বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। ছবিঃ সংগৃহীত
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর (৮৭) মরদেহ মৃত্যুর প্রায় ১২ ঘণ্টা পরও দাফন করা যায়নি। পিরোজপুরে তাঁর মরদেহ দাফনে জামায়াতের নেতাকর্মীরা বাধা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছে পরিবার। শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাতে তাঁর মরদেহ পিরোজপুর পুলিশ লাইনসের ভেতরে একটি ফ্রিজিং গাড়িতে রাখা ছিল। পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহ নিজ গ্রামে দাফনের বিষয়ে প্রশাসন আলোচনা চালাচ্ছে। এদিকে পুলিশ লাইনসের বাইরে জামায়াতের নেতাকর্মীদের অবস্থান দেখা গেছে।
পরিবারের অভিযোগ, মানিক পশারীর মরদেহে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার প্রস্তুতির সময় জামায়াতের স্থানীয় নেতারা বাধা দেন। এ কারণে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় তাঁদের। পরে শনিবার বিকেল ৫টার দিকে পুলিশ লাইনসের ভেতরে গোপনে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। তবে এরপরও মরদেহ দাফনের বিষয়ে সমাধান হয়নি।
মানিক পশারী পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ১০টার দিকে গোপালগঞ্জে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। গত দুই মাস ধরে তিনি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি পিরোজপুরের নিজ এলাকায় থাকছিলেন না। এ সময় গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের ও জামাতার কাছে আশ্রয়ে ছিলেন।
মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ পিরোজপুরে নিয়ে আসেন পরিবারের সদস্যরা। দুপুর ১২টার দিকে তাঁরা মরদেহ নিয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে যান। সেখানে গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা বলা হলেও বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন মানিক পশারীর জামাতা ফারুক হোসেন।
তিনি বলেন, “সকাল ১০টায় তিনি মারা যান। দুপুর ১২টার দিকে মরদেহ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আসি। গার্ড অব অনার দেওয়ার কথা বলে আমাদের বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। একজন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ সাধারণ অ্যাম্বুল্যান্সে বরফ ছাড়াই এতক্ষণ রাখতে হয়েছে। দাফনের বিষয়ে প্রশাসন আমাদের কোনো দায়িত্ব নেয়নি। আমরা এখন দাফন নিয়ে চিন্তিত।”
অন্যদিকে, পিরোজপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক মানিক পশারীকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেছেন। তিনি বলেন, তাঁকে কোনোভাবেই পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে দেওয়া হবে না।
শনিবার রাত ১০টার দিকে পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, মানিক পশারীর মরদেহ তখনো পুলিশ লাইনসের ভেতরে ফ্রিজিং গাড়িতে রাখা ছিল। নিজ বাড়িতে তাঁর মরদেহ দাফনের বিষয়ে প্রশাসন চেষ্টা চালাচ্ছে।
ওসি আরও বলেন, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও জামায়াতের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহের গার্ড অব অনার ও দাফন নিয়ে এ বিরোধ তৈরি হওয়ায় পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। প্রশাসন আলোচনা চালালেও শনিবার রাত পর্যন্ত মরদেহ দাফনের বিষয়ে সমাধান হয়নি। এখন মরদেহের সম্মানজনক দাফন নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে রয়েছে পরিবার।