ফেল করায় শিক্ষককে দায়ী করে চিরকুট লিখে শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা
এইচএসসি পরীক্ষায় ফেল করার পর শিক্ষককে দায়ী করে চিরকুট লিখে আত্মহত্যা করেছে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার হৃদয় (১৯) নামে এক শিক্ষার্থী। শনিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে নিজ…
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর তদন্তে সামনে আসছে একের পর এক নতুন তথ্য। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় মাদক সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। ওটিএন বাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর ক্ষিলক্ষেতে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের ভাড়া দেওয়া একটি বাড়িতে ডিবির অভিযানের সময় আটক ব্যক্তিদের তালিকায় ছিলেন তাহসিফ। ওই বাড়িতে তাঁর বোনও ছিলেন।
নিজের পরিচয় দিয়ে পুলিশের কাছ থেকে ছাড়া পেলেও তাঁর বোনকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তাহসিফের জানাজায় তাঁর উপস্থিতি দেখা যায়নি। তিনি বর্তমানে জেলে আছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে, যে এলাকা থেকে তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে এবং যে এলাকায় তাঁর মরদেহ পাওয়া গেছে, সেখানে নিয়মিত মাদকের আড্ডা বসে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ওই এলাকায় মাদক কেনাবেচারও অভিযোগ রয়েছে। এসব তথ্যের সঙ্গে তাহসিফের মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাঁর মৃত্যুর পেছনে মাদক সংশ্লিষ্টতা, ব্যক্তিগত বিরোধ নাকি অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসার অপেক্ষা রয়েছে।
তাহসিফের মৃত্যুর রাতেই তাঁকে উত্তরার একটি বারে এক নারীর সঙ্গে দেখা গিয়েছিল বলে ওটিএন বাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে। ওই বারের একটি সিসিটিভি ফুটেজও ওটিএন বাংলার হাতে এসেছে। তবে ফুটেজে তাঁর বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে দেখা যায়নি। ফলে ওই রাতে তাহসিফের চলাফেরা, তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় এবং পরবর্তী সময়ে কী ঘটেছিল, সেসব বিষয় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ডিআইজির ভাড়া দেওয়া বাড়িতে ডিবির অভিযান, আটক ছিলেন তাহসিফ
রাজধানীর ক্ষিলক্ষেত থানাধীন পুলিশ হাউজিং-১ এলাকার একটি তিনতলা বাড়িতে মঙ্গলবার ভোরে অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। বাড়িটির মালিক পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট-২) আব্দুল্লাহ আল জহির। এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া বাড়িটিতে রাতভর ডিজে পার্টি, মাদক সেবন ও মাদকের কারবার চলার গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়।
অভিযানে ২৬ নারী ও ৫৮ পুরুষসহ মোট ৮৪ জনকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে আফগানিস্তানের একজন নাগরিকও ছিলেন। বাড়িটি থেকে গাঁজা, ইয়াবা, মদ, কনডম ও ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করে ডিবি।
ওটিএন বাংলার অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই অভিযানে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে তাহসিফ ও তাঁর বোনও ছিলেন। তাহসিফ নিজের পরিচয় দেওয়ার পর পুলিশের কাছ থেকে ছাড়া পান। তবে তাঁর বোনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং তাঁকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তাহসিফের মৃত্যুর পর তাঁর জানাজায় বোনের উপস্থিতি দেখা যায়নি।
অভিযানের তথ্য নিশ্চিত করে সেদিন ডিবির প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, বাড়িটি অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের। তিনি এয়ারবিএনবির মাধ্যমে বাড়িটি ভাড়া দিয়েছিলেন। সেখানে অবৈধভাবে মাদক সেবন ও ডিজে পার্টি চলছিল। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার ইলিয়াস কবির জানিয়েছিলেন, বাড়িটি এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া হতো। একজন হোস্ট ও একজন কো-হোস্টের মাধ্যমে সেটি পরিচালিত হচ্ছিল। কো-হোস্ট মাহবুবুল আলমকে আটক করা হয়েছিল।
অভিযানের পর অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে পুলিশ সদর দপ্তরের পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট-২ শাখা থেকে প্রত্যাহার করে ওএসডি করা হয় এবং সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।
বাড়ির মালিক আব্দুল্লাহ আল জহিরের বক্তব্য ছিল, বাড়িটি এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলার প্ল্যাটফর্মে ভাড়া দেওয়ার জন্য তালিকাভুক্ত ছিল। জন্মদিনের অনুষ্ঠান ও গায়ে হলুদের মতো আয়োজনের জন্য বাড়ির উঠান ভাড়া দেওয়া হতো। তাঁর দাবি, ভাড়াটিয়াদের জন্য মাদক ও অবৈধ কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে কঠোর নিয়ম দেওয়া ছিল। কোনো ভাড়াটিয়া আড়ালে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করলে তার দায় বাড়িওয়ালার ওপর বর্তানো উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ, মৃত্যুর রাতের বারের ফুটেজ
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় মাদক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। তবে ডিবির অভিযানে আটক ব্যক্তিদের তালিকায় তাঁর নাম থাকার তথ্য, মরদেহ উদ্ধারের এলাকার মাদক কারবারের অভিযোগ এবং মৃত্যুর রাতে একটি বারে এক নারীর সঙ্গে তাঁর উপস্থিতির সিসিটিভি ফুটেজ নতুন করে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বারের সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফকে একজন নারীর সঙ্গে দেখা গেছে। ছবিঃ সংগৃহীত
