রিয়াদ বিমানবন্দরে আবারও হামলার দাবি হুতিদের। ছবিঃ সংগৃহীত
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পাম্পিং স্টেশনগুলোতে ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। এসব হামলার জবাবে ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ বিভিন্ন এলাকায় সামরিক অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। জোটের দাবি, অভিযানে হুতিদের দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ মঞ্চ ধ্বংস করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ সুড়ঙ্গ, অস্ত্রাগার ও সামরিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা এবং ইয়েমেনে প্রতিপক্ষের সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে হামলার দাবি করেন। তবে এসব হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না এবং সৌদি আরবের বিমানবন্দর বা তেল অবকাঠামোয় হামলার সুনির্দিষ্ট প্রভাব কী, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি জানান, রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় ব্যবহৃত একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ মঞ্চ ইয়েমেনের রাজধানী সানায় জোটের অভিযানে ধ্বংস করা হয়েছে। তাঁর দাবি, হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা কমানো এবং তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সৌদি জোটের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, হুতিদের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং তাদের রসদ সরবরাহের পথ বন্ধ করার লক্ষ্যে ইয়েমেনে একাধিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। জোটের দাবি অনুযায়ী, এসব অভিযানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণের পাঁচটি সুড়ঙ্গ, চারটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ মঞ্চ এবং একটি অস্ত্রাগার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এ ছাড়া হুতিদের সামরিক সরঞ্জাম, সামনের সারির অবস্থান ও অন্যান্য সামরিক স্থাপনাতেও হামলা চালানো হয়েছে।
অন্যদিকে, হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, সৌদি আরবের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের বেশ কয়েকটি পাম্পিং স্টেশন লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তবে এসব স্থাপনায় হামলার দাবি সৌদি কর্তৃপক্ষ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। পাম্পিং স্টেশনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না কিংবা দেশটির তেল পরিবহন ও রপ্তানিতে কোনো বিঘ্ন ঘটেছে কি না, সে বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইয়াহিয়া সারি আরও দাবি করেন, সৌদি আরবের খামিস মুশাইত এলাকার কিং খালিদ বিমানঘাঁটি এবং জাজানের একটি নৌঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে হুতিরা। পাশাপাশি ইয়েমেনের এডেন গভর্নরেটের সালাহ আল-দিন এবং লাহিজ গভর্নরেটের আল-ওয়াহাত এলাকায় প্রতিপক্ষের সামরিক অবস্থান ও অস্ত্রাগার লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এসব হামলায় হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনের বিভিন্ন প্রদেশে অন্তত ৫৬টি বিমান হামলা চালানোর জন্য সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটকে অভিযুক্ত করেছে হুতিরা। তাদের দাবি, হোদেইদাহ, লাহিজ, আমরান, সাআদা, আল-জাউফ, তাইজ ও ইব্বসহ একাধিক এলাকায় এসব হামলা চালানো হয়েছে। তবে হামলার সংখ্যা, লক্ষ্যবস্তু এবং ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে জোটের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
রিয়াদের বিমানবন্দরকে ঘিরে সর্বশেষ এই উত্তেজনার পটভূমিতে রয়েছে সাম্প্রতিক কয়েক দফা হামলা। চলতি মাসের শুরুর দিকে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হুতিদের হামলার পর বিমানবন্দরটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়। দুই সপ্তাহের বিরতির পর রোববার সেখানে আবার ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়। বিমানবন্দর পুনরায় চালুর পরদিনই নতুন করে হামলার দাবি সামনে এল।
ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সংঘাত দীর্ঘদিনের। ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দেশটিতে সংঘাত তীব্র হয়। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট দেশটিতে হস্তক্ষেপ করে। এরপর থেকে ইয়েমেনে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, বিমান হামলা ও পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে। সংঘাতের প্রভাব ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়েছে।
সৌদি আরবের তেল পরিবহন অবকাঠামোয় হামলার দাবি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক হওয়ায় এর জ্বালানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের ক্ষতি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। তবে সর্বশেষ ঘটনায় পাম্পিং স্টেশনগুলোর ক্ষয়ক্ষতি কিংবা তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।
রিয়াদ বিমানবন্দর, বিমানঘাঁটি, নৌঘাঁটি এবং তেল পরিবহন অবকাঠামোকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি হামলার দাবিতে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সংঘাত নতুন করে উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের কথা বলছে, অন্যদিকে হুতিরা সৌদি ভূখণ্ডের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার দাবি করছে। এসব হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তার ওপর প্রভাব এবং আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হবে।
সূত্র: আল জাজিরা