যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক জনমত জরিপের নামে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কয়েকটি প্রতারণামূলক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী জরিপের কাল্পনিক ফল প্রকাশ করেছে। এসব ফলাফল শুধু ভোটারদের মধ্যেই নয়, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও জনমত জরিপের তথ্য সংকলনকারী প্ল্যাটফর্মেও জায়গা করে নিয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, কত সহজে মিথ্যা তথ্য বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এ ধরনের ভুয়া জরিপ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করতে পারে। আবার প্রতারণার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সেই ঘটনাকেই কাজে লাগিয়ে সামগ্রিকভাবে নির্বাচনী তথ্য ও জনমত জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ তৈরি হয়।
এর সর্বশেষ উদাহরণ চলতি মাসের শুরুতে সামনে আসে। তখন ‘ওয়েজউড পোলস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে স্বীকার করে, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী অঙ্গরাজ্য, যেমন টেক্সাস, ওহাইও, মিশিগান, কানসাস ও মেইন নিয়ে প্রকাশিত তাদের জরিপের পরিসংখ্যান ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া।
প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্রের জনমত জরিপশিল্পের দুর্বলতা, তদারকির অভাব এবং এ খাতে প্রবেশের সহজ সুযোগ তুলে ধরতেই তারা ‘একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প’ পরিচালনা করেছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ওয়েজউড জানায়, জরিপ ও গবেষণা খাতে আগে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তারা দেখেছে, যাচাইবিহীন ও নিম্নমানের গবেষণাপদ্ধতির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে জনমত জরিপের ওপর মানুষের আস্থাও কমছে। প্রতিষ্ঠানটির ওই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টটি পরে মুছে ফেলা হয়।
ওয়েজউডের ভাষ্য, ভোটার ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে ভুয়া জরিপ কত সহজে গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে, তা যাচাই করতেই তারা কাল্পনিক তথ্য প্রকাশ করেছিল।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষায়, ‘সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, এটি যতটা সহজ হওয়ার কথা, বাস্তবে তার চেয়েও অনেক বেশি সহজ।’
তবে ওয়েজউডের এই স্বীকারোক্তির আগেই তাদের জরিপ বিভিন্ন রাজনৈতিক তথ্যপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসেও এসব জরিপের তথ্য স্থান পেয়েছিল।
২০২৬ সালের নির্বাচনী চক্রে এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগে আগস্টে ‘মিডিয়ান স্ট্র্যাটেজিস’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানও স্বীকার করে, তারা স্বল্পমেয়াদি সামাজিক পরীক্ষা চালানোর কথা বলে জরিপের ফল জালিয়াতি করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে এ ধরনের ঘটনা জনমত জরিপশিল্প এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। পরিবর্তনশীল তথ্যপ্রবাহের পরিবেশে কোন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য আর কোনটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা নির্ধারণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, ভুয়া জনমত জরিপ পরিচালনাকারীরা নির্বাচনী তথ্যের ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল করে দিতে পারে। [ফাইল ছবি: স্টিফেন ম্যাটুরেন/গেটি ইমেজেস, এএফপির মাধ্যমে]
কীভাবে বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছিল ভুয়া জরিপ
জুনে যাত্রা শুরু করা ওয়েজউড কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী আসন নিয়ে জরিপ প্রকাশ করে। এসব জরিপ রাজনৈতিক প্রচারশিবির, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং জনমত জরিপের তথ্য সংগ্রহ ও সংকলনকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, জুন থেকে অক্টোবরের মধ্যে তাদের জনমত জরিপ ট্র্যাকার ওয়েজউডের ১৫টি জরিপের তথ্য তালিকাভুক্ত করেছিল। প্রতারণার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়।