ওটিএন বাংলার হাতে আসা বারের সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফকে একজন নারীর সঙ্গে দেখা গেছে। তবে তাঁর বন্ধু দীপকে ওই ফুটেজে দেখা যায়নি। ওই নারী কে, তাহসিফের সঙ্গে তাঁর কী সম্পর্ক এবং সেদিন বারে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে মাদক সেবন বা মাদক কারবারের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও এখনো অজানা। এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।
দীপের চার দিনের রিমান্ড
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস এ আদেশ দেন।
এদিন দুপুর সোয়া ২টার দিকে দীপকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে নৌ পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন তাঁকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপ তাহসিফকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যান। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশ জানতে পারে, উত্তরখান থানাধীন রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসছে। পরে নৌ পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে। ট্রাউজারের পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, ঘটনার দিন দীপ তাহসিফকে নিয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানাধীন মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দীপ জানিয়েছেন, তাহসিফ তাঁর সিনিয়র বড় ভাই ছিলেন।
রিমান্ড আবেদনে হত্যাকাণ্ডের কারণ উদ্ঘাটন, অন্য জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, প্রয়োজনীয় আলামত উদ্ধার, তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত স্থান চিহ্নিত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার দিনের বেশির ভাগ সময় মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা করেছিলেন তাহসিফ। সন্ধ্যায় দীপের ফোন পেয়ে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে আসার কথা জানিয়ে বাসা থেকে বের হন তিনি। সিসিটিভি ফুটেজে তাঁকে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হতে দেখা যায়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে গ্যারেজের সামনে দীপের সঙ্গে তাঁর দেখা হওয়ার তথ্যও আগে প্রকাশিত হয়েছে। পরে দুজন আলাদা মোটরসাইকেলে বেরিয়ে যান।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তাহসিফের আচরণে অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে ‘আম্মু, আমি আসছি’ লিখে বার্তা পাঠান তিনি। এরপর তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
২৮ অক্টোবর বিকেলে রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। হাতঘড়ি ও আইফোনের সূত্র ধরে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

কে এম তাহসিফ সাউরি ও তার বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম। ছবি: সংগৃহীত
প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ধারণা করা হলেও তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম শুরু থেকেই হত্যার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ২৯ অক্টোবর ময়নাতদন্ত শেষে হাসপাতালের মর্গের সামনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তাঁর ধারণা, ছেলেকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তবে তখন পর্যন্ত তাঁর এই দাবির পক্ষে কোনো তদন্ত-প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।
তাহসিফের বাবা আরও জানান, ছেলের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। বিয়ে নিয়েও তাঁদের মধ্যে আলোচনা হতো। নিখোঁজ হওয়ার দিন ছেলের আচরণে কোনো অস্বাভাবিকতা তিনি লক্ষ করেননি।
মোটরসাইকেল উদ্ধার ও তদন্তের প্রশ্ন
তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি নিখোঁজ হওয়ার পর সেটির সন্ধানে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। পরে দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকা থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন কালো রঙের সুজুকি জিক্সার ১৫০ মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। মোটরসাইকেলটির মালিকানা যাচাই করা হচ্ছে। মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে মোটরসাইকেলটি পাওয়া এলাকার দূরত্ব প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার।
এলাকাটিতে নিয়মিত মাদকের আড্ডা ও কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। ফলে মোটরসাইকেলটি সেখানে কীভাবে গেল, কে বা কারা সেটি সেখানে রেখেছিল এবং তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে ওই এলাকার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বাবা প্রথমে মামলা করতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। তবে শুক্রবার রাতে উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন তিনি। মামলাটি তদন্ত করছে নৌ পুলিশ। পরে দীপকে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
তাহসিফ বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক সামরিক পাইলট ও কর্মকর্তা ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণভবনের পেছন থেকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণের কারণে তিনি আলোচনায় আসেন। ওই ঘটনার পর তিনি বিমানবাহিনীর চাকরি ছাড়েন বলে জানা গেছে। তবে তাঁর চাকরি ছাড়ার বিষয়টির সঙ্গে মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au