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
এসব ঘটনায় চলচ্চিত্রশিল্পে সংগঠিত অপরাধী চক্রের প্রভাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ফিরে এসেছে মুম্বাইয়ের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ের স্মৃতি।
১৯৯০-এর দশক ও ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে মুম্বাইয়ের অপরাধজগত বলিউডে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। চলচ্চিত্র নির্মাণে অর্থ জোগানো, চাঁদা আদায় এবং নিজেদের দাবি আদায়ে সহিংসতার আশ্রয় নেওয়া ছিল অপরাধী চক্রগুলোর কর্মকাণ্ডের অংশ। পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান এবং প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের প্রসারের ফলে বহু বছর ধরে এই প্রভাব ধীরে ধীরে কমে আসে।
কিন্তু নতুন হামলা, অভিযোগ ও নানা তত্ত্বের মধ্যে পুরোনো একটি প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে: অপরাধজগত কি আবার বলিউডকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে?
মুম্বাইয়ে সংগঠিত অপরাধের প্রভাব যখন সবচেয়ে বেশি ছিল, তখন এর বিরুদ্ধে কাজ করা ব্যক্তিরা মনে করেন, টাইগার শ্রফের ওপর হামলার ঘটনা দিয়ে এই প্রশ্নের সহজ উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়।
১৯৯৮ সালে মুম্বাই পুলিশের অপরাধ দমন শাখার দায়িত্ব নেওয়া ডি শিবানন্দন সেই সময়ের কথা মনে করেন, যখন দুবাই থেকে একটি ফোনকলই কোনো চলচ্চিত্রের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারত। তখন অনেক কুখ্যাত গ্যাংস্টার দুবাইয়ে অবস্থান করতেন। তাঁদের নির্দেশে ঠিক হতো, কোন সিনেমায় কে অভিনয় করবেন, কে অর্থায়ন করবেন এবং কে পরিবেশনা থেকে লাভবান হবেন।
বেসরকারি অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল চলচ্চিত্রশিল্পে বিনিয়োগকারী ও চাঁদাবাজের মধ্যকার সীমারেখা অনেক সময় অস্পষ্ট হয়ে যেত। হুমকিগুলোও ছিল বাস্তব।
১৯৯৭ সালে মুম্বাইয়ের একটি মন্দিরের বাইরে গুলি করে হত্যা করা হয় সংগীত প্রযোজক গুলশন কুমারকে। এর তিন বছর পর চলচ্চিত্র নির্মাতা রাকেশ রোশনও হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে যান।
শিবানন্দন সালমান খান অভিনীত চোরি চোরি চুপকে চুপকে চলচ্চিত্রের অর্থায়নসংক্রান্ত একটি মামলার তদন্ত করেছিলেন। ওই মামলায় চলচ্চিত্রটির প্রযোজক ও তাঁর সহকারীকে অপরাধী চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার দায়ে মহারাষ্ট্রের সংগঠিত অপরাধবিরোধী আইনে ছয় বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। চলচ্চিত্রটির অর্থদাতাকে ওই সম্পর্কের তথ্য গোপন করার দায়ে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
পুলিশ সিনেমাটির নেগেটিভ জব্দ করেছিল। পরে আদালতের তত্ত্বাবধানে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়।
শিবানন্দনের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, অপরাধী চক্রগুলো সব সময় অনিচ্ছুক চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ওপর নিজেদের প্রভাব চাপিয়ে দিত না। অনেক নির্মাতাই স্বেচ্ছায় তাদের কাছ থেকে অর্থ নিতেন। এসব ব্যবস্থায় উভয় পক্ষই লাভবান হতো। ফলে পুলিশি অভিযানের মাধ্যমে এমন সম্পর্ক ভেঙে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ত।
তবে সাম্প্রতিক সহিংসতাকে মুম্বাইয়ের সেই পুরোনো মাফিয়াদের প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখতে নারাজ শিবানন্দন।
তিনি বলেন, ‘গত ৬০ বছরে আমরা মুম্বাইয়ের যে মাফিয়াদের চিনি, এটি সেই মাফিয়া নয়। এটি অন্য কিছু।’
তাঁর সময়ে যেসব অপরাধীকে তিনি মোকাবিলা করেছেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন দাউদ ইব্রাহিম, ছোটা শাকিল ও অরুণ গাওলি। তাঁদের অপরাধী নেটওয়ার্কের শিকড় ছিল মুম্বাইয়ে, যদিও তাঁদের অনেক নেতা বিদেশ থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের নাম অপরাধজগতের নতুন এক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। উত্তর ভারতে শিকড় থাকা এই গ্যাংস্টার বহু বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন। তা সত্ত্বেও তাঁকে ঘিরে এমন এক আতঙ্কের ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, যেন কারাগারে থেকেও তিনি বিভিন্ন মহাদেশে অবস্থানরত বন্দুকধারীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হুমকি ও হামলার দায় স্বীকারের দাবিতেও প্রায়ই তাঁর নাম উঠে আসে।
১৯৯৮ সালের একটি কৃষ্ণসার হরিণ শিকার মামলাকে কেন্দ্র করে সালমান খানকে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছেন বিষ্ণোই। কৃষ্ণসার হরিণ বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে পবিত্র বলে বিবেচিত।
