ঢাকার মোহাম্মদপুরে এক ব্যবসায়ীকে আটকে রেখে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, মারধর ও অপহরণের অভিযোগে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) দুই সদস্যসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে সেনাবাহিনীর লজ এরিয়া সিকিউরিটিতে সংযুক্ত এক সেনাসদস্য এবং একজন আনসার সদস্যও রয়েছেন। রোববার (২৫ অক্টোবর) তাঁদের আদালতে হাজির করা হলে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক।
ঘটনাটি ঘটে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার অধীন চন্দ্রিমা মডেল টাউনের ৬ নম্বর সড়কের ১৭ নম্বর বাড়িতে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর নাম মোহাম্মদ শরীফ। অভিযোগ অনুযায়ী, মোটরসাইকেল কেনার কথা বলে তাঁকে একটি বাসায় ডেকে নিয়ে আটকে রাখা হয়। পরে তাঁর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। একপর্যায়ে তাঁকে মারধর করে মোটরসাইকেল কেনার জন্য সঙ্গে আনা ৭০ হাজার টাকা নিয়ে নেওয়া হয়।
মামলার এজাহার ও আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, শরীফ মোটরসাইকেল কেনাবেচার ব্যবসা করেন। রাজধানীর ভাষানটেক এলাকায় তাঁর পরিচিত আনসার সদস্য সোহেল রানার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। শনিবার রাতে সোহেল রানার আমন্ত্রণে মোটরসাইকেল কেনার উদ্দেশ্যে চন্দ্রিমা মডেল টাউনে যান শরীফ।
সেখানে একটি আবাসিক ভবনের ষষ্ঠ তলার একটি ফ্ল্যাটে তাঁকে নিয়ে যান সোহেল। কিছুক্ষণ পর শৌচাগারে যাওয়ার কথা বলে সোহেল ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যান। এর কিছুক্ষণ পর ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন সার্জেন্ট মোহাম্মদ আল মামুন, ল্যান্স করপোরাল মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, নিরাপত্তাকর্মী মুকুল গাজী ও সোনিয়া নামের এক নারী।
অভিযোগে বলা হয়েছে, তাঁরা শরীফকে ফ্ল্যাটে আটকে রেখে ১০ লাখ টাকা দাবি করেন। তাঁর কাছে থাকা ৭০ হাজার টাকা দিয়ে মুক্তি পেতে চাইলেও অভিযুক্তরা তাতে সন্তুষ্ট হননি। পরে তাঁকে মারধর করা হয়। এতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পান তিনি। এরপরও তাঁর কাছে বাকি টাকা দাবি করা হয়।
এজাহার অনুযায়ী, শরীফ পরিবারের সদস্যদের ফোন করে টাকা সংগ্রহের চেষ্টা করেন। পরে রাত আনুমানিক ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে তাঁকে নিচে নামিয়ে একটি সাদা টয়োটা প্রোবক্স গাড়িতে তোলা হয়। গাড়িতে মাহফুজুর রহমান ও জিয়াউল ইসলাম নামের আরও দুই ব্যক্তি ছিলেন।
গাড়িটি শ্যামলীতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের বিপরীত পাশের একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শরীফকে আটকে রাখা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা চা পান করতে গাড়ি থেকে নামেন। এ সময় কাছাকাছি পুলিশের গাড়ি দেখতে পেয়ে শরীফ গাড়ি থেকে নেমে পুলিশের কাছে গিয়ে তাঁকে অপহরণ ও আটকে রাখার অভিযোগ জানান।
পুলিশের সহায়তা চাওয়ার পর শেরেবাংলা নগর থানা-পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আল মামুন, নুরুজ্জামান, মুকুল গাজী, মাহফুজুর রহমান ও জিয়াউল ইসলামকে আটক করে। পরে মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাসেল ইসলাম তাঁদের হেফাজতে নেন। জিয়াউল ইসলামের চালানো সাদা টয়োটা প্রোবক্স গাড়িটিও জব্দ করা হয়।
এ ঘটনায় আনসার সদস্য সোহেল রানাকেও গ্রেপ্তার করে মোহাম্মদপুর থানা-পুলিশ। সব মিলিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ডিজিএফআইয়ের দুই সদস্য রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, শনিবার রাতে শ্যামলী শিশুমেলা এলাকায় নিয়মিত পুলিশি তল্লাশিচৌকি পরিচালিত হচ্ছিল। রাত আনুমানিক ২টা ৪৫ মিনিটে এক ব্যক্তি গাড়ি থেকে নেমে পুলিশের কাছে সহায়তা চান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে থাকা পাঁচজনকে আটক করে এবং প্রাথমিকভাবে অপহরণের ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারে। ঘটনাটি মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় শুরু হওয়ায় আটক ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়।
ভুক্তভোগী শরীফ শনিবার মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন। মামলায় আটজনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মারধর ও অপহরণের অভিযোগ আনা হয়েছে।
রোববার গ্রেপ্তার ছয়জনকে ঢাকার একজন মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। ঢাকা মহানগর হাকিম আশরাফুল হক তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এ ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের কোনো কর্মকর্তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও তাঁরা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মামলার অভিযোগ ও প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাটি তদন্তাধীন। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের দোষী হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