সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সরকারের কূটনৈতিক ভূমিকা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে প্রবাসী অধিকার সংগঠন। বিদেশে বিচারের মুখোমুখি হওয়া বাংলাদেশিদের জন্য পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা এবং প্রবাসী কর্মীদের জীবন, মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
রোববার (২৫ অক্টোবর) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধন থেকে এসব দাবি জানানো হয়। ‘প্রবাসী বাংলাদেশি অধিকার সংস্থা’ (প্রবাস) আয়োজিত এ কর্মসূচি শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়।
গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কায় নাজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সুইটি আক্তার নামের দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে ঢাকাকে এ বিষয়ে জানানো হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের আইনি সুরক্ষা এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোর দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে সৌদি কর্তৃপক্ষ জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কাছে প্রায় আড়াই হাজার বাংলাদেশি বন্দি ও আটক ব্যক্তির একটি তালিকা পাঠায়। তালিকাটি গত ২৪ অক্টোবর প্রকাশ্যে আসে। এতে দণ্ডিত হিসেবে চিহ্নিত ২২ জন বাংলাদেশির নাম ছিল, যাঁদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ওই দুই ব্যক্তিও রয়েছেন। তবে তালিকায় তাঁদের রায় ও সাজার বিস্তারিত উল্লেখ ছিল না। বাকি ২০ জনের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা-ও স্পষ্ট নয়।
এদিকে, গত ২০ অক্টোবর জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আঞ্চলিক কার্যালয়ে একটি কূটনৈতিক চিঠি পাঠিয়ে ওই ব্যক্তিদের রায় ও সাজার বিস্তারিত জানতে চেয়েছিল।
মানববন্ধনে প্রবাসী বাংলাদেশি অধিকার সংস্থার নেতা মোস্তফা মোনন বলেন, প্রবাসী কর্মীরা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও তাঁদের প্রাপ্য সুরক্ষা ও স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। লাখ লাখ প্রবাসী কর্মী দেশে অর্থ পাঠিয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখছেন। তাঁদের প্রতি সরকারের দায়িত্ব রয়েছে এবং তাঁদের বিষয়ে আরও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখানো প্রয়োজন।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বিদেশে তাঁদের বিরুদ্ধে চলা আইনি কার্যক্রম সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মিশনের অবগত থাকার কথা ছিল। এ ক্ষেত্রে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। তাঁরা আইনের বাইরে কোনো দাবি করছেন না, বরং বিচারপ্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছিল কি না, সেটি জানতে চান বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
স্কলারো রিসার্চ সাপোর্ট অ্যান্ড কনসালটেন্সির প্রধান গবেষক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. তৃণা ইসলাম সৌদি আরবে আটক বাংলাদেশিরা পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা পাচ্ছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর প্রশ্ন, যথাযথ আইনি সহায়তা দেওয়া হয়ে থাকলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সাধারণ মানুষকে কেন জানানো হয়নি? তাঁদের সুরক্ষায় আগেই কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষায় সরকারের প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার করাই তাঁদের উদ্দেশ্য। তাঁরা সরকারের বিরোধিতা করতে চান না, বরং প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চান।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন আশরাফুল আলম সুমনও। তিনি সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় ধারাবাহিক সরকারগুলোর ভূমিকার সমালোচনা করেন। ২০১৫ সালে নারী গৃহকর্মী পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে হওয়া নিয়োগব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সে সময় মাসে ৮০০ সৌদি রিয়াল বেতনে নারী গৃহকর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, এরপর থেকে অনেক নারী নির্যাতন ও শোষণের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন।
আশরাফুল আলম সুমন বলেন, কোন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, কোন নিয়োগকর্তার কাছে এবং কী ধরনের কাজের জন্য কর্মীদের বিদেশে পাঠানো হচ্ছে, সে বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। প্রবাসীদের কাছ থেকে রেমিট্যান্স আশা করলেই হবে না, তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া স্মারকলিপিতে প্রবাসীদের জন্য ২৪ ঘণ্টা চালু জরুরি হটলাইন, আইনি সহায়তা, স্বচ্ছ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং বিদেশে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় স্বাধীন তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি বেতন আত্মসাৎ, অতিরিক্ত নিয়োগ ব্যয় আদায়, পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া এবং চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বিদেশে আটকে পড়া কর্মীদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র ও দেশে ফেরার সহায়তা নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি। এসব দাবি বাস্তবায়নে ১৫ দিনের মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ, ৩০ দিনের মধ্যে কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ এবং ৯০ দিনের মধ্যে অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি অগ্রগতির প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সংগঠনটির মতে, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অর্থনৈতিক অবদানের যথাযথ মূল্যায়নের পাশাপাশি তাঁদের আইনি অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় সরকারের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। বিদেশে কোনো বাংলাদেশি বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হলে তাঁর আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা এবং গুরুতর পরিস্থিতিতে পরিবারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সময়মতো অবহিত করাও জরুরি।