২০২৪ সালের এপ্রিলে সালমান খানের মুম্বাইয়ের বাড়ির বাইরে পাঁচটি গুলি ছোড়েন বন্দুকধারীরা। এর ছয় মাস পর সালমান খান ও অন্য অভিনেতাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত রাজনীতিক বাবা সিদ্দিকিকে হত্যা করা হয়।
মুম্বাই পুলিশ এই দুই হামলার সঙ্গে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের যোগসূত্র পেয়েছে। তবে বাবা সিদ্দিকি হত্যাকাণ্ডে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বিষ্ণোইয়ের নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে আনা কিছু অভিযোগ পুলিশের তদন্তে সমর্থন পেয়েছে, আবার কিছু অভিযোগ এখনো যাচাই করা হয়নি। কিন্তু গ্যাংটি বাস্তবে যা করেছে এবং তার নামে যেসব দাবি ছড়ানো হচ্ছে, জনমনে অনেক সময় সেই দুইয়ের পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে যায়। এতে বিষ্ণোইয়ের কুখ্যাতি আরও বাড়ছে।
মুম্বাই পুলিশের সাবেক কমিশনার রাকেশ মারিয়া বিষ্ণোইকে গ্যাংস্টারদের নতুন প্রজন্মের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এই প্রজন্মের অপরাধীরা আগের তুলনায় প্রযুক্তি ব্যবহারে বেশি দক্ষ এবং আন্তর্জাতিকভাবে বেশি সংযুক্ত।
গত বছর দ্য প্রিন্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মারিয়া বলেন, পুরোনো অপরাধী চক্রগুলো ছিল দৃশ্যমান এবং নির্দিষ্ট এলাকার ওপর নির্ভরশীল। নতুন চক্রগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে, দ্রুত নিজেদের অবস্থান ও কার্যক্রম বদলায়। ফলে তাদের শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
তাঁর ভাষায়, ‘এখন কোনো শহরকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অপরাধীদের সেই শহরেই বসবাস করতে হয় না।’
অপরাধী চক্র ও বলিউডের সম্পর্কের আরেকটি পরিবর্তন এসেছে গ্যাংস্টারদের ভাবমূর্তি তৈরির ক্ষেত্রে।
১৯৯০-এর দশকে বলিউডের চলচ্চিত্রই মুম্বাইয়ের ভয়ংকর অপরাধীদের জনমনে আকর্ষণীয় ও রহস্যময় চরিত্র হিসেবে তুলে ধরতে ভূমিকা রেখেছিল। সত্যা (১৯৯৮) ও কোম্পানি (২০০২)-এর মতো চলচ্চিত্রে অপরাধজগতের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরা হয়। সত্যা চলচ্চিত্রে ভিকু মাত্রের চরিত্রে মনোজ বাজপেয়ীর অভিনয় বিশেষভাবে আলোচিত হয়।
চলচ্চিত্রবিষয়ক গবেষক অশ্বিন ইমানুয়েল দেবসুন্দরমের ভাষায়, চরিত্রটি একপর্যায়ে কিংবদন্তির মর্যাদা পায় এবং সাংস্কৃতিকভাবে শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়।
দেবসুন্দরম বিবিসিকে বলেন, সেই সময়ের ভয় ও মুগ্ধতা মানুষের সম্মিলিত স্মৃতিতে গভীরভাবে গেঁথে রয়েছে।
প্রতিবার নতুন কোনো হামলার ঘটনা ঘটলে সেই স্মৃতি আবার ফিরে আসে। তবে বর্তমান সময়ের গ্যাংস্টারদের নিজেদের ভাবমূর্তি তৈরির জন্য আর সিনেমার ওপর নির্ভর করতে হয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তারা নিজেরাই হুমকি, হামলার দায় স্বীকারের দাবি এবং পরিকল্পিতভাবে তোলা ছবি ছড়িয়ে দিতে পারে। আর এসব বার্তা মুম্বাইয়ের বাইরেও মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
সর্বশেষ হামলার পর সালমান খান ও রোহিত শেঠির বাড়ির বাইরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়।
অল ইন্ডিয়ান সিনে ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন চলচ্চিত্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি প্রশ্ন তুলেছে, ‘আজ টাইগার শ্রফ। এরপর কার পালা?’
এখন পর্যন্ত এমন কোনো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে অপরাধী চক্রগুলো বলিউডের অর্থায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর আগের মতো প্রভাব ফিরে পেয়েছে। তবে সাম্প্রতিক হামলাগুলো চলচ্চিত্রশিল্পের নিরাপত্তার একটি ভিন্ন দুর্বলতা সামনে এনেছে।
কোনো শিল্পকে অস্থির করে তুলতে অপরাধীদের সেই শিল্পের পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। একটি গুলি হামলার চেষ্টা, যা মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের মুঠোফোনের পর্দায় ছড়িয়ে পড়ে, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর বাইরেও ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে।
মুম্বাইয়ের গ্যাংস্টারদের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর কাজ করা ডি শিবানন্দন জানেন, কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে শক্ত বর্মেও সব সময় কোথাও না কোথাও ফাটল থাকে।’
সূত্র:বিবিসি
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au