ঢাকায় ইজতেমায় পাকিস্তান থেকে আসছেন শীর্ষ ধর্মীয় নেতারা। ছবিঃ সংগৃহীত
পাকিস্তানভিত্তিক আন্তর্জাতিক ইসলামি সংগঠন দাওয়াতে ইসলামী আগামী ১৮ থেকে ২০ নভেম্বর ঢাকায় তিন দিনব্যাপী ‘সুন্নাহ-অনুপ্রাণিত ইজতেমা’ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে উত্তরা সেন্টার মেট্রোরেল স্টেশনের কাছের একটি মাঠে এ সমাবেশ হওয়ার কথা রয়েছে। আয়োজকদের প্রচারমূলক ঘোষণা অনুযায়ী, এতে পাকিস্তান থেকে সংগঠনটির কয়েকজন শীর্ষ ধর্মীয় নেতা ও প্রতিনিধি অংশ নেবেন।
ঘোষণায় অতিথি বক্তা হিসেবে যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আলহাজ উবাইদ রেজা আত্তারি, হাজি ইমরান আত্তারি, হাজি আবদুল হাবিব আত্তারি ও হাজি আলী আত্তারি। উবাইদ রেজা আত্তারিকে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াস কাদরির আধ্যাত্মিক উত্তরসূরি বা ‘খলিফা’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। হাজি ইমরান আত্তারি সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। হাজি আবদুল হাবিব আত্তারি ও হাজি আলী আত্তারি ওই পরিষদের সদস্য।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, তিন দিনের এই সমাবেশে কয়েক দশ হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ অংশ নেবেন। এতে ইসলামি নৈতিকতা, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ, আত্মশুদ্ধি, আধ্যাত্মিক উন্নয়ন ও সামাজিক কল্যাণের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা ও ধর্মীয় বয়ান অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে অংশগ্রহণকারীর সম্ভাব্য সংখ্যা এবং ঘোষিত অতিথিদের উপস্থিতির বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ধর্মীয় যোগাযোগের ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন, পররাষ্ট্রসম্পর্ক ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটে। প্রতিবেদনের দাবি, এর আগে ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে পাকিস্তানের বিশিষ্ট ধর্মীয় নেতা ও প্রতিনিধিদের বাংলাদেশ সফরে ভিসা যাচাইসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হতো। ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতির ফলে পাকিস্তানভিত্তিক ধর্মীয় সংগঠনগুলোর বাংলাদেশে যোগাযোগ ও কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ বেড়েছে।
বাংলাদেশে বৃহৎ ইসলামি সমাবেশের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। টঙ্গীতে তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমা দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে পরিচিত। হজের পর মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সমাবেশ হিসেবেও বিশ্ব ইজতেমার পরিচিতি রয়েছে। তবে তাবলিগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং বাংলাদেশ-ভারত ও পাকিস্তানকেন্দ্রিক বিভিন্ন ধারার বিরোধের কারণে সংগঠনটির কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে দাওয়াতে ইসলামীর মতো অন্য ধর্মীয় সংগঠনগুলো নিজস্ব অনুসারীদের নিয়ে সমাবেশ আয়োজন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তারের চেষ্টা করছে। দাওয়াতে ইসলামী সুন্নি ইসলামের বেরেলভি ধারার অনুসারী। এ ধারায় সুফিবাদী ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক অনুশীলন এবং ধর্মীয় শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সংগঠনটি ধর্মীয় প্রচার, নৈতিক শিক্ষা ও মাদ্রাসাভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। এর কার্যক্রমের মধ্যে মাদানি চ্যানেল এবং মাদরাসাতুল মদিনার নাম উল্লেখযোগ্য।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশের অনুসারীদের সরাসরি যোগাযোগ বাড়লে স্থানীয় ধর্মীয় ও সামাজিক পরিমণ্ডলে তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে এ ধরনের সমাবেশ থেকে বৃহত্তর রাজনৈতিক বা আদর্শিক পরিবর্তন ঘটবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। এ বিষয়ে মূল্যায়নের জন্য সংগঠনটির কার্যক্রম, স্থানীয় পর্যায়ে এর বিস্তার এবং সমাবেশ-পরবর্তী উদ্যোগ পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
বাংলাদেশে পাকিস্তানি ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সফরের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেও আসন্ন ইজতেমাকে দেখা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সাবেক ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী সৈয়দ হামিদ সৈয়দ কাজমি ২০২৬ সালের মার্চের শেষ দিকে বাংলাদেশ সফর করেন। পাকিস্তানের মুলতানভিত্তিক প্রভাবশালী সুন্নি বেরেলভি ধর্মীয় নেতা হিসেবে পরিচিত কাজমি ওই সফরে চট্টগ্রামের কয়েকটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বৈঠক ও ধর্মীয় বক্তব্য দেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হাটহাজারীর চিপাতলী কামিল মাদ্রাসার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
নর্থইস্ট নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাজমির ১০ দিনের সফরসূচির ওপর নিরাপত্তা সংস্থাগুলো নজর রেখেছিল। পাকিস্তানি ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যক্তিত্বদের বাংলাদেশ সফরে আগের বিধিনিষেধের পর এটিকে গুরুত্বপূর্ণ সফরগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে সফরসংক্রান্ত এসব তথ্যও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
দিয়াবাড়িতে ইজতেমার প্রস্তুতি এগিয়ে চলার মধ্যে আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকেরা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ধর্মীয় যোগাযোগ বৃদ্ধির সম্ভাব্য প্রভাবের দিকে নজর রাখছেন । আসন্ন সমাবেশটি দাওয়াতে ইসলামীর বাংলাদেশে সাংগঠনিক উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এর মাধ্যমে বৃহত্তর রাজনৈতিক বা আদর্শিক পুনর্বিন্যাস ঘটছে কি না, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