পাবনায় বজ্রপাতে শিশুসহ ৬ জনের মৃত্যু
পাবনার সদর উপজেলায় বজ্রপাতে শিশুসহ ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও দুজন গুরুতর আহত হয়েছেন। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে উপজেলার মালঞ্চি ইউনিয়নের সোনাপাতির বিলে এ…
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর বিদেশি হস্তক্ষেপ ও ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর দল লিকুদ পার্টি। আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোটারদের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করে প্রত্যাখ্যান করেছে সংশ্লিষ্ট দলগুলো। বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের অভিযোগ, নির্বাচনের ফলাফলকে অবৈধ প্রমাণ করে রাজনৈতিক সমঝোতার পথ বন্ধ করতেই এমন প্রচারণা চালাচ্ছেন নেতানিয়াহু।
ইসরায়েলের সাম্প্রতিক পার্লামেন্ট নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ১২০ সদস্যের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। চূড়ান্ত ফলাফলে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন।
নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন দুটি রাজনৈতিক দল জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেয়েছে, যা তাদের জন্য ঐতিহাসিক সাফল্য। আরব ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। ফলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে এই দল দুটি এখন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরপরই আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে বিদেশি অর্থায়ন ও ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ সামনে আনে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি। কাতার ও তুরস্ক থেকে এসব দল অবৈধ অর্থ পেয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেইত।
তবে অভিযোগের বিষয়ে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দেশটি এসব অভিযোগকে হাস্যকর ও বিপজ্জনক বলে অভিহিত করেছে। একই সঙ্গে কাতারকে জড়িয়ে ইসরায়েলি রাজনীতিকেরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছে দোহা।
নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তদন্তের বিষয়টি সামনে আসে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির (সিইসি) প্রধানের শিন বেইতের কাছে তদন্তের অনুরোধ জানানোর পর। বৃহস্পতিবার লিকুদ পার্টি অভিযোগ করে, আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের অর্থ বা অন্য সুবিধা দিয়ে প্রভাবিত করা হয়েছে।
তবে জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম উভয় দলই এ অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। জয়েন্ট লিস্টের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সমালোচকেরা পুরো ঘটনাকে তাঁর ক্ষমতা ধরে রাখার রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে বিদেশি অর্থায়ন ও ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে দলগুলোর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছেন নেতানিয়াহু।
এর পেছনে বিরোধীদের রাজনৈতিক হিসাবও রয়েছে। নির্বাচনের ফলাফলে আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে ১৩ আসন পিছিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, আরব দলগুলোর ১৯টি আসন রয়েছে। ফলে এসব দলের সমর্থন পেলে বিরোধী জোটের পক্ষে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সম্ভব।
এ অবস্থায় আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তাদের সঙ্গে আইজেনকটের সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমঝোতা বাধাগ্রস্ত করাই নেতানিয়াহুর উদ্দেশ্য বলে মনে করছেন বিরোধী নেতারা।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির কাছে অভিযোগ করা হয়েছিল, আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে কাতার অর্থায়ন করেছে। তবে কাতার সরকার এ অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
নেতানিয়াহু ও তাঁর দল লিকুদ পার্টি অভিযোগের ঘটনাকে রাজনৈতিক ভূমিকম্প এবং গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের দাবি, ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে।
তবে শিন বেইত জানিয়েছে, বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগে তদন্ত চালানো হলেও এর অর্থ এই নয় যে বৈধভাবে ভোট দেওয়া ইসরায়েলের পুরো আরব জনগোষ্ঠীকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডিন লিভনে জানিয়েছেন, নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়ায় পদ্ধতিগত কোনো লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তদন্তের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পর বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট বলেন, প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে কিংবা আদৌ কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি।
তবে তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনের ফলাফলকে অবৈধ প্রমাণ করতে নেতানিয়াহু সুপরিকল্পিত প্রচারণা চালাচ্ছেন। জনগণের ভোটের রায় মেনে নেওয়ার পরিবর্তে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন তিনি।
জয়েন্ট লিস্টের শরিক দল বালাদের চেয়ারম্যান সামি আবু শেহাদেহও নেতানিয়াহুর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তিনি বলেন, নির্বাচনে পরাজিত পক্ষ বর্ণবাদী মিথ্যা অভিযোগ তৈরি করছে। নির্বাচনের ফলাফল উল্টে দিতে নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহার করার আহ্বানও জানানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নির্বাচনের আগে ও ভোটের দিন আরব ভোটারদের নিয়ে ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন নেতানিয়াহু। নির্বাচনের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, আরব ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি ইসরায়েলের ডানপন্থীদের জন্য চরম জরুরি পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তাঁর ভাষায়, এটি ডানপন্থীদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন।
ডানপন্থী সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে আনতে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি আরব ভোটারদের ছবিও প্রকাশ করেন। এসব ছবি ও বক্তব্যের মাধ্যমে আরব ভোটারদের উপস্থিতিকে ডানপন্থী রাজনীতির জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।
নির্বাচনের পর আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোট কারচুপি ও বিদেশি অর্থায়নের অভিযোগ সামনে আসায় নেতানিয়াহুর আগের বক্তব্যগুলোও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। তাঁদের অনেকেই নিজেদের ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন। দেশটির রাজনীতি, সামাজিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় তাঁদের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়।
বহু বছর ধরে ইসরায়েলের আরব জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ পার্লামেন্ট নির্বাচন বর্জন করে আসছিল। তাঁদের অনেকের যুক্তি ছিল, নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়া হয়, যেখানে তাঁদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে এবারের নির্বাচনে সেই অবস্থানে পরিবর্তন দেখা গেছে। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্য নিয়ে আরব ভোটারদের একটি বড় অংশ ভোটকেন্দ্রে যান। তাঁদের ব্যাপক অংশগ্রহণের ফলে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর আসনসংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ আরব ভোটারের অংশগ্রহণের বিষয়টি এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচনের ফলাফল ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। নেতানিয়াহুর জোট এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। একইভাবে বিরোধী জোটের পক্ষেও আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া ক্ষমতায় যাওয়া কঠিন।
এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক, বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ এবং আরব দলগুলোর রাজনৈতিক ভূমিকা ইসরায়েলের সরকার গঠনের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। অভিযোগগুলোর তদন্তের ফল কী হয় এবং বিরোধী জোট আরব দলগুলোর সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে কি না, তার ওপরই পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।
সূত্রঃ টাইমস অব ইজরাইল
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au