পত্রিকাটি জানায়, ওয়েজউডের জরিপ অন্তর্ভুক্ত করার আগে প্রতিষ্ঠানটির জনবল, গবেষণাপদ্ধতি এবং অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি সেসব প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছিল।
তবে নিউইয়র্ক টাইমসের দাবি, ওয়েজউডের জরিপগুলো তাদের নিজস্ব প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা কিংবা জাতীয় কংগ্রেস নির্বাচনের গড় জনমত জরিপের হিসাবে যুক্ত করা হয়নি।
তারপরও এ ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে কোনো জরিপ বিশ্বাসযোগ্য তথ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে, সেই প্রক্রিয়ায় দুর্বলতা রয়েছে।
বিভিন্ন জরিপ সংকলনকারী প্রতিষ্ঠান একাধিক গবেষণা সংস্থার ফল এক জায়গায় এনে সাংবাদিক ও ভোটারদের জন্য নির্বাচনী পরিস্থিতি বোঝা সহজ করে। এসব প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করে নির্ভরযোগ্য গবেষণা ও নিম্নমানের কিংবা প্রতারণামূলক জরিপের মধ্যে পার্থক্য করতে পারার ওপর।
ওয়েজউডের জরিপ কিছু যাচাইপ্রক্রিয়া পার হয়ে যেতে পারার ঘটনা দেখিয়েছে, কাগজে-কলমে স্বচ্ছতার দাবি থাকলেই গবেষণাটি বাস্তবে সঠিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়েছে, এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না।
জরিপ ও নির্বাচনী পূর্বাভাসবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘ফিফটি প্লাস ওয়ান’ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম তদন্ত করে। তাদের অনুসন্ধানে কাঁচা তথ্যের অসংগতি এবং জরিপে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত শনাক্তকারী তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য পাওয়া যায়। এসব বিষয় ওয়েজউডের জরিপের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে।
তদন্তের পর ওয়েজউড স্বীকার করে, তাদের প্রকাশিত অধিকাংশ জরিপের ফলই ছিল জাল।
যদিও প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, জনগণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্য তাদের ছিল না, তবে অনেক জরিপ বিশ্লেষক তাদের এ বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন। তাঁদের কেউ কেউ মনে করছেন, ‘সামাজিক পরীক্ষা’ চালানোর ব্যাখ্যা দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আরও গুরুতর অনিয়ম আড়াল করার চেষ্টা করছে।
ফিফটি প্লাস ওয়ানের তদন্তে যুক্ত তথ্য সাংবাদিক জি এলিয়ট মরিস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘আমরা ওয়েজউডের তথ্য জালিয়াতির বিষয়টি তদন্ত করছিলাম। এখন তারা “সামাজিক পরীক্ষা” চালানোর অজুহাত দেখিয়ে নিজেদের প্রতারণা আড়াল করার চেষ্টা করছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নির্বাচনে সাবেক প্রার্থী ও মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেটর ম্যালরি ম্যাকমরো ১৯ এপ্রিল ডেট্রয়েটে সমর্থকদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন। [ছবি: হোসে জুয়ারেজ/এপি]
নির্বাচনে কী প্রভাব ফেলছে ভুয়া জরিপ
ভুয়া জনমত জরিপের প্রভাব শুধু জরিপশিল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাচনী প্রচার, প্রার্থীদের অবস্থান এবং ভোটারদের সিদ্ধান্তেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
মিশিগানে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর পদপ্রার্থী বাছাইয়ের প্রাথমিক নির্বাচনে পরাজিত ম্যালরি ম্যাকমরো দাবি করেছেন, ওয়েজউডের একটি জরিপ তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার বড় ক্ষতি করেছে। ওই জরিপে তাঁর জনসমর্থন এক অঙ্কের ঘরে দেখানো হয়েছিল।
ম্যাকমরোর ভাষ্য, জরিপের ফল প্রকাশের পর তাঁর প্রচারকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েন। সাংবাদিকেরাও বারবার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চান, তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ভাবছেন কি না।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী তহবিলে অনুদান আসাও কমে যায়। ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থকেরা তাঁর পরিবর্তে অন্য প্রার্থীদের প্রচারণায় অর্থ বিনিয়োগ করতে শুরু করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ম্যাকমরো ওয়েজউডের জরিপ এবং ‘মিচেল রিসার্চ অ্যান্ড কমিউনিকেশনস’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের জরিপকে তাঁর প্রচারণার জন্য ‘পরপর দুটি বড় আঘাত’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, এই জরিপগুলো তাঁর নির্বাচনী প্রচারণাকে কার্যত শেষ করে দিয়েছিল। জুলাইয়ে তিনি সিনেট নির্বাচনের দৌড় থেকে সরে দাঁড়ান।
ম্যাকমরো লেখেন, ‘তত দিনে আমরা ঝুঁকি নিয়ে অর্থ ব্যয় করেছি, বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু করেছি। সেগুলো কাজও করছিল। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি হয়ে গেছে। বাইরের পক্ষগুলোর বিপুল অর্থ ব্যয় এবং আমাদের প্রচারণা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, এমন প্রচারণার বয়ানে আমরা চাপা পড়ে যাই।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ম্যাকমরোর অভিজ্ঞতা আরও বড় একটি সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। কোনো জরিপ জনমত সঠিকভাবে তুলে না ধরলেও মানুষ সেটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করলে তার ফলাফল নির্বাচনী সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
কেন ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ
ওয়েজউডের ঘটনা দেখিয়েছে, প্রতারণামূলক তথ্য কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের আগে থেকেই মেরুকৃত রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর অ্যান ইনফর্মড পাবলিক’-এর গবেষকেরা ওয়েজউডের স্বীকারোক্তির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে আলোচনা কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তা পর্যবেক্ষণ করেছেন।
তাঁদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শুরুতে এ আলোচনা মূলত জনমত জরিপ বিশেষজ্ঞ এবং নির্বাচনী তথ্য নিয়ে আগ্রহী ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। পরে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও দলীয় অবস্থানভিত্তিক বিভিন্ন অ্যাকাউন্টেও বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে।
কিছু পোস্টে গুরুত্ব দেওয়া হয়, প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এবং জরিপ সংকলনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে ওয়েজউডের ফলাফল প্রকাশ করেছিল, সেই বিষয়টিকে। অন্যদিকে, কেউ কেউ এ ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে সামগ্রিকভাবে জনমত জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিশেষ করে যেসব জরিপে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের ভালো অবস্থানে দেখানো হয়েছিল, সেগুলোকে অবিশ্বাসযোগ্য হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।
গবেষকেরা দেখেছেন, এ বিতর্কের সঙ্গে এমন অভিযোগও যুক্ত হয়ে যায় যে জনমত জরিপ পরিকল্পিতভাবে ভোটারদের বিভ্রান্ত করছে অথবা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের জনসমর্থন কমিয়ে দেখাচ্ছে।
সেন্টার ফর অ্যান ইনফর্মড পাবলিক তাদের বিশ্লেষণে লিখেছে, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ডানপন্থী গণমাধ্যমের তথ্যপ্রবাহ এ ঘটনাটিকে ব্যাপক আলোচনায় নিয়ে আসে এবং বিতর্কের প্রধান ভাষ্যগুলো নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল, মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে প্রকাশিত জরিপের ফল, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে থাকা জরিপগুলো বিশ্বাসযোগ্য নয়।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সমালোচনা করেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তিনি একাধিকবার ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেছেন।
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ধরা পড়ে গেছে। ব্যর্থ হয়ে পড়া নিউইয়র্ক টাইমসের সবকিছুই কৃত্রিম।’
ওয়েজউডের জরিপ তাদের জরিপ ট্র্যাকারে অন্তর্ভুক্ত করার ঘটনাটি তাঁর পত্রিকাটির বিরুদ্ধে করা ১৫ বিলিয়ন ডলারের মানহানির মামলাকে আরও শক্তিশালী করবে বলেও দাবি করেন ট্রাম্প।
তিনি লেখেন, ‘তাদের বিরুদ্ধে আমাদের শক্তিশালী মামলাটি প্রতিদিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে।’
ভুয়া জরিপ ঠেকাতে কী করা যেতে পারে
যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি ভুয়া জনমত জরিপ প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার নির্দিষ্ট কোনো আইন নেই।
তবে কয়েকটি অধিকার ও জনস্বার্থবিষয়ক সংগঠন এবং আইন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ভুয়া জরিপ প্রকাশের ঘটনাকে পণ্যসংক্রান্ত প্রতারণা কিংবা তারের মাধ্যমে সংঘটিত প্রতারণা (ওয়্যার ফ্রড) হিসেবে বিবেচনা করে ফেডারেল পর্যায়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
২০২০ সালে ‘মিসৌরি ল রিভিউ’-তে প্রকাশিত এক লেখায় টাইলার ইয়ারগেইন বলেন, এ ধরনের প্রতারণা ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করা এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
তাঁর মতে, ভুয়া জরিপ পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান নির্বাচনী আইন প্রয়োগের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি।
তিনি লেখেন, ‘এ ধরনের অপরাধের বিচার করা হলে তা ফেডারেল সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রক্ষা করবে। এখানে বিষয়টি শুধু পূর্বাভাসভিত্তিক গবেষণার নির্ভুলতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের জন্য ভুয়া জরিপকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, এমন অপরাধীদের নিরুৎসাহিত করাই মূল লক্ষ্য।’
যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রচারমাধ্যম নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশনের (এফসিসি) চেয়ারম্যান ব্রেন্ডন কার বলেছেন, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে ভুয়া জরিপের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এ ধরনের জরিপ প্রচার বা ছড়িয়ে দেওয়া থেকে সম্প্রচারমাধ্যমগুলোকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
কারের সতর্কবার্তা, এ ধরনের জরিপ প্রচার করলে সম্প্রচারমাধ্যমগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনার লাইসেন্স হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘ফেডারেল লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী সম্প্রচারমাধ্যমগুলোকে সংবাদ বিকৃত করা কিংবা সম্প্রচার-সংক্রান্ত প্রতারণামূলক তথ্য প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে হয়। জনস্বার্থে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা গুরুত্বপূর্ণ।’
তবে এফসিসির একমাত্র ডেমোক্র্যাট কমিশনার আনা গোমেজ কারের এই অবস্থানের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘যেসব জরিপ পরিচালনাকারী ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণকে বিভ্রান্ত করেন, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। কিন্তু প্রকাশ্যে পাওয়া জরিপের তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করার কারণে কোনো সম্প্রচারমাধ্যমকে শাস্তি দেওয়া উচিত নয়, যদি পরে দেখা যায় জরিপটি ভুল ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘সংবাদ বিকৃতি বা প্রতারণামূলক সম্প্রচারসংক্রান্ত এফসিসির বিধি সৎ বিশ্বাসে এ ধরনের তথ্য প্রচার করা কোনো সম্প্রচারকেন্দ্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।’
ভুয়া জরিপের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট আইনি প্রতিকার না থাকায় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম ও ভোটারদের নিজেদেরই সতর্ক থাকতে হবে। নির্বাচনী তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করার দায়িত্বও তাঁদের ওপর বর্তায়।
ক্যালিফোর্নিয়ার জননীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পাবলিক পলিসি ইনস্টিটিউট অব ক্যালিফোর্নিয়া’র (পিপিআইসি) জরিপ বিভাগের পরিচালক মার্ক বালদাসারে বলেন, কোন জরিপটি প্রকৃত আর কোনটি ভুয়া, তা দ্রুত শনাক্ত করার কিছু উপায় রয়েছে।
পিপিআইসির স্টেফানি বার্টনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘জরিপে স্বচ্ছতা আছে কি না, তা খেয়াল করুন। একটি বিশ্বাসযোগ্য জরিপে গবেষণার লক্ষ্য, জরিপ পরিচালনার উদ্দেশ্য এবং অর্থায়নকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক দল বা নির্বাচনী প্রচারশিবিরের নির্দেশনায় পরিচালিত কোনো জরিপ প্রকাশ্যে আনা হলে সেটির মাধ্যমে জনগণকে বিশেষ কোনো বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্য থাকতে পারে।’
সূত্র: আল জাজিরা