নয়টি গুলিতে আহত হওয়ার দাবি ভুয়া,হাসিনাসহ ৮৪ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ
জুলাই আন্দোলনের সময় শরীরে নয়টি গুলি লেগে আহত হওয়ার দাবি করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৭৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন নূর হোসেন নামের এক যুবক।…
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষী দুলাল মিয়ার বাড়ি ও দোকানে হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায়। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মধ্যরাতে উপজেলার প্রত্যন্ত দৌলতপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। হামলায় অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। আহতরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোহেল জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলা ও ভাঙচুরের আলামত সংগ্রহ করেছে। ভুক্তভোগীদের মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে আহতদের নিয়ে পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে থাকায় মামলা করতে আসতে দেরি হচ্ছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে একদল লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে দুলাল মিয়ার বাড়িঘর ও দোকানে হামলা চালায়। হামলাকারীরা বাড়ি ও দোকানের মালামাল ভাঙচুর করে এবং নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কারসহ বিভিন্ন জিনিস লুট করে নিয়ে যায়।
দুলাল মিয়ার বাবা মামুদ আলী একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ হন। ওই পরিবারের মোট সাতজন স্বজন ও আত্মীয় মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। দুলাল মিয়া ২০১৬ সালে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দেন। সে সময় তদন্ত সংস্থার কাছে মোট ৩২ জন সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা প্রায় ১৫০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন জমা দেয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর দৌলতপুর গ্রামের তোতা টেইলার্সের মালিকসহ পাঁচজনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর তাঁরা জামিনে মুক্তি পান। তাঁদের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩৪ জনকে হত্যা, পাঁচ নারীকে ধর্ষণ, ৩১ জনকে অপহরণ, ১৪ জনকে নির্যাতন এবং ৩০টি বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগ আনা হয়।
দুলাল মিয়ার মেয়ে উজ্জ্বলা আক্তার শুক্রবার অভিযোগ করে বলেন, তাঁর বাবা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষী হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটি আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার সময়ও তাঁদের ভয়ভীতির মধ্যে থাকতে হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেই আতঙ্ক আরও বেড়েছে। গ্রামে মামলার অন্য সাক্ষীরা ওই সময়ের পর এলাকা ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর পরিবার থেকে যায়।
উজ্জ্বলা জানান, তাঁর স্বামী হেলাল মিয়া ও বাবা দুলাল মিয়া মিলে গ্রামে দোকান চালান। গত ২৩ অক্টোবর তাঁদের দোকানে চুরির ঘটনা ঘটে। বিষয়টি শাল্লা থানাকে জানানোর পর ২৯ অক্টোবর পুলিশ তদন্তের জন্য গ্রামে যায়। তখন হামলাকারীরা পুলিশ কেন গ্রামে এসেছে, সে বিষয়ে তাঁদের কাছে জানতে চায় এবং পুলিশের সঙ্গে তর্কে জড়ায়।
উজ্জ্বলার অভিযোগ, পুলিশ গ্রাম থেকে চলে যাওয়ার পর মধ্যরাতে যুদ্ধাপরাধের মামলার আসামি তোতা টেইলার্সের ভাতিজা জালাল মিয়ার নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২০ জন তাঁদের বাড়ি ও দোকানে হামলা চালায়। অভিযুক্তদের মধ্যে তোফাজ্জল মিয়া, মামলার আসামি জলিল মিয়ার নাতি শাহিন মিয়া, হেকিম মড়ল, সুলতান, রাজ্জাক, তারেক, শামিম ও নূর ইসলামের নাম উল্লেখ করেন তিনি।
হামলায় চারটি ফ্রিজ, ছয়টি গরু, দুই ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ চার লাখ টাকা লুট করে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন উজ্জ্বলা। এ ছাড়া বসতঘর ও দোকানের বিভিন্ন মালামাল ভাঙচুর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁর।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা পরিবারের সদস্য ফাতেমা বেগম, ফরিদা বেগম ও রোকেয়া বেগমকে মারধর করে এবং তাঁদের যৌন নিপীড়নের চেষ্টা চালায়। পরে আহতদের দিরাই ও শাল্লা হাসপাতালে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁকে ও তাঁর ১২ বছর বয়সী মেয়েকেও ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন উজ্জ্বলা। তাঁর দাবি, যুদ্ধাপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দেওয়া এবং বীরাঙ্গনা পরিবারের সদস্য হওয়ায় তাঁদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার উদ্দেশ্যে এ হামলা চালানো হয়েছে।
দুলাল মিয়ার স্ত্রী ফাতেমা বেগম অভিযোগ করেন, মামলার আসামিরা প্রভাবশালী হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের পরিবারের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছে। বৃহস্পতিবার রাতে হামলা চালিয়ে বাড়ির সবকিছু লুট করে নেওয়া হয়েছে। ঘটনার পর থেকে তাঁর স্বামী দুলাল মিয়াকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।
উজ্জ্বলা আক্তারের স্বামী হেলাল মিয়া বলেন, হামলার খবর পেয়ে সুনামগঞ্জ থেকে দৌলতপুরে গিয়ে তিনি বাড়ি ও দোকানের সবকিছু লুটপাট করা অবস্থায় দেখতে পান। ঘটনার সময় বাড়িতে কোনো পুরুষ সদস্য ছিলেন না। হামলাকারীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাড়ি ও দোকানে হামলা চালিয়ে মালামাল নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মোকতাদির আহমদ জানান, দৌলতপুর গ্রামের তিন নারী ও এক শিশু আহত অবস্থায় হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামি হিসেবে উল্লেখ করা জালাল মিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
শাল্লা থানার ওসি মোহাম্মদ সোহেল বলেন, বৃহস্পতিবার দিনের বেলায় পুলিশ তদন্তের জন্য ওই গ্রামে গেলে হামলাকারীদের সঙ্গে পুলিশের কথা-কাটাকাটি হয়। এরপর রাতেই হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au